জ্ঞান ফিরল যখন বাবা বাড়িতে নিয়ে এসেছে।
সব শেষ হয়ে গেল আমার। সব।
৬২ জীমূতবাহন
মাঝরাতে একটা পাহাড়ি ছোটো শহরের রাস্তাঘাট কেমন হতে পারে সে সম্পর্কে কোনও ধারণা ছিল না। কলকাতায় প্রচুর মানুষের শহর। গোটা রাতেই ছিটকে ছুটকে কেউ না কেউ বেরিয়ে যাবেই। তার ওপর মাতাল আছে, রাস্তাঘাটে শুয়ে থাকা লোক তো আছেই।
রাবংলার মাঝরাত তেমন নয়। বৃষ্টি থামার পর কুয়াশা ঘনিয়েছে, বেজায় ঠান্ডা, রাস্তার কুকুরেরা পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয় নিয়ে কোথায় যেন গা ঢাকা দিয়েছে। কয়েকটা হোটেলের ঘরে আলো জ্বলছে বটে, তবে কোনও শব্দ আসছে না।
হোটেল থেকে বেরিয়ে অনেকটা রাস্তা হেঁটে মোড়ের মাথায় এসে দেখলাম বেশ চার-পাঁচটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। গাড়িগুলোর ভিতর উঁকি মারতে দেখা গেল একটা গাড়ির ভেতর ড্রাইভার মোবাইলে সিনেমা দেখছে। আমাকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠে কাচ নামিয়ে হিন্দিতে বলল, “কী চাই?”
আমি বললাম, “এন জে পি যাবে?”
আমাকে পাগল ঠাওরাল হয়তো। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বলল, “সকালে যাবেন। এখন কে যায়?”
আমি বললাম, “যা লাগে তার দ্বিগুণ টাকা দেব। যাবে?”
এবার ড্রাইভার নড়েচড়ে বসে বলল, “এখন কেন যাবেন?”
আমি বললাম, “কাজ পড়ে গেছে বাড়িতে। বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। কলকাতা ফিরতে হবে সকালের মধ্যে।”
লোকটা কী বুঝল কে জানে, আমাকে বলল, “ওহ, পিতাজি অসুস্থ হয়ে গেছে, তাহলে বেশি টাকা নেব কেন? উঠে বসুন। যাচ্ছি।”
আমি তো পুরুষমানুষ। পুরুষদের নাকি কাঁদতে নেই।
লোকটার এই কথাটা শুনে হঠাৎ করে আমার দু চোখের কোণ ভিজে উঠল। চেনে না, জানে না একটা লোক, আমার বাবা অসুস্থ, তাও মিথ্যে করে বলা, একবার যাচাই করারও প্রয়োজন বোধ করল না, আমি বলেছি বলে যেতে রাজি হয়ে গেল?
লোকটা বলল, “রাস্তার হাল ভালো না। তবু আপনার পিতাজি অসুস্থ বলে যাব। উঠুন।”
আমি বোলেরো গাড়িটায় উঠলাম। লোকটা গাড়ি স্টার্ট দিল। কুয়াশা চিরে গাড়ি এগিয়ে চলল। এগিয়ে চলল রাবংলা ছেড়ে। এগিয়ে চলল এমন একটা মেয়েকে পিছনে ফেলে, যাকে আমি বউ ডাকছিলাম।
রাস্তায় ট্রাক যাচ্ছে, খুব সন্তর্পণে গাড়ি চালাচ্ছে ড্রাইভার। আমার সব কিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। একটা উদ্দেশ্যহীন জীবন মানুষ কেন বাঁচে? সব কিছু শেষ হয়ে যাবার পরেও মানুষ কি আদৌ বেঁচে থাকে, না তাকে বেঁচে থাকার অভিনয় করে যেতে হয় প্রতিনিয়ত?
অনিন্দিতা কী করছে এখন? একটা চাকরিহীন মেয়ে তো সব জেনেশুনেও থেকে যেতে পারে এই ধরনের জানোয়ারের সঙ্গে, অনিন্দিতা কেন থাকতে যাবে? ছেড়ে দিয়েছে অনিরুদ্ধকে? কষ্ট পাবে না?
একগাদা চিন্তা মাথায় ঘুরতে শুরু করল। ড্রাইভার বলল, “রাতে গাড়ি চালাতে গিয়ে সমস্যা হল চোখ বন্ধ হয়ে আসে। আপনি চেষ্টা করুন না ঘুমাতে। আমার চোখ বন্ধ হয়ে গেলে নিউজপেপার হেডলাইন হয়ে যেতে হবে দুজনকে।”
আমি বললাম, “তা ঠিক।”
মদের নেশায় আমারও ঘুম পাচ্ছিল। বেশ খানিকটা রাস্তা যাবার পর মাথায় পোকা নড়ে উঠল। নিজের ফোনে একটা ফেক কল করলাম। নিজেই ভুলভাল বকে ড্রাইভারকে বললাম, “এন জে পি যেতে হবে না। বাবার খবর এসেছে। ঠিক আছে এখন। রাবংলা ফিরে চলুন।”
ড্রাইভার সজোরে ব্রেক কষে গাড়ি থামিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি পাগল?”
আমি ভালো মানুষের মতো মুখ করে বললাম, “ফোন এসেছিল দেখলেন তো।”
ড্রাইভার মাথায় হাত দিয়ে বলল, “আপনি আসলে পাগল। আমার বোঝা উচিত ছিল।”
আমি বললাম, “আসলে বউকে ফেলে এসেছিলাম হোটেলে, এখন মনে পড়ল।”
ড্রাইভার হাত নেড়ে বলল, “জীবনে বিরাট শিক্ষা হয়ে গেল। মাঝরাতে পাগল আর মাতালের পাল্লায় পড়লে কোথাও যেতে নেই। আপনি শিওর মদ খেয়েছেন। এবার কিন্তু আমি এন জে পি যাওয়ার ফুল টাকা নেব।”
আমি বললাম, “আচ্ছা সে দেব। আমি খুব দুঃখিত।”
গোটা রাস্তা গজগজ করতে করতে ড্রাইভার রাবংলা ফিরে এল।
ভোর হয়ে গেছে। কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছে। সব হোটেলের ছাদে লোকজন তুমুল উৎসাহে সেটা দেখছে।
আমি হোটেলে ফিরে এসে রুমের বাইরে দাঁড়ালাম। বেশ কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে কলিং বেল টিপলাম।
বউ দরজা খুলল।
আমার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বলল, “সারারাত তুমি কোথায় গেছিলে? তুমি জানো আমার মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেছিল, আমি আর ঘুমাতে পারিনি ভয়ে?”
আমি ঘরে ঢুকে বললাম, “আমি কলকাতা চলে যাচ্ছিলাম। শেষ পর্যন্ত আর যাওয়া হল না।”
বউ বলল, “ওহ। পালিয়ে যাচ্ছিলে?”
আমি বললাম, “ওইরকমই। তোমাকে একটা কথা বলা হয়নি। অনিরুদ্ধ তোমাকে ফোন করছিল। আমার নাম্বার জোগাড় করেছে। আমি তোমাকে ফোন দিইনি। আটকে দিয়েছি। তুমি ওর সঙ্গে কথা বলে নাও। চিন্তা করছে হয়তো।”
বউ আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি কী করে ফিরতাম তুমি ভাবোনি?”
আমি বললাম, “না। গিয়ে অনিরুদ্ধকে জানিয়ে দিতাম। হানিমুন করতে চলে আসত।”
বউ বলল, “তোমার ওকে খুব হিংসা, না?”
আমি বললাম, “না। হিংসা হবার কিছু নেই তো। সোনাগাছির বেশ্যাদেরও বাবু থাকে। তা বলে কি অন্য লোকেরা সে বাবুদের ঘেন্না করে?”
বউ কথাটা শুনে বসে পড়ল খাটে, “তুমি আমায় বেশ্যা বললে?”
আমি বললাম, “না, তোমায় বলিনি। জাস্ট একজাম্পল দিলাম। শোনো, আমার এই ভুলভাল খেলা আর ভাল্লাগছে না। এই খেলাটা শেষ হোক। আজ ফিরে চলো। গিয়ে যা খুশি করো তুমি, আমাকে মুক্তি দাও। আমি আর ঘুরতে চাই না।”
