অমৃতর সঙ্গে সম্পর্কটা হল ধূমকেতুর মতো। কীভাবে কোত্থেকে সব হয়ে গেল।
এক মুহূর্তও মনে হয় কাছছাড়া না করি। কিন্তু কী করব? অনিন্দিতাদির ব্যাপারটাই এমন হল যে সে সময়টা মাথা কাজ করছিল না। অনিরুদ্ধদাকে দেখে সবার উপর অবিশ্বাস হতে শুরু করল।
মানুষ এত খারাপ হতে পারে? এত? আমি নিশ্চিত, অনিন্দিতাদির সঙ্গে আবার কোনও সমস্যা তৈরি হবে। হতেই হবে। একটা মানুষ, যে বিয়ের পরে দিনের পর দিন নিজের বউকে লুকিয়ে অন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক করতে পারে, সে এত সহজে হাল ছেড়ে দেবে না। সে আবার ময়দানে নামবে অন্য কোনও গেম প্ল্যান নিয়ে। বিকেল থেকে তিনবার ফোন করেছে আমাকে। অনবরত মেসেজ। সিম চেঞ্জ করতে হবে বুঝতে পারছি। একবার লয়ালটি টেস্ট করতে গিয়ে সিমটার বারোটা বাজালাম। ব্যাংকেও এই নাম্বার দেওয়া আছে। আবার নতুন সিম নিতে হবে। অমৃতর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে যদি দেখা যায় এই পারভার্ট ফোন করেছে, তাহলে চিত্তির। অমৃত যা পজেসিভ।
আবার হাসি পেল। আচ্ছা, ছেলেটা কি জানে, সারাদিন ধরে আমি ওর কথাই ভাবি? কী করছে, কী খাচ্ছে, কীভাবে রাগছে, সব… সব ভাবি?
চোখ বন্ধ করে আমি অমৃতকে অনুভব করতে পারি। ঠোঁটটা এগিয়ে আনছে আমার ঠোঁটে। আমি ওর কোমর জড়িয়ে ধরি। আমার ঘাড়ে চুমু খাওয়ার সময় আমি যেভাবে ওর স্পর্শ অনুভব করি, সে স্পর্শের কথা ভাবার চেষ্টা করি প্রাণপণে। ওর চোখে আমার চোখের দিকে তাকালে যে আকুলতা দেখতে পাই, তা কী করে বোঝাই? ভালোবাসি তো বারবার বলতে হয় না। চোখের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। একজন মানুষের চোখেই সব থাকে। একটা মেয়ের থেকে মানুষের চোখ বোধহয় আর কেউ ভালো করে বুঝতে পারে না। অমৃত যখন আমার জন্য অপেক্ষা করে ওর বাইকটা নিয়ে, আমি ওর চোখদুটোই দেখি। কী অধীর আকুলতায় আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। এ ছেলে যখন আমার সঙ্গে সংসার করবে, এমনই থাকবে? থাকতেই হবে। না থাকলে কিল ঘুসি মেরে ঠিক করে দেব। ভীষণ আদর করতে ইচ্ছা করছিল আমার।
ঘুমাতে যাবার আগে আর-একবার ফোন চেষ্টা করলাম, যদি পাগলটা অন করে!
নাহ, করেনি। খেপেছে আবার। কী করছে কে জানে!
ছটফট করতে করতে ঘুমালাম।
কেন এরকম করে? জানে না কেন, কেন বোঝে না, আমিও ওকে ততটাই ভালোবাসি যতটা ও ভালোবাসে? এরকম পাগলামি করলে কী হয়?
মাঝরাতের দিকে ঘুম এসেছিল। সকালে বাবা দরজা ধাক্কিয়ে ঘুম ভাঙাল। আশা হল হঠাৎ করে, সেদিনের মতো এল নাকি পাগলটা?
ধড়মড় করে উঠে দরজা খুলে বললাম, “কী হল? কটা বাজে?”
বাবার মুখটা কেমন যেন, আমার বুকটা ধড়াস করে উঠল।
বললাম, “কী হল?”
বাবা বলল, “মা, ফ্লাইওভারে অমৃতর অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে কাল রাতে।”
আমি বললাম, “তারপর?”
বাবা চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
৬১ আত্রেয়ী
একটা দিন যে কখনও এরকম হতে পারে ভাবতে পারিনি।
মা যেদিন চলে গেছিল, সেদিনও হয়তো এরকমই ছিল। মনে করতে পারি না, চাইও না। কিন্তু একটা রাত আর একটা দিনের মধ্যে যে এতটা তফাত থাকতে পারে, আমি কোনও দিন ভাবতে পারিনি।
বাবা যখন আমাকে ট্যাক্সি করে নিয়ে যাচ্ছিল, শক্ত করে ধরে ছিল। আমি কথা বলতে পারছিলাম না। না পারছিলাম কাঁদতে। চোখ থেকে যে ক্রমাগত জল পড়ে যাচ্ছিল সেটা বুঝছিলাম, কিন্তু মোছার শক্তিটুকু ছিল না।
নার্সিং হোমে অসংখ্য লোক, কেউ ডাক্তার দেখাতে এসেছেন, কেউ বা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে।
আমরা যখন পৌঁছোলাম, তখন ভিজিটিং আওয়ারস শুরু হয়েছে।
আমি ভাবতে ভাবতে এসেছি, ওকে দেখেই বকব, অনেক কিছু বলব, খুব রাগ করব, কেন আমি যাব না বলার পরেও একা একা বাইকে করে বেরিয়েছিল।
গেটের সামনে বাবা অধৈর্য হয়ে ফোন করল কাউকে। আমি কাউকে চিনতে পারছিলাম না। শুধু দেখলাম একজন পুলিশের পোশাক পরিহিত ভদ্রলোক আমাদের নিয়ে একটা জায়গায় দাঁড় করালেন। আপাদমস্তক সাদা কাপড় জড়ানো একটা শরীর। আমার ভিতরটা পাক দিয়ে উঠছিল। বাবা আমার হাত ধরে বলল, “চল, এখানে দাঁড়াতে হবে না।”
আমি বাবার দিকে বোবা দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে আর্তনাদ করে উঠলাম “মানে? কী বলছে? কোথায় ও?”
বাবা আমাকে সরাতে সরাতে বলল, “ঠিক আছে। এখন চল।”
আমি বাবাকে ঠেলে সরিয়ে সাদা কাপড়ে ঢাকা শরীরটার দিকে দৌড়ে গিয়ে কাপড় সরালাম। মাথায় চাপ চাপ রক্ত, ব্যান্ডেজ দেখলাম হয়তো বা, হয়তো সামান্য চিকিৎসা হতে হতেই…
হ্যাঁ…
আমি বসে পড়লাম নার্সিং হোমের মেঝেতেই।
এই মুখটা যে বড্ড চেনা। এই শরীরটার বুকে মাথা রেখেই তো নিশ্চিন্ত হয়েছি কতবার। এই ঠোঁটে চুমু খাবার জন্যই তো স্কুলের প্রতিটা মুহূর্ত অপেক্ষা করে গেছি আমি। এই তো সেই লোকটা, সেই পাগলটা যে আমার সঙ্গে কোনও কারণ ছাড়াই চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ঝগড়া করে গেছে। কত রাগ, কত!
আবার সেই ভোরবেলা বাড়িতে এসে অপরাধীর মতো দাঁড়িয়েছে। “এই আমার না ভুল হয়ে গেছে বুঝলে, আমি তো মাথাগরম লোকই, তুমি আমাকে সামলাতে পারবে তো আত্রেয়ী? তুমি আমার নদী তো, একটামাত্র নদী, আমার সবচেয়ে আদরের নদী। জানো তো, আমি চোখ বন্ধ করলে তুমি আসো, প্রতিটা রাতে যখন দুঃস্বপ্নে উঠে বসে থাকি, আমি চোখ বন্ধ করে তোমার কথা ভাবি। তুমি যখন আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দাও, আমার মাথাটা বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরো, আমি সব ভুলে যাই বিশ্বাস করো। তুমি তো জানো, আমি যতই ঝগড়া করি, যতই রাগারাগি করি, সব কিছুর পরে আমি আসবই ফিরে তোমার কাছে। তুমি না তাড়ালে আমি যাব না, আর যদি কেউ তোমাকে বিয়ে করতে আসে না, তার ঠ্যাং ভেঙে রেখে দেব। পুঁতে দেব শালাকে। কেউ ছোঁবে না তোমায় আমি ছাড়া। কেউ দেখবে না তোমায় আমি ছাড়া। কেউ ভালোবাসবে না, কেউ না। আত্রেয়ী, আমার নদী… পাগলটা খুব জ্বালায় না তোমায় সোনা? আচ্ছা আমাদের ছেলে হলে কী নাম দেবে? আমি একটা নাম ভেবে রেখেছি জানো? খুব কঠিন একটা নাম, শ্রুতকীর্তি। ভালো নামটা? তোমার ভালো লেগেছে? আচ্ছা নাকটা কার মতো হবে? তুমি যে বলো তোমার নাক বোঁচা, একবারেই না। তোমার নাকই আমার চাই। তোমার চোখ চাই, তোমার ভালোমানুষিটা চাই আমাদের সন্তানের মধ্যে। আচ্ছা, শোনো না, একটা ছেলে একটা মেয়ে, ঠিক হবে না? মেয়ে তো বাবার ন্যাওটা হবে, ছেলে নাহয় তোমার হবে। আমরা খুব ঘুরব কিন্তু। এই আমি যে তোমায় ভালো রাখব সব সময় তা না কিন্তু, মাঝে মাঝে তুমুল ঝগড়া করব। তুমুল। তারপর অবশ্য দিনের শেষে পরস্পরের রাগ ভাঙাব। আত্রেয়ী… ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি। একশো বা ভালোবাসি, হাজারবার ভালোবাসি, লক্ষবার, কোটিবার ভালোবাসি। এই আজ স্কুলের পরে দেখা করবে তো?”
