আমি সব্যর দিকে তাকিয়ে বললাম, “ব্রেক আপ করব ভাবছি।”
সব্য আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল, “মানে?”
আমি বললাম, “ব্রেক আপ করব। ব্রেক আপ করলে কি খুব কষ্ট হয়?”
সব্য বলল, “এসব কেন ভাবছিস?”
আমি বললাম, “আই থিংক শি লস্ট হার ইন্টারেস্ট ইন মি। ওর এখন অনেক শুভানুধ্যায়ী আছে। তারা কানে কী মন্ত্র দিচ্ছে কে জানে।”
সব্য বলল, “এটা ঠিক। মেয়েদের প্রচুর শুভানুধ্যায়ী থাকে। তারা আবার ভালোর থেকে খারাপটা বেশি চায়। তবে কী জানিস তো ভাই, ব্রেক আপ করলে ভেবে করিস। ব্রেক আপের পর ছেলেটা দৌড়ে বেড়ায়। মেয়েদের অনেক কাঁধ জুটে যায়, মাথায় হাত বুলিয়ে দেবার ছেলে ঠিক জুটে যাবে। তখন হাত কামড়াস না।”
আমি চায়ের গ্লাসটা টেবিলে রেখে বললাম, “আমি ব্রেক আপ করব, তারপর কাঁধ জুটুক না কী জুটুক তাতে আমার ছেঁড়া যায়। কাল থেকে আমি ফোন নাম্বার চেঞ্জ করে দেব। আসি রে।”
সব্যর হতভম্ব চোখের সামনে দিয়ে উঠে বেরিয়ে এলাম।
৫৯ জীমূতবাহন
নচিকেতার একটা গানের লাইন, “ভালোবাসা আসলে একটা চুক্তি, জেনো অনুভূতি-টনুভূতি মিথ্যে, কেউ দেবে নিরাপত্তা, কেউ বিশ্বাস, আসলে সবাই চায় জিততে।”
আমি কি জিততে চেয়েছিলাম? চাইনি তো? এমনকি বিয়ের কথাও ভাবিনি কোনও দিন। হঠাৎ করে বিয়েটা হয়ে গেল। স্বপ্নও দেখিনি কোনও দিন কাউকে নিয়ে। একটা দুঃস্বপ্ন এসে সব কিছু ছারখার করে দিয়ে চলে গেল। বউ বলে যাকে ডাকি, সে বউ না। যার পাশে শুয়ে ঘুমাই, সে কেউ না আমার। এক সঙ্গে থাকলে তো কিছু আশা তৈরি হয়, সেটা স্বাভাবিক। একটা কুকুর পুষলেও সে কুকুরের প্রতি একটা মায়া আসে। আর এ তো জলজ্যান্ত একটা সুন্দরী মেয়ে। হুইস্কি খেয়ে কী সুন্দর কম্বল টেনে ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি মাথা ভর্তি নেশা নিয়ে জেগে বসে আছি মাঝরাতে।
বৃষ্টিটা আবার নেমেছে। বন্ধুরা হলে বলত এটা বৃষ্টি না রে পাগলা, জীমূতের চোখের জল। সবাই তো খেপিয়েই এল চিরকাল। গার্লফ্রেন্ড নেই বলে, লাজুক ছিলাম বলে। এবারে সবাই বলবে বউ পালানো জীমূত। কী মজার একটা ব্যাপার হবে। সবাই তো খোরাক করতে ভালোবাসে।
মানুষের দুর্দশায় পাশে থাকার চেয়ে তার গায়ে আরও কাদা ছুড়লে মানুষ বেশি খুশি হয়। একটা লোক, যে সুদূর ভুবনেশ্বরে বসে আমার জীবনে কী হবে, আমার বউ কী করবে ঠিক করে দেবে, আর একটা ভেড়া আমি, সারাজীবন সেভাবে চলব। আমার হৃদয় বলে কিছু থাকবে না, সেটা যেন পাথর দিয়ে তৈরি হতে হবে, ওরা তো এটাই ভেবেছিল। যেন কিছু টাকা ধরে দিয়ে ক্ষতিপূরণ দিলেই মানুষের সব ক্ষত নিরাময় হয়ে যায়। কত সহজ সব কিছু।
পার্শ্বচরিত্র হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য পৃথিবীতে এসেছি। বরাবরই এরকম কপাল। ভালো রেজাল্ট করেও মনের মতো চাকরি পেলাম না। বাড়িতে টাকা দিয়েই সব টাকা শেষ হয়ে যায়। শখ, আহ্লাদ কিছুই তো সেভাবে পূরণ করলাম না কোনও কালে। হুট করে বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের পর থেকে যা যা হয়ে চলেছে, তা কোনোটাই আমার হাতে নেই। সব যেন মাদারির খেলা চলছে। নিষ্ঠুর কেউ একজন বিচ্ছিরি হাসতে হাসতে সব নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে।
টিভি চালালাম। টিভিতে টেনিস চলছে। এক কেরিয়রের শেষ দিকে চলে যাওয়া খেলোয়াড় কী চমৎকার খেলছেন! মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম। এদের জীবনে কোনও দুঃখ কষ্ট নেই? সারাদিন খেলে গেলেই হল? কষ্ট তো আছে নিশ্চয়ই। ভেঙে যাবার কষ্ট, দিন ফুরিয়ে যাবার কষ্ট, একজন মানুষের তো সব কিছু মসৃণ হতে পারে না। শৃঙ্গে যে ওঠে, তারই চাপ সবথেকে বেশি। ওখানে তো একজনই থাকবে। তাকে প্রাণপণে সরানোর চেষ্টা করবে সবাই। সে ক্ষতবিক্ষত হবে, লড়াই করে যাবে, রক্তাক্ত হবে, জিতলেই হবে না, সে লড়াই সর্বক্ষণের।
অনিরুদ্ধকে যেভাবে ঠেকিয়েছি বউয়ের কাছে পৌঁছোতে, সেও তো অনেকটা সেরকমই। মুহূর্তের জয় হয়েছে আমার, জয় বলাও ঠিক না, বউ তো জানে না। কিছুই জানে না। ও জানলে কি আর আমার এই ব্যবহার মেনে নিতে পারত? অনিরুদ্ধকে ও ভীষণ ভালোবাসে। জোর করে একটা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার কোনও মানে হয় না। কলকাতা ফিরে সমস্ত ঝামেলা মিটিয়ে ফেলতে হবে।
টেবিলে রাখা গ্লাসে খানিকটা মদ বেঁচে ছিল। সবটা খেয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলাম। বৃষ্টিটা ধরেছে। শব্দ কমে এসেছে। কোটটা পরে মাফলারটা মাথায় নিয়ে দরজা খুলে বেরোলাম।
ঠান্ডা আছে, শহরটা পুরো নিঝুম নিস্তব্ধ হয়ে আছে। রুমের দরজা বন্ধ করে সেদিকে একবার তাকালাম। একটা লাইন মনে পড়ে গেল, “কে মোরে ফিরাবে অনাদরে কে মোরে ডাকিবে কাছে।”
আমাকে কে কাছে ডাকবে? আমার তো কেউ নেই। এই ঘরেও আমার কোনও কাছের মানুষ নেই।
ফিরে কী হবে আর?
ধুস!
রাস্তার দিকে হাঁটা লাগালাম।
ফিরে আর কী হবে?
৬০ আত্রেয়ী
অমৃতকে ইচ্ছা করেই বারণ করেছিলাম। ওর অফিসে ছুটি নেই। রাস্তায় বাইক নিয়ে বেরোলেই ঠান্ডা লাগত।
প্রথমে রাজি হয়েও তাই ফোন করে বলে দিয়েছিলাম আসতে হবে না।
সমস্যা হল তারপর হোয়াটসঅ্যাপে পাচ্ছি না, ফেসবুকেও অফ দেখাচ্ছে।
হাসলাম। এই সমস্যা ছেলেটার। এত রেগে যায় অল্পতে যে সে রাগ বাগে আনতে অবস্থা খারাপ হয়ে যায়।
আবার ফোনে না পেলে আমারও অস্থির লাগে। অভিমানও হয়। একটু তো কথা বলে ঘুমোনো যেত। অনিন্দিতাদিকে নিয়ে যা গেল, এখন একটু অমৃতর সঙ্গে শেয়ার করলে মাথাটা ঠান্ডা হত। ছেলেটা এরকমই। ভীষণ অবুঝ। বাচ্চাদের মতো। আমার এখন মন খারাপ লাগছিল। মনে হচ্ছিল চলে গেলেই হত। অন্তত জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ থাকতে পারতাম। ভালোবাসায় যে চুমু খাওয়া, জড়িয়ে ধরাও এত গুরুত্বপূর্ণ, আগে বুঝিনি। শরীর ব্যাপারটাকেই ভয় পেতাম খুব।
