অনেক রাতে আত্রেয়ী মেসেজ করল হোয়াটসঅ্যাপে কয়েকটা। দেখলাম। উত্তর দিলাম না। ভালো লাগছিল না।
কয়েক মিনিট পরে আত্রেয়ী ফোন করল, “এই, কী হয়েছে তোমার? রিপ্লাই করছ না কেন?”
আমি বললাম, “ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।”
আত্রেয়ী বলল, “মিথ্যে কথা বলছ কেন? তুমি জানো না আমি মিথ্যে পছন্দ করি না? ঘুমিয়ে পড়েছিলে যখন তাহলে মেসেজগুলো সিন হল কী করে?”
আমি বললাম, “হয়ে গেছে কোনও ভাবে। টেকনিক্যাল ফল্ট হতে পারে ফোনের। তোমার কী খবর? ছেলেদের প্রতি বিতৃষ্ণা এখন কোন স্টেজে আছে? কমেছে না বেড়েছে?”
আত্রেয়ী একটু চুপ করে থেকে বলল, “তোমার মনে আছে অমৃত, আমি একসময় বলতাম আমি আদর পছন্দ করি না, কেউ আদর করার কথা বললেও আমার ভয় লাগে?”
আমি বললাম, “হুঁ।”
আত্রেয়ী বলল, “সেই আমিই তো বারবার তোমায় আদর করি, তোমার ঠোঁটে চুমু খাই, আমিই তো, তাই না?”
আমি বললাম, “হুঁ। তুমিই।”
আত্রেয়ী বলল, “তুমি তো আমাকে পালটে দিয়েছ অমৃত। আমি তোমার জন্য বসে থাকি, তোমাকে একটু ছুঁতে আমার কত ভালো লাগে। সেই তুমি আমাকে একটু সময় দিতে পারো না?”
কথাগুলো শুনে আমার সব কেমন গুলিয়ে গেল। বললাম, “কী হয়েছে তোমার?”
আত্রেয়ী বলল, “কিছু না। তুমি একটু বড়ো হও না, আমাকে একটু জড়িয়ে থাকো, তাহলেই হবে। আমি আর কিছু চাই না। একটু মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ো, কাছে রেখে দিয়ো… খুব বেশি দাবি তো নেই কোনও দিনই।”
আমি বললাম, “কী হয়েছে বলবে তো!”
আত্রেয়ী বলল, “আমার কিছু ভালো লাগছে না। একটু একটু তোমার কথাও মনে পড়ছে। আদর খেতে ইচ্ছা করছে।”
আমি অবিশ্বাসী গলায় বললাম, “সত্যি? না আমাকে শান্ত করার জন্য এসব বলছ?”
আত্রেয়ী বলল, “তুমি যেটা ভাববে।”
আমি বললাম, “রাতের কলকাতায় আমার বাইকের পেছনে বসে ঘুরবে?”
আত্রেয়ী কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল, “এসো।”
৫৮ অমৃত
ব্রেক আপে কি খুব কষ্ট হয়?
দেখা যাক হয় নাকি!
আমি এই রাতে ঠিক করলাম আত্রেয়ীর সঙ্গে ব্রেক আপ করব।
তৈরি হয়ে বাইক নিয়ে বেরচ্ছিলাম, আত্রেয়ী ফোন করল, ধরলাম, “হ্যালো।”
“তুমি কি বেরিয়ে গেছ?”
“এই বেরোচ্ছি, কেন বলো তো?”
“শোনো না, ইচ্ছা করছে না রাতে বেরোতে। বরং কাল বিকেলেই স্কুলে এসো। অবশ্য যদি অনিন্দিতাদির সঙ্গে কোথাও যেতে হয় তাহলে জানিয়ে দেব। পরে দেখা যাবে। আজ আর এসো না।”
আমি “আচ্ছা” বলে ফোনটা রেখে গুম হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ।
ভালোবাসায় দু হাতে তালি না বাজলে বড়ো বিপদ। যার সঙ্গে নিয়মিত দেখা হত, দেখা করার জন্য ছটফট করত, তার সঙ্গে যদি দেখা করতেই তার আর ইচ্ছে না করে তাহলে বুঝতে হবে সে সম্পর্কের মেয়াদ ফুরিয়েছে।
আমি বাইক রাখলাম না। বেরিয়ে গেলাম।
আত্রেয়ী বলত বটে ওর কাউকেই বেশিদিন ভালো লাগে না। আমার ক্ষেত্রেও তেমন হল তার মানে। ওর আমাকে আর ভালো লাগছে না। হতেই পারে। প্রতিটা সম্পর্কই তো সাপের খোলস ছাড়ার মতো হয়। হয়তো অন্য কাউকে ভালো লেগে গেছে ওর। হতে পারে। আমার মধ্যে তো অনেক সমস্যা আছে। আমি গোঁয়ার, একরোখা, পজেসিভ। এসব ওর মতো ইন্ডিপেন্ডেন্ট মেয়ে কেন মানতে যাবে?
কলকাতা শহরের বুক চিরে বাইকটা চলছিল। রাস্তায় গাড়ি কমে এসেছে। সায়েন্স সিটির কাছাকাছি চলে এসেছিলাম, একজন পুলিশ হাতছানি দিয়ে গাড়ি দাঁড় করাল। আমাকে বলল, “কাগজ দেখি।”
আমি গাড়ির ডিকি খুলতে গিয়ে কী মনে হতে পুলিশের দিকে তাকিয়ে দেখি আমার স্কুলের বন্ধু সব্য। আমি ডিকি বন্ধ করে বললাম, “কী রে ভাই, মাঝরাতে ঘুষ খাবার ধান্দা করছিস লজ্জা লাগে না?”
সব্য হেলমেটের ভিতর দিয়ে আমাকে দেখে বোঝেনি। বলতে যাচ্ছিল, “কে রে?”
আমি তড়িঘড়ি হেলমেট খুললাম। আমাকে দেখে হেসে ফেলে চেঁচিয়ে উঠল, “অমু নাকি! ওরে বাবা। বিরাট ব্যাপার তো!”
আমি বললাম, “ঘুষ খাচ্ছিস নাকি রে?”
সব্য বলল, “না, ঘুষের কিছু না। এই রাত্তিরে বাইকারসের জ্বালায় লোকজন অস্থির হয়ে পড়ে। রুটিন চেক আপ করছিলাম। তোর খবর কী? বিয়ে করলি?”
আমি বললাম, “নাহ। এখনও করিনি। তুই?”
সব্য বলল, “করেছি। একটা ছেলেও আছে বছর চারেকের। আয় ভাই, চা খেয়ে যা।”
থানার ভিতর নিয়ে গেল সব্য। চেয়ারে বসিয়ে যত্ন করে চা খাওয়াল। বলল, “পুলিশের চাকরি যে কী জিনিস ভাই, যারা করে তারাই জানে। কত রকম লোক, কত রকম ক্রাইম, বাড়ি গিয়ে নিজের বউয়ের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েও খিঁচিয়ে উঠি। কালচারাল শকের মধ্যে দিয়ে যাই প্রতিদিন। ভালো লাগে না জানিস তো। সিরিয়াসলি ভালো লাগে না। তবু পেটের ব্যাপার। করতেই হবে। কী আর করার। তুই এত রাতে বেরিয়েছিস কেন?”
আমি বললাম, “গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে ঝামেলা হয়েছে। মেজাজ ঠিক করতে ঘুরছি।”
সব্য হো হো করে হেসে উঠে বলল, “বিরাট ঝামেলা বুঝি?”
আমি বললাম, “হ্যাঁ সেরকমই।”
সব্য বলল, “কী করে সে?”
আমি বললাম, “অঙ্কের টিচার।”
সব্য চোখ বড়ো বড়ো করল, “খেয়েছে। খুব রাগি?”
আমি বললাম, “না সেরকম না।”
সব্য বলল, “তা ঝামেলা কী নিয়ে হল?”
আমি বললাম, “হয়েছে। ওই আর কি। চা-টা বেশ ভালো। থানার জল খাব কোনও দিন ভাবিনি। তুই তো থানার চা খাইয়ে দিলি ভাই।”
সব্য বলল, “তা ঠিক। এই একটা জিনিসই ভালো। জাগতে হবে। এসব জায়গা ভীষণ সেন্সিটিভ জানিস তো। কলকাতা পুলিশের রেসপন্সিবিলিটি মারাত্মক, আর পুরোপুরি থ্যাংকলেস জব। কাজ ভালো করলে বাহবা নেই। পান থেকে চুন খসলে তো কাগজ খুললেই দেখতে পাস।”
