আমি হতভম্ব গলায় বললাম, “মানে?”
বউ বলল, “মানেটা সিম্পল। তুমি জড়িয়ে যাচ্ছ। জড়িয়ো না। ডিভোর্স চাইছ যখন পেয়ে যাবে।”
আমি বললাম, “ভালোবেসে ফেলছি? এইসব ওভারকনফিডেন্স পাও কোত্থেকে? তোমার মতো মেয়েকে আমি ভালোবাসব ভাবো কী করে? আমি কি পাগল?”
বউ হাসল, “তোমার লক্ষণগুলো তো তাই বলছে। সারাক্ষণ অনিরুদ্ধ আর আমাকে জড়িয়ে উলটোপালটা ভেবে যাচ্ছ। গেট এ লাইফ। যাও, হুইস্কি নিয়ে এসো। চিপসও এনো। খাই। আনন্দ করি। আমাকে বন্ধু ভাবো না!”
আমি গোঁজ হয়ে বসে বললাম, “তোমার মতো বন্ধু আমার চাই না।”
বউ বলল, “ঠিক আছে। শত্রুই ভাবো। খুব বাজে, রাস্তার পচা গলা নোংরা একটা মেয়ে ভাবো। কিন্তু মানুষ তো ভাবো? নিজের ছুটিটা নষ্ট কোরো না। আমি খেপি হতে পারি, কিন্তু এটা মন থেকে বললাম। আমি বুঝতে পারছি, এই খেলায় তোমাকে জড়িয়ে আমি তোমার অনেক বড়ো ক্ষতি করে দিলাম। বিশ্বাস করো, আমি বুঝতে পারিনি, ব্যাপারটা এরকম হতে পারে। নিজের মোহে চলতে চলতে কখন যে তোমার আর অনিরুদ্ধর বউয়ের জীবনটা নষ্ট করে দিলাম, বুঝিনি।”
আমি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বললাম, “কী মদ খাবে?”
বউ হাসল, “যা তুমি খাওয়াবে। খেয়ে উলটে পড়ে থাকব।”
আমি রুম সার্ভিসে ফোন করলাম। ওরাই দিয়ে গেল। স্যালাড, চিপস, ড্রাই চিলি চিকেন আর একটু দামি হুইস্কি।
বউ জল না মিশিয়ে একবারে ষাট মিলিলিটার গলায় ঢেলে বলল, “এভাবে বিষ খাওয়া গেলে কবে মরে যেতাম। বেঁচে থাকা বড়ো কষ্ট। টিনএজ প্রেগনেন্সির মতো বাজে জিনিস বোধহয় আর কিছু হয় না।”
আমি কথা না বলে এক চুমুক দিলাম। জিনিসটা গলা দিয়ে নামতে নামতে এক অদ্ভুত হতাশা গ্রাস করছিল আমাকে। বউ চুল ছেড়ে দিয়েছে। কী সুন্দর লাগছে ওকে!
আমি সত্যিই ওকে ভালোবেসে ফেলেছি?
ভয় পেয়ে গেলাম।
ঘেন্না করতে করতে ভালোবেসে ফেললাম নাকি?
৫৭ অমৃত
বউদিকে বাজারের ব্যাগ দিয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে বাবার সঙ্গে টিভি দেখতে বসলাম। বাবা মনোযোগ দিয়ে সিরিয়াল দেখছে। বাড়ির বউকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে। সবাই দাঁড়িয়ে আছে।
বাড়ির বউ কাঁদছে খুব। কঠিন সময়।
বাবা আগে এসব সিরিয়াল দেখত না। রিটায়ার হবার পর দেখতে শুরু করেছে। এই সিরিয়ালের জ্বালায় অফিস থেকে এসে আমি বাবার সঙ্গে বসতে পারি না।
বিরক্ত গলায় বললাম, “নিউজ চ্যানেলটা দাও না।”
বাবা বলল, “তুই টিভি কিনে ফেল। আমাকে দেখতে দে। জ্বালাস না এখন।”
আমি উঠতে যাব, এমন সময় বউদি এসে বলল, “এই তুমি আবার ঝগড়া করছ না আত্রেয়ীর সঙ্গে?”
আমি অবাক গলায় বললাম, “কেন বলো তো? কী হয়েছে?”
বউদি বলল, “তোমাকে আমি গোবিন্দভোগ চাল আনতে বললাম, তুমি মিনিকেট নিয়ে চলে এলে? তোমার কি মাথাটা গেছে?”
আমি বুঝলাম কেলো করে ফেলেছি। বললাম, “ঠিক আছে, নিয়ে আসছি।”
বাবা বলল, “ওকে বলে লাভ নেই, ওর দাদাও যখন প্রেম করত এসবই করত। একবার কাপড় কাচার সাবান আনতে বলায় ফিনাইল নিয়ে এসেছিল। এসব হয় বউমা। তুমি চিন্তা কোরো না।”
বউদি লজ্জায় পালিয়ে গেল। আমি উঠে দাঁড়ালাম। বাবা বলল, “এবারে ঝগড়া কী নিয়ে?”
আমি বললাম, “তুমি সিরিয়াল দ্যাখো না। এসব জেনে কী করবে?”
বাবা বলল, “সিরিয়াল দেখতে দেখতেই ঘরসংসারের খবর রাখতে হয়। ইন্দ্রের সভায় অপ্সরারা নাচে না? তাও কি সৃষ্টি চলে না?”
আমি বললাম, “ওসব কাল্পনিক ঘটনা। ওর সঙ্গে তোমার কি যোগ? ভুলভাল বোকো না তো। রিটায়ারমেন্টের পর তুমি কেমন যেন হয়ে যাচ্ছ। এসব সিরিয়াল মানুষে দ্যাখে?”
বাবা বলল, “গোরু ছাগলের মতো ঝগড়া করে প্রেম করার থেকে সিরিয়াল দেখা ভালো। যাক গে, আমার জন্য ফ্লেক নিয়ে আসিস এক প্যাকেট।”
আমি বললাম, “ওসব খেয়ো না। ডাক্তারবাবু বারণ করলেন না?”
বাবা রেগে গিয়ে বলল, “ডাক্তারবাবু নিজে সারাদিন দশ প্যাকেট খাচ্ছে আর আমাকে কী বলল, তাই নিয়ে পড়ে আছিস। আচ্ছা, গোটা প্যাকেট আনতে হবে না। খান পাঁচেক আনলেই হবে। আমার প্যান্টের পকেটে টাকা আছে, নিয়ে যা।”
আমি বললাম, “থাক থাক। আর টাকার গরম দেখাতে হবে না। নিয়ে আসছি।”
বাবা বলল, “হ্যাঁ রে, তুই কি আমায় শান্তি দিবি না? ঝগড়া করেছিস কেন? আমি ভাবছি বিয়ের কথা এগোব, তুই যদি এরকম করতে থাকিস তাহলে তো মহা সমস্যা হবে।”
আমি বাবার কথার উত্তর না দিয়ে দরজা খুলে রাস্তায় নামলাম।
পাড়ার মুদির দোকানে গিয়ে আবার ভুলে গেলাম কেন এসেছিলাম, বউদিকে ফোন করলাম। বউদি ধরল, “হ্যাঁ বলো।”
আমি বললাম, “তুমি কী আনতে বলেছিলে যেন?”
বউদি বলল, “মধুদাকে দাও। তোমাকে আর বলব না।”
আমি ফোনটা মুদির দোকানদার মধুদাকে দিলাম। মধুদা শুনে চাল দিয়ে দিল। আমি প্যাকেটটা নিয়ে বাড়ি এসে বউদির হাতে দিলাম।
বউদি বলল, “তোমার অবস্থা সঙ্গিন অমু। এরকম হাল করে ছেড়ে দিল তোমাকে মেয়েটা?”
আমি অন্যমনস্ক গলায় বললাম, “হুঁ।”
বউদি বলল, “বিয়ে করে নাও তাড়াতাড়ি। এভাবে যত দূরে থাকবে, তত ঝগড়া হবে। কাছে থাকলে কিচ্ছু হবে না। তখন একটা সিস্টেমে ঢুকে যাবে তো, অত সমস্যা হবে না।”
জ্ঞান শুনতে ভালো লাগছিল না। চুপচাপ সরে পড়ে ঘরে এসে দরজা দিলাম।
রাতে খেলামও না। ভালো লাগছিল না।
