আমি অনিন্দিতার হাত ধরে কাঁদো কাঁদো গলায় বলেছি, “বিশ্বাস করো, এ সবই আমি করেছি আমার একাকিত্ব থেকে। আমি ভীষণ একা অনি। তুমি কলকাতা থাকো, আমার মাথায় যেন শয়তান বাসা বাঁধে। সব কিছু জেনেও আমি পতঙ্গের মতো আগুনের দিকে ছুটে যাই। এই, এই দ্যাখো, আমি সবখান থেকে ঋতুজাকে ব্লক করে দিলাম।”
অনিন্দিতা আমার বুকে মাথা রেখে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “কাউকে কিছু করতে হবে না। আমি ঠিক করেছি, আমি চাকরিটা ছেড়ে দেব। আমি তোমার কাছে গিয়ে থাকব। তোমাকে আর একা থাকতে হবে না।”
আমি প্রমাদ গুনে বললাম, “না, না সোনা, একদম না। চাকরি ছাড়বে কেন? নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছ তুমি। কত ইম্পরট্যান্ট বলো তো সেটা? আমি তোমাকে চাকরি ছাড়তে দেব না। আমাকে আর তিন মাস সময় দাও, আমি ভুবনেশ্বর থেকে কলকাতায় ট্রান্সফার নিয়েই ছাড়ব। তোমাকে ছাড়া আমি আর কোনও দিকে তাকাও না। প্লিজ আমায় সুযোগ দাও।”
অনিন্দিতা কেঁদেছে, বলেছে, “এভাবে বলতে হবে না।”
আমি আরও কেঁদে বলেছি, “তাহলে কথা দাও আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না।”
অনিন্দিতা কাঁদতে কাঁদতে আমাকে জড়িয়ে ধরেছে।
বাকিটা আমি বুঝে নিয়েছি।
এখন কেমন পরম নিশ্চিন্ত হয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাচ্ছে।
একটা নিঃশ্বাস ফেললাম। মেয়েরা হল নরম জাত। কথায় কী সুন্দর তাদের টুপি পরানো যায়।
ঋতুজা শুধু ফিরুক। ওর শরীরে মুখে না গুঁজে শুলে আমার নামও অনিরুদ্ধ নয়। তবে ব্যাক আপ প্ল্যান রাখতে হবে। শুধু ঋতুজাকে পেলে হবে না। এখন ঋতুজার বর তক্কে তক্কে থাকবে। নজরে রাখবে। ঋতুজার পক্ষে আমার কাছে আসা এখন অত সহজ হবে না।
কিন্তু আমার তো নারী শরীর চাই, নতুন পারফিউমের গন্ধ, যোনির গন্ধ, নাভির স্বাদ, স্তনের আকুলতা চাই! অস্থির লাগছিল। অনিন্দিতা পুরোনো হয়ে গেছে।
ঋতুজা পুরোনো না হলেও দুর্গম হয়ে গেছে।
আমাকে যে মেয়েটা ফোন করেছিল, তাকে ফোন করতে হবে।
ভুবনেশ্বরের মেয়েদের সঙ্গে শুয়ে ভালো লাগে না।
সবথেকে বড়ো বাধা হল ভাষা। তার থেকেও বড়ো ভয় অপরিচিত মেয়েদের সঙ্গে শুলে রোগের। আমার এসকর্ট সার্ভিস ভালো লাগে না।
ভালো লাগে অনাস্বাদিত ঘ্রাণের মতো নতুন নতুন নারী শরীর। প্রতিটা মেয়ে আশ্রয় চায়, ঘর চায়। প্রতিটা মেয়ের প্রচুর ইনসিকিউরিটি থাকে। একটা পুরুষ কাঁধ চায় যেখানে মাথা রেখে নিশ্চিন্ত থাকতে পারবে। সেই ফাঁক দিয়ে আমাকে ঢুকতে হবে।
অনিন্দিতার পেটে হাত বোলালাম। সন্তান আসছে। সন্তান? ধুস! কী বাজে ইমোশনাল ব্যাপার।
হঠাৎ মাথায় একটা কথা আসতে উঠে বসলাম।
ঋতুজার সঙ্গে ছেলেটা শুচ্ছে? ঋতুজা যদি প্রেগন্যান্ট হয়ে যায়?
৫৬ জীমূতবাহন
আমার এক বন্ধু আছে, বিয়ের আগে থেকে বউকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে পাগল করে দেয়। ওর বউ কোথায় একটা বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে গেছে, সেখানে এক ছেলের পাশে বসে ফটো দিয়েছে, বন্ধু ওর বউকে পাগল করে দিয়েছিল কেন ছেলেটার গা ঘেঁষে বসেছে। ওর বউ বলেছিল ও তো আমার ভাইয়ের মতো। ছেলেটা বলেছিল নিজের মায়ের পেট থেকে তো বেরোয়নি! যে ভাই নিজের পেট থেকে বেরোয়নি, সে ভাইও হতে পারে, সুধীর ভাইও হতে পারে। সে নিয়ে তুমুল বাওয়াল লাগলেও বিয়েটা হল।
বিয়ের কিছুদিন পর সেই বন্ধুকে নিয়ে তুমুল ঝামেলা হয়েছিল ওদের। শেষমেশ বন্ধুটার ওদের বাড়ি যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছিল। বন্ধুটা বরাবরই এরকম। মারাত্মক পজেসিভ।
আর রইলাম আমি! পজেসিভ হব কি না বোঝা-টোঝার আগে এমন বউ পেলাম যে কিনা বিয়ের আগে থেকেই সব সেটিং করে এসেছে। ছোটোবেলায় “একটি মোরগের কাহিনী” পড়েছিলাম।
নিজেকে সেরকম মোরগ মোরগ মনে হয়। কেমন আমার রোস্ট করে অনিরুদ্ধ আর আমার বউ খাবে।
আমার বন্ধুটা বলে যে প্রেমিক পুরুষ তার প্রেমিকাকে ছেলেদের সঙ্গে ঘষাঘষি করতে দেখলে রাগে না সে আসলে প্রেমিকই না। ভেড়া মানব।
আমি অবশ্য জানি আমি ভেড়া মানব নই। যেদিন অনিরুদ্ধকে সামনে পাব, কাঠ খুলে হাতে ধরিয়ে দেব।
ওদের কথা ভাবলেই আমার মাথায় ভিসুভিয়াস জ্বলে। মানুষ এত প্যাঁচালো হয় কী করে? কী করেই বা নিজে বিয়ে করার পরেও অন্যের বউকে নিয়ে টানাটানি করে? কেন করবে? কী ধরনের মানসিকতা থেকে এসব প্রবৃত্তি আসে?
আবার মাঝে মাঝে মনে হয়, যে সম্পর্কটা আমি আর টানবই না, সেটা নিয়ে কেন এত ভাবছি? সব তো শেষ হয়েই যাবে। তারপর এরা যা ইচ্ছা করুক, শুধু আমার ডিভোর্সটা দিয়ে দিক। জ্বলে ওঠা কোনও আগুনকে দুভাবে নেভানো যায়। জল দিয়ে, নয়তো তাকে পুড়তে দিয়ে। পুড়তে পুড়তে একসময় সব ছাই হয়ে যায়।
আমার বউয়ের জ্বলন্ত প্রেমে আমি জোর করে যতই জল দি, খুব ভালো করে বুঝতে পারি ও ঘুরে ফিরে অনিন্দিতার বরের কাছেই যাবে। খামোখা কেন আমি জোর করতে যাই? যা পারে করুক।
গাড়ি রাবংলায় ফিরল বিকেল নাগাদ। হোটেলের রুমে ঢুকলে আমি বউকে বললাম, “তোমাকে একটা ফোন কিনে দেব। তুমি যেখানে ইচ্ছে ফোন কোরো। আমি কিছু বলব না।”
বউ বলল, “দরকার নেই। আমি আবার কথা বলব, আবার তুমি ফোন ছুড়ে মারবে। কলকাতায় গেলে আমি নিজে থেকেই ফোন কিনে নেব। তোমাকে দিতে হবে না।”
আমি বললাম, “ওকে। যা ইচ্ছে তোমার।”
বউ খাটে বসে টিভি চালিয়ে অন্যমনস্ক গলায় বলল, “তুমি আমাকে ভালোবেসে ফেলছ। সমস্যায় পড়বে।”
