বউ আর আমি একসঙ্গেই ছুটলাম। এই সব তীব্র কষ্টের পর কি আর ঘোরা সম্ভব? ফলশ্রুতি হল হালকা হয়ে ড্রাইভারকে বলে ফের রাবংলার পথেই রওনা হওয়া গেল।
বউ আমার দিকে ফিক ফিক করে হাসতে হাসতে বলল, “এইজন্য বলে পরের কষ্টে আনন্দ পেতে নেই।”
আমি রাগি গলায় বললাম, “হুঁ। খুশি হয়েছ তো?”
বউ বলল, “হেবি। এই তুমি সাবান দিয়ে হাত ধুয়েছ তো?”
আমি বললাম, “কেন ধোব না? আমাকে কী মনে হয়? ধুই না? নিজে ধুয়েছ?”
বউ বলল, “ধুয়েছি। আসলে তুমি সব সময় এমন তিরিক্ষে মেজাজে থাকো, হতেই পারে, এমন রেগে গেলে যে সাবান দিয়ে হাত ধুতেই ভুলে গেছ। হতেই পারে তো, তাই না?”
আমি বললাম, “এসব ফালতু প্রশ্নের উত্তর দেবার সময় আমার নেই। তুমি পাহাড় দ্যাখো না। কী সুন্দর সবুজ পাহাড়, এত সুন্দর পরিবেশে তোমার মাথায় এখনও এসব ঘুরছে কেন?”
বউ বলল, “আমার যখনই মনে পড়ছে আমার ওপর আপারহ্যান্ড নিতে গিয়ে তোমারও নিম্নচাপ এসে গেছিল, তখনই ভীষণ হাসি পেয়ে যাচ্ছে।”
আমি বললাম, “এক কাজ করো, তুমি একবারে হেসে নাও। গাড়ি দাঁড় করাতে বলব?”
বউ বলল, “না না, দরকার নেই। আমার এখন ম্যাগি খেতে ইচ্ছা করছে, ড্রাইভারকে বলে রাখো, যেখানেই পাওয়া যায়, গাড়ি দাঁড় করায় যেন।”
আমি বললাম, “হোটেলে ফিরে যত ইচ্ছা খেয়ো। আবার যদি কোথাও গাছ-টাছ পড়ে রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়, আর-এক কেলোর কীর্তি হবে।”
বউ বলল, “কিছু কেলোর কীর্তি হবে না, কী আর হবে, সারারাত রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। পাহাড়ে এসেছ যখন, সব রকম এক্সপেরিয়েন্স করে নাও। মনের মধ্যে সারাক্ষণ বিষ পুষে রাখা ভালো না, বুঝলে?”
আমি বললাম, “সারাক্ষণ অন্যের সংসার ভাঙার কথা ভাবার থেকে মনে বিষ পুষে রাখা ভালো।”
বউ বলল, “মানে? অন্যের সংসার ভাঙা মানে? আমি কোথায় অন্যের সংসার ভেঙেছি?”
আমি বললাম, “অনিন্দিতার সংসার ভাঙছ। একটুও আগে পিছে না ভেবে ভাঙছ। মনে বিন্দুমাত্র পাপবোধ না রেখে ভাঙছ।”
বউ বলল, “শোনো, তুমি এসব নিয়ে মাথা ঘামিয়ো না। তোমার বিন্দুমাত্র সেন্সিটিভ মন থাকলে এসব নিয়ে ভাবতে না।”
আমি বললাম, “সেন্সিটিভ মনের ভাই হয়েছে। সেন্সিটিভের কী আছে? দামড়া ছেলে মেয়ে, অতই যদি প্রেম তবে বিয়ে করে দুজনের জীবন নষ্ট করার কী দরকার ছিল? নিজেদের মধ্যে বিয়ে করে নিজে নিজে মারামারি করে মরলেই পারতে? অবশ্য এখন তাই করবে। এই টাইপের পাবলিকের সঙ্গে দুদিন থাকো না, তাহলেই বুঝবে কত ধানে কত চাল।”
বউ বলল, “আমার এই সব কথা ভাল্লাগছে না। তুমি টপিক চেঞ্জ করবে? আমি তো তোমাকে বলেছি, ফিরে গিয়ে ডিভোর্স দিয়ে দেব। কেন শুধু শুধু অনিকে টানছ বলো তো?”
আমি গুম হয়ে বসে বললাম, “কষ্ট হয় খুব?”
বউ বলল, “তোমার এ কথার আমি উত্তর দিতে বাধ্য নই।”
মাথায় আগুন জ্বলছিল। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে বললাম, “দিয়ো না। তোমার সে বোধ বুদ্ধি থাকলে ওই জন্তুটার সঙ্গে যেতেও না তুমি। গান্ডু কি আর গাছে ফলে?”
বউ বলল, “তুমি আমাকে গান্ডু বললে?”
আমি বললাম, “খারাপ লাগল? গাড়ি থেকে নেমে যেতে পারো। এক কাজ করো, তুমি বরং নেমেই যাও, নেমে তোমার অনিরুদ্ধকে খবর দাও। লাফাতে লাফাতে এসে বানচোদটা তোমায় উদ্ধার করে নিয়ে যাক।”
বউ থমথমে গলায় বলল, “তুমি এরকম করলে তাই করতে হবে। আমি কদিন এসব ভুলে থাকতে চাইছিলাম। তুমি সেটা দেবে না, তাই না?”
আমি বললাম, “আমার যখনই মনে পড়ে, আমার জীবন, অনিন্দিতার জীবন তুমি নষ্ট করে দিয়েছ, আমার মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে।”
বউ বলল, “ঠিক আছে। আগুনটা কিছু দিয়ে চাপা দিয়ে রাখা যায় না? কলকাতা গিয়ে নাহয় সেটায় ফুঁ দিয়ো।”
আমি জানলার বাইরে তাকালাম। প্রকৃতিও চুপ মেরে গেছে।
ড্রাইভারকে বললাম, যে দোকানে ম্যাগি পাওয়া যাবে সে দোকানে দাঁড়াতে।
বউ বলল, “লাগবে না। আমার খিদে চলে গেছে।”
আমি বললাম, “তুমি খেয়ো না। আমি খাব। খেতে হবে না তোমায়।”
বউ আর কিছু বলল না। চোখ বন্ধ করল।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ল আমি স্পষ্ট বুঝলাম।
এরকম ইচ্ছাঘুম হলে জীবনটা এত অসহ্য হত না বোধহয় আমার।
৫৫ অনিরুদ্ধ
ঋতুজাকে আমার এমনি এমনি ভালো লাগেনি।
ঋতুজা এমনি এমনি আমার অভ্যাস হয়ে ওঠেনি।
একটা মেয়ের সঙ্গে শোয়ার পর আমি তার ওপর থেকে সমস্ত ইন্টারেস্ট হারিয়ে ফেলি।
শোয়া হয়ে গেলে তো মেয়েটার সমস্ত রহস্যই শেষ হয়ে গেল।
তার আগে মেয়েটা কত রকম কথা বলে, তার সঙ্গে সময় দিই, সমস্ত কথায় পার্টিসিপেট করি।
শোয়ার পরও মেয়েটা কথা বলে।
আমি ছুতো খুঁজি পালাবার।
ঋতুজা শোয়ার পরে নানারকম পাগলামি করে। এইজন্য ওকে আমার ভালো লাগে।
ভালোবাসা অবশ্য অন্য জিনিস। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে আজ অবধি আমি কাউকে ভালোবাসিনি। ভালোবাসা অত সহজ জিনিসই না।
এখন রাত একটা।
তুমুল ভালোবাসা, শারীরিক সম্পর্কের পরে অনিন্দিতা আমার পাশে ঘুমাচ্ছে সম্পূর্ণ অনাবৃত হয়ে। আমার বুকে ওর একটা হাত। ওকে আমি বুঝিয়েছি, ঋতুজা পাস্ট। আমার ভবিষ্যৎ ও-ই। আমার সন্তান আসছে ওর কাছে। এখন অন্য কিছু ভাবতেই পারব না।
হ্যাঁ, আমি ওকে ঠকিয়েছি। স্বীকার করে নিয়েছি। স্বীকার করে নেওয়ার পরে মেয়েরা আপনাকে বিশ্বাস করতে শুরু করে। তর্ক করবেন না। স্বীকার করে নেবেন।
