চুপ করে গিয়ে মাথা নিচু করলাম। পালস বোঝার জন্য। আমার কথার ঠিক কী উত্তর আসে জানতে হবে।
অনিন্দিতা বলল, “ভয় পেয়ো না, তোমাকে আমি কোনও রকম কোনও ঝামেলায় জড়াব না। ডিভোর্সটা মিউচুয়ালি করে ফেললে ভালো হয়। আর বাচ্চাটাকে আমি রাখব না।”
আমি বমি করার ভাব করলাম। জোরে জোরে ওয়াক টানতে টানতে মেঝেতে গড়াগড়ি দিয়ে থুতু ফেলতে লাগলাম আর কাঁদতে শুরু করলাম। অনিন্দিতা শক্ত ছিল এতক্ষণ, আমাকে এরকম করতে দেখে ভয় পেয়ে গিয়ে বলল, “কী হয়েছে তোমার?”
আমি বললাম, “এক ধরনের রোগ। তোমাকে বলিনি আগে। এই রোগে মনের সমস্ত যন্ত্রণা শরীরে চলে আসে। আমি ছটফট করছি সারাদিন ধরে, যতবার ভাবছি ঋতুজার ব্যাপারে, আমি মাটিতে মিশে যাচ্ছি। বিশ্বাস করো অনিন্দিতা, ঋতুজার সঙ্গে আমার কিছু নেই। ওর বিয়ে হয়ে গেছে।”
অনিন্দিতা জল নিয়ে এসে আমার গায়ে মাথায় দিতে দিতে বলল, “ঠিক আছে, সেসব পরে দেখা যাবে। এখন ডাক্তার দেখালে ভালো হয়।”
আমি হাঁফ ছাড়লাম।
এ ধরনের ড্যামেজ কন্ট্রোল রাহুল দ্রাবিড়ের ব্যাটিং-এর মতো। লোপ্পা বলে হাজারো লোভ থাকলেও বল শেষ মুহূর্তে ছেড়ে দিয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে খেলে যেতে হবে। একটা একটা রান।
জয় হবেই।
পর্যাপ্ত পরিমাণে সেন্টু দিলে মেয়েরা গলবেই।
অনিন্দিতা তো শিশু আমার লেভেলের পাবলিকের কাছে।
মেঝেতে শুয়ে অজ্ঞান হবার ভান করলাম।
অনিন্দিতা জল খাইয়ে দিল আমার মাথাটা ওর কোলে নিয়ে।
আমি মনে মনে হাসতে লাগলাম।
৫২ অমৃত
যে দেখা হওয়াটা রোজ হত, যে কথাটা রোজ হত, সেটাই হওয়া বন্ধ হয়ে গেলে অস্বস্তি হয়। দম বন্ধ হয়ে আসে। আত্রেয়ীকে ফোনে পাচ্ছি না, পেলেও ঠিক করে কথা বলছে না, দেখা করতে চাইছে না, আমার ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছিল।
কোনও মতে অফিস শেষ করে বাইক নিয়ে রাস্তায় উদ্দেশ্যহীনভাবে অনেকক্ষণ ঘুরলাম। ভালো লাগছিল না। বারবার মনে হচ্ছিল আত্রেয়ী আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছে। ঠিক করলাম আর ফোন করব না। যে কাফেটায় আমরা বসে কফি খাই, সেটায় ঢুকলাম। একটা কফি নিয়ে চুপ করে বসে রইলাম।
প্রেম করার সময় কাউকে দেখতে পাই না আত্রেয়ীকে ছাড়া। আর এখন আত্রেয়ী নেই, সবাইকে চোখে লাগছে। ওই যে কোণে দুজন বসে বসে খুনসুটি করছে কিংবা এক ভদ্রমহিলা এক প্রৌঢ়ের সঙ্গে বসে আছেন, এসব দেখতে দেখতে ফোনে আত্রেয়ী আর আমার ছবিটা অনেকক্ষণ ধরে দেখলাম। আমাকে জড়িয়ে ধরে আছে পরম নিশ্চিন্ততায়। দেখলে মনটা শান্ত হয়। চোখ বন্ধ করে আত্রেয়ীর আদরগুলো মনে করার চেষ্টা করলাম।
মনে করার চেষ্টা করলাম এই কাফেতেই দুজনে দুজনের হাত চেপে ধরা। ঘোর বৃষ্টিতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে দুজনের ঠোঁটে ঠোঁট মিশে যাওয়ার কথা মনে করলাম চোখ বন্ধ করে। নিজের মনকে প্রাণপণে বোঝানোর চেষ্টা করলাম আত্রেয়ী আমার। শুধু আমার। আর কারও নয়। সমস্ত রকম সমস্যা থেকে বেরিয়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরবেই ও। ওকে আসতেই হবে আমার কাছে।
ফোনটা বেজে উঠল, আত্রেয়ী ফোন করছে ভেবে তড়িঘড়ি সেটা হাতে নিতে দেখলাম বউদি ফোন করছে, ধরলাম, “বলো।”
বউদি বলল, “এই অমু, তুমি কোথায়? ফিরতে দেরি হবে?”
আমি বললাম, “তা একটু হবে, কেন বলো তো?”
বউদি বলল, “শোনো না, আমার বেশ কয়েকটা জিনিস দরকার। তোমার দাদা বাসন্তী পোলাও করতে বলেছিল সকালবেলা, এখন দেখছি গোবিন্দভোগ চালটাই নেই। আর কাজু কিশমিশও লাগবে। তোমার দাদাকে ফোন করছি, বলল, অফিসে ব্যস্ত আছে, ফিরতে রাত হয়ে যাবে। তুমি পারবে আনতে? আমিই বেরোতাম, কিন্তু একগাদা কাজ পড়ে আছে…”
আমি বললাম, “না না, তোমাকে বেরোতে হবে না। আমি নিয়ে যাব, ভেবো না।”
বউদি বলল, “ঠিক আছে। তুমি কোথায়? আত্রেয়ী আছে নাকি আশেপাশে? দাও না, একটু কথা বলি।”
আমি বললাম, “ধুস, নেই এখন। যখন থাকবে তখন দেব।”
বউদি বলল, “যাহ্, আমি ভাবলাম আছে বোধহয়। ঝগড়া করোনি তো আবার?”
আমি বললাম, “না। আমি কি ঝগড়ুটে নাকি? এই চিনলে অ্যাদ্দিনে?”
বউদি বলল, “ঝগড়ুটে না হলেও তুমি শর্ট টেম্পারড খুব। আর অধৈর্যও হয়ে পড়ো অল্পে। হুটহাট মাথা গরম কোরো না। বুঝলে ভাইটি?”
আমি বললাম, “বুঝেছি। আর কিছু বলবে?”
বউদি হাসল, “যেগুলো আনতে বললাম, এনো। ভুলো না। হোয়াটসঅ্যাপ করে রাখব?”
আমি বললাম, “না না লাগবে না। মনে থাকবে, রাখি।”
ফোনটা কাটলাম। আত্রেয়ী ফোন করছিল লক্ষ করিনি। কল ওয়েটিং নোটিফিকেশন এসেছিল বুঝিনি। দুটো মিসড কল দেখাচ্ছে।
তড়িঘড়ি ফোন করলাম। একবার রিং হতেই আত্রেয়ী ধরল, বলল, “কার সঙ্গে কথা বলছিলে?”
আমি বললাম, “বউদি।”
আত্রেয়ী বলল, “ও। আমি ভাবলাম কাউকে জুটিয়েছ নাকি!”
আমি বললাম, “এত তাড়াতাড়ি কেউ জুটে গেলে গিনেস বুকে নাম উঠবে তো। সম্ভব এত তাড়াতাড়ি কাউকে জোটানো?”
আত্রেয়ী বলল, “অনিন্দিতাদির বর পারলে সবাই পারবে হয়তো। আমার আজকাল পুরুষমানুষের ওপর ভরসাটাই উঠে যাচ্ছে।”
আমি হতভম্ব গলায় বললাম, “কার বর কী করেছে তার জন্য আমাকে বিশ্বাস করতে পারছ না? আমাকে দেখে কি তোমার ফ্রড মনে হয়? আমি যে আদর করেছি, সেগুলো সব মিথ্যা বলে মনে হয়?”
আত্রেয়ী বলল, “তুমি এত জোরে কথা বলছ কেন? কোথায় আছ তুমি?”
আমি বললাম, “কাফেতে।”
