আমি রাস্তায় নেমে এগিয়ে গেলাম। মেশিন আছে কাছাকাছি। আসবে নিশ্চয়ই শিগগিরি। ড্রাইভারেরা অলস হয়ে হাসিঠাট্টা করছে। পাহাড়ের দিক থেকে আর-একটা গাছও বিপজ্জনক ভাবে ঝুলছে। মনে হল যে-কোনো সময় পড়ে যাবে। আমি সেদিকে সভয়ে তাকাতে তাকাতে নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে দাঁড়ালাম। ডানদিকে গভীর খাত, বাঁদিকে চড়াই পাহাড়। আমার মনে হল আমার জীবনটাও এখন এরকম হয়ে গেছে। যেদিকেই যাব, কিছুই পাব না।
মনটা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল, জীবনে তো কারও কোনও ক্ষতি করিনি, নাক মুখ গুঁজে পড়াশুনা করেছি, চাকরি করছি ভালো ছেলের মতো, এরকম একটা লাইফ পেলাম… কী করে? কর্মফল না কী বলে, আমি কি কোনও পাপ করেছিলাম কোনও কালে যে এরকম একটা জীবন হল?
বউয়ের প্রতি অসহ্য একটা রাগ হচ্ছিল কেন জানি না। মনে হচ্ছিল ছুটে গিয়ে ওকে খাদে ফেলে দিই। একটা মানুষের জীবনকে এভাবে নষ্ট করার অধিকার এরা পায় কোত্থেকে? অনিরুদ্ধকে পেলে আমি ছাড়ব না। কপালে দুঃখ আছে ওর।
চোয়াল শক্ত হল আমার।
মেশিন এসে রাস্তা পরিষ্কার করল কিছুক্ষণ পরে। গাড়িতে গিয়ে দেখলাম বউ যথারীতি ঘুমিয়ে পড়েছে।
আমি গাড়ির ভেতর বসতে করুণ মুখে বউ বলল, “বাথরুম পেয়েছে। পেটটা কেমন করছে।”
বৃষ্টি এসে গেছিল। আমি জানলার কাচ তুলতে তুলতে বললাম, “অনিরুদ্ধকে বলে দাও। নিয়ে গিয়ে করিয়ে নিয়ে আসবে।”
বউ বলল, “অনিরুদ্ধ তো নেই এখানে। তুমি আছ, তুমি ব্যবস্থা করো।”
আমি বললাম, “চেপে বসে থাকো। কোনও পেট্রোল পাম্পে ব্যবস্থা করা যায় নাকি দেখছি। এই রাস্তাঘাটে হাগু পাওয়া নিয়ে তোমার অমলকান্তি কোনও কবিতা লেখেনি?”
বউ মুখ বেঁকিয়ে বলল, ‘ফালতু কথা বোলো না এখন। আমার কেমন করছে পেটটা। মোমোর পরে কফি খাওয়া উচিত হয়নি।”
আমি হাসিমুখে বললাম, “উপরওয়ালা আছেন। উনি ঠিক আমার কষ্টটা বুঝেছেন, বেশ হয়েছে।”
বলেই টের পেলাম আমারও পেটটা কেমন কেমন করছে।
৫১ অনিরুদ্ধ
একটা সময় ছিল, যখন ভাবতাম মেয়েরা অন্য গ্রহের প্রাণী। ভয় পেতাম, কথা বলতে গিয়ে কথা জড়িয়ে যেত। হাজার রকম ইনসিকিউরিটি চলে আসত।
সময় গেল, যত বড়ো হলাম, যত বিভিন্ন মেয়েদের সঙ্গে মিশলাম, বুঝলাম মেয়ে হ্যান্ডলিং-এর মতো সহজ কাজ পৃথিবীতে কিছু নেই। আরও বুঝলাম, মেয়েরা কিছু চায় না। কিচ্ছু না। সময় চায়। যত বেশি সময় দেবে, তত তারা ছেলেদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। ঋতুজার ক্ষেত্রেই দেখেছি।
ঋতুজা প্রথমে আমাকে দূর ছাই করত। পাত্তা দিত না। আমি কিন্তু হাল ছাড়িনি। কথা বলে গেছি। দশটা কথায় একটা রিপ্লাই দিত। একদিন হঠাৎ করেই হয়তো, সেদিন যাদের সঙ্গে কথা বলত তারা অনলাইনে ছিল না হবে, আমার সঙ্গে অনেক কথা বলে ফেলল। আমি সেদিনের পরে ওর সঙ্গে কথা বলার জন্য আগে যেমন হাভাতেপনা করতাম, সেটা কমিয়ে দিলাম। ইনফ্যাক্ট পাত্তা দেওয়াই ছেড়ে দিলাম। ব্যস, আর পায় কে, মেয়ে যেই বুঝল ওর ওপর হয়তো আমি ইন্টারেস্ট হারিয়ে ফেলেছি, ইগোতে নিয়ে নিল। নিজে থেকে এটা সেটা জিজ্ঞেস করতে শুরু করল। আমি সময় নিয়ে গেলাম। ঋতুজা জানতও না আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। গোটা ব্যাপারটাকে এমনভাবে ওর কাছে সাজালাম, যেন আমি না, আমার বন্ধুরা জোর করে আমাকে বিয়ে করাচ্ছে।
পৃথিবীর কোন বিয়ে কারও অনিচ্ছায় হয় না। আমারটাও হয়নি। ভেতরে ভেতরে অবশ্য আমি নাটকটা চালিয়ে গেছিলাম ঋতুজার সঙ্গে। ফুলশয্যায়, অনিন্দিতার সঙ্গে শুয়ে উঠে বাথরুমে গিয়ে ঋতুজাকে টেক্সট করে লিখেছিলাম, “খুব মিস করছি তোমায়।”
ঋতুজা উলটে আমাকে বুঝিয়ে গেছে, এরকম বলে না, বিয়ে করেছ, সংসার করার চেষ্টা করো। কনভারসেশনগুলো পড়েছি, আর নিজের মনেই ফিক ফিক করে হেসেছি। জানি তো, মেয়েরা কিছু চায় না। সময় চায় শুধু।
অনিন্দিতার সঙ্গে আমার রেজিস্ট্রি না হলে আমি জীবনেও এত কষ্ট করে কলকাতা আসতাম না।
ফোনে ওকে যখন দেখা করতে বললাম, প্রথমে গাঁইগুঁই শুরু করল। আমি সেন্টুর ভাণ্ডার খুললাম, “শোনো, আমি জানি আমি মারাত্মক ভুল করেছি। তোমাকে ঠকিয়েছি। আমাকে যা শাস্তি দেওয়ার দাও, জেলে দাও, আমি কিচ্ছু বলব না, কিন্তু আমার সঙ্গে শেষবারের মতো একবার দেখা করো।”
অনিন্দিতা গলেছে। অরিজিতের ফ্ল্যাটের চাবি ছিল আমার কাছে। ওখানে আসতে বলেছিলাম।
যখন দরজা খুললাম, দেখলাম মুখ থমথমে।
আমি ইচ্ছা করলেই ওকে ধরতে পারতাম, কিন্তু ধরলাম না। এই সময়ের নিয়ম আছে, রেগে থাকলে ছুঁতে নেই। বেশি অনুনয় করলে মাথায় চেপে বসবে। ব্যালান্সের খেলায় কখনও মেয়েকে মাথায় চড়তে দিতে নেই।
দরজা ছেড়ে দিলাম, অনিন্দিতা ঘরের ভিতরে গেল।
আমি হালকা গলায় বললাম, “বসো।”
অনিন্দিতা বলল, “আমি বসতে আসিনি, তোমার যা বলার বলে দাও, আমি চলে যাই।”
আমি দেখলাম পারদ চড়ছে। এবার মেয়ে মাত্রেই মা, অন্য দিক দিয়ে সেন্টু দিলে বরফ গলতেই পারে। বললাম, “আমি সেই ভুবনেশ্বর থেকে এলাম তো, পারছি না, শরীরটাও ভালো যাচ্ছে না কদিন ধরে। খাওয়া হয়নি কিছু। আমি বসি?”
অনিন্দিতা কঠিন গলায় বলল, “বসো।”
আমি বললাম, “প্লিজ বসো।”
অনিন্দিতা শক্ত হয়ে বসল।
আমি ওর উলটোদিকে বসে যতটা পারি কাঁদো কাঁদো অথচ দৃঢ় গলায় বললাম, “আমি জানি, আমি যা করেছি তার কোনও ক্ষমা হয় না। একই সঙ্গে আমি দুটো মেয়েকে ভালবেসেছি। বিশ্বাস কর, আমি ভালোই বেসেছি, এর বাইরে কিছু না। এক অদ্ভুত টানাপোড়েনে জড়িয়ে গেছিলাম। বিয়ের আগে থেকেই ঋতুজার সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল। সেটা যে বিয়ের পরে কীভাবে থেকে গেল বুঝিনি। কী বলব তোমায়…”
