আমি চুপ করে শুনে যাচ্ছিলাম।
বাবা হুট করে বলল, “হ্যাঁ রে, অমৃতর সঙ্গে তোর সব ঠিকঠাক আছে তো?”
আমি বললাম, “কেন বলো তো?”
বাবা বলল, “এমনি বললাম। ঠিক আছে?”
আমি বললাম, “হ্যাঁ ঠিক আছে।”
বাবা টিভির দিকে তাকিয়ে বলল, “বিয়ের পরে চাকরি নিয়ে ওর কোনও প্রবলেম নেই তো?”
আমি বললাম, “না। কেন হবে প্রবলেম?”
বাবা বলল, “ওই যে তোকে বললাম, মানুষের বিয়ের পর আর বিয়ের আগের চেহারায় অনেক পার্থক্য থাকে। কত উদার লোক বিয়ের পরে বউ পেটায়। কত কিছু দেখলাম। আমাদের পাড়াতেই আছে, দুলুদার ছেলে। ওর বউ অসুস্থ না হয়ে পড়লে কেউ জানতেই পারত না ছেলেটা রেগুলার মদ খেয়ে এসে মেয়েটাকে মারত। অথচ কী সজ্জন চেহারা বল তো?”
আমি বললাম, “তুমি আমাকে ভয় দেখাচ্ছ কেন? অমৃত ভালো ছেলে। এসব বোলো না দয়া করে।”
বাবা বলল, “আমি ভয় দেখাচ্ছি না রে। বয়স হলে বিভিন্ন চিন্তা এসে মাথার মধ্যে ঘুরতে শুরু করে। আমার তাই হয়েছে। আর কিছু না। তোর মা থাকলে এই চিন্তাগুলো শেয়ার করতাম। এখন তো সেটা সম্ভব না। তাই তোকে বলি। কদিন আর থাকব, যে কদিন আছি, তোকে যেন ভালো দেখে যেতে পারি।”
আমার বুকের মধ্যে একটা কষ্ট দলা পাকিয়ে এল। আমি বললাম, “কী বলছ বলো তো বাবা? তোমার কী হয়েছে? এমন বলছ কেন? আচ্ছা আমায় বলো অমৃতর মধ্যে কি খারাপ কিছু দেখেছ?”
বাবা হাসল এবার, “না না, ধুস, সে সব কিছু না। এগুলো রিটায়ার্ড মানুষের দুঃখবিলাস। আচ্ছা ভাব না, বিয়ের পর তুই যখন থাকবি না, তখন তো আমি একা হয়ে যাব। সেটা ভাবলেও তো কষ্ট লাগে। যখন অফিস করতাম, তখন এসব ভাবতাম না, তোর মার ওপর ছেড়ে দিতাম। এখন বাড়িতে থাকি, তোর মা নেই, স্বাভাবিকভাবেই যত উলটোপালটা চিন্তা এসে মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে। এ সবই ইনসিকিউরিটি থেকে আসে। অমৃত চমৎকার ছেলে। ওর মধ্যে একটা অদ্ভুত চাঞ্চল্য আছে। ও তোকে খারাপ রাখবে না। ওর বাবাও যথেষ্ট সজ্জন মানুষ। ভালো পরিবার। পরিবার ঠিক না থাকলে আমি আপত্তি করতাম বই কি।”
আমি হাঁফ ছাড়লাম, “তুমি ভেবো না। ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স নিয়েও ভেবো না। আমায় কেউ মারলে আমি মার খাবার পাবলিক না, দু ঘা আমিও দিয়ে দেব।”
বাবা বলল, “হ্যাঁ, তা তুই পারবি। ঝাঁসির রানি তো।”
আমি বাবার ভুঁড়িতে ঘুসি মারলাম, “একদম উলটোপালটা ভেবো না তো। এসব ভেবে প্রেশার সুগার বাড়িয়ো না দয়া করে।”
বাবা বলল, “ভাবিস না, নাতি নাতনির মুখ না দেখে আমি মরছি না।”
আমি কপালে হাত দিয়ে বললাম, “এসব কী কথা বাবা?”
বাবা কিছু একটা হেসে বলতে যাচ্ছিল, দরজায় অনিন্দিতাদি তৈরি হয়ে এসে দাঁড়িয়ে বলল, “আত্রেয়ী, আমি একটু বেরোচ্ছি। অনিরুদ্ধ ফোন করেছিল, কথা বলতে চায়।”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “কোথায় যাবে? এখানেও তো কথা বলতে পারতে।”
অনিন্দিতাদি ইতস্তত করে বলল, “না রে, এখানে আর কিছু বলব না। আমি বরং তোকে ফোনে সব বলব। এখন বেরোই।”
আমি বললাম, “আচ্ছা। ঠিক আছে। একা পারবে তো?”
অনিন্দিতাদি বলল, “পারব। আমি বেরোচ্ছি।”
আমার উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে অনিন্দিতাদি বেরিয়ে গেল।
আমি বুঝে উঠতে পারলাম না হঠাৎ করে কী হল।
৫০ জীমূতবাহন
পাহাড়ের মধ্যে একটা অদ্ভুত মায়া আছে। না চাইতেও সে শক্তপোক্ত মানুষকেও কবি বানিয়ে ফেলার ক্ষমতা রাখে। রাবংলার সে গুণটা আরও বেশি আছে।
লোকালয় ছেড়ে পাহাড়ি পথ ধরতেই মেঘ এসে ধাক্কা খাচ্ছে পাহাড়ে, সেখানেই বৃষ্টি হচ্ছে। অপূর্ব সে দৃশ্য। আমি মুগ্ধ হয়ে সেদিকেই তাকিয়ে ছিলাম, বউ বলল, “কলকাতা পচা জায়গা।”
আমি বললাম, “হুঁ। তবু পেটের ভাত দেয়।”
বউ বলল, “দিক। তাতে কী? আমার ভালো লাগে না। এখানে থেকে যেতে ইচ্ছা করছে।”
আমি বললাম, “অনিরুদ্ধকে নিয়ে? ও কি বউ ছেড়ে আসতে পারবে?”
বউ বলল, “ঠিক আসবে। আমি অপেক্ষা করব।”
আমার মনে হল আমার শরীরের ভেতরে কেউ কেরোসিন দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দিল। যেটুকু ভালো লাগা এসেছিল, এই কথায় সব কোথায় যেন চলে গেল।
শুধু বললাম, “ওহ।”
বউ বলল, “অনি পাহাড় খুব পছন্দ করে। কতবার আমরা ঠিক করেছিলাম পাহাড়ে একটা ছোট্ট কুঁড়েঘর করে থাকব।”
আমি চোখ বন্ধ করার চেষ্টা করতে করতে বললাম, “ও।”
বউ বলল, “এখানে জমি কিনে বাড়ি করার প্রসিডিওর জানো?”
আমি বললাম, “তোমার অনিরুদ্ধকে জিজ্ঞেস কোরো। আমি কী করে জানব?”
বউ বলল, “কী করে জিজ্ঞেস করব? ফোন তো তুমি ভেঙে দিলে।”
আমি আমার ফোনটা এগিয়ে দিয়ে বললাম, “এ নাও, ফোন করো।”
বউ বলল, “থাক। লাগবে না।”
আমি বললাম, “লাগবে। কথা বলো। ওকে মিস করছ বুঝতে পারছি।”
বউ জানলার বাইরে মুখ করে বলল, “মিস করার কিছু হয়নি। ভালোবাসাটা একটা অভ্যাস। অনিরুদ্ধ একটা সময়ে না থাকলে আমি চরম একাকিত্বে ভুগতাম। সেটা আমার জন্য মোটেও ভালো হত না। মেন্টাল সাপোর্ট যে দেয়, তার প্রতি একটা সফট কর্নার তৈরি হবেই।”
আমি আর কিছু বললাম না। গাড়ি পাহাড়ি পথ ধরে এগিয়ে চলছিল। আমি সেদিকে মন দিলাম। বুঝতে পারছিলাম যত বেশি ওর কথা শুনব, তত আমার মেজাজ খারাপ হবে।
খানিকটা এগিয়ে নামচির পথ ধরতে দেখা গেল রাস্তায় গাছ পড়েছে। জ্যাম লেগে গেছে।
বউ বলল, “প্রতি পদে বাধা আসছে। ধুস!”
