অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখি অভিজিৎদা। আমাদের পাড়াতেই থাকত, পরে দিল্লি চলে যায়। আমাকে দেখেই বলল, “আমি অনেকক্ষণ ধরে দেখে যাচ্ছি, এটা আমাদের জীমূত কি না! তোর সঙ্গে এভাবে দেখা হয়ে যাবে ভাবিনি।”
মেঘ রোদের খেলা চলছে রাবংলায়। বুদ্ধমূর্তিকে ঘিরে ধরে রয়েছে মেঘ। পাশের পাহাড়গুলোতে মেঘ ধাক্কা খেয়ে বৃষ্টি হয়ে পড়ছে। আমার মনে পড়ল অভিজিৎদা খুব ভালো আউটসুইং দিত। তখন প্রথম প্রথম পাড়ার মাঠে ডিউস বলে খেলতে গেছি। অভিজিৎদা একটা ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেছিল। পড়াশুনোতেও ভালো ছিল। কলেজ লাইফে সেই যে বাইরে গেল, তারপর খুব কম পাড়ায় আসে।
আমি হাসলাম, “বাহ। আমিও অবাক হলাম তোমায় দেখে। তুমি কোত্থেকে এলে? দিল্লি থেকেই?”
অভিজিৎদা বলল, “না রে আমি এখন মুম্বইতে শিফট করে গেছি। হানিমুনে এসেছি। এই তো বিয়ে করলাম।”
আমি বললাম, “কবে?”
অভিজিৎদার কাছে তারিখটা শুনে অবাক হলাম। একই দিনে আমরা বিয়ে করেছি। অভিজিৎদা আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে বলল, “কী কোইন্সিডেন্স রে ভাই। কোথায় তোর বউ?”
আমি বউকে ডাকলাম। অভিজিৎদাও ওর বউকে ডাকল। বউদি মারাঠি। অভিজিতদা বলল, “শাইনিং বুদ্ধতে উঠেছি। রাত্তিরে চলে আসিস। আড্ডা হবে।”
আমার বউ ফস করে বলে বসল, “রাত্রে তো হবে না। রাত্রে আমাদের হুইস্কি পার্টি আছে।”
অভিজিৎদা আমার বউয়ের দিকে তাকিয়ে হো হো করে হেসে বলল, “বাহ বাহ। দারুণ প্ল্যান তো! তা আমায় তো ডাক্তার হুইস্কি খেতে বারণ করেনি। মীরাকেও করেনি। আচ্ছা থাক, তোমরা প্রাইভেসি চাইলে জোর করব না।”
আমি বললাম, “বিকেলে দেখা যাবে অভিজিৎদা। নামচি থেকে ফিরি আগে। যা অবস্থা!”
অভিজিৎদাবলল, “আচ্ছা। জানাস কিন্তু। আমার কার্ড নে। সিঙ্গল মল্ট খাওয়াব কিন্তু।”
আমি কার্ডটা নিয়ে দাঁত বের করলাম। অভিজিৎদারা বেরিয়ে গেল।
বউ বলল, “আমার কিন্তু লোক একদম ভালো লাগে না।”
আমি বললাম, “আমারও না।”
বউ বলল, “একবারে বারণ করে দিলে পারতে।”
আমি বললাম, “তুমি যা বলেছ তা বারণ করার মতোই হল তো।”
বউ বলল, “তা বটে। আমায় মা আবার শিখিয়ে দিয়েছিল শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে মেয়েদের কম কথা বলতে হয়। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম কেন কম কথা বলতে হয়? এ আবার কী? আমি আমার মতো কথা বলব, কার বাপের কী? শ্বশুরবাড়ি গেছি মানে কি নিজের সব মান সম্মান গঙ্গার জলে ভাসিয়ে দিয়ে যাব নাকি? বাল।”
আমি বললাম, “এই তুমি খিস্তি মারলে কেন? একটা পবিত্র জায়গায় তুমি খিস্তি মেরে দিলে?”
বউ বলল, “বাল খিস্তি নাকি? কে বলেছে তোমায় বাল খিস্তি? বাল একটা ইমোশন। অবশ্য অনিরুদ্ধও খিস্তি পছন্দ করে না। ও আমাকে খিস্তি মারলে বকে।”
আমার মোবাইলে অনিরুদ্ধর পাঠানো গালাগালগুলো ওকে দেখানোর প্রবল ইচ্ছা দমন করে আমি বললাম, “ঠিক আছে, চলো ঘুরি। জায়গাটা বেশ সুন্দর।”
বউ বলল, “অনিরুদ্ধর নাম শুনলে তুমি কথা ঘোরাও কেন? তোমার হিংসা হয়? আচ্ছা তুমি কি আমাকে ভালোবেসে ফেলেছ?”
হুট করে এই প্রশ্নটার কী উত্তর দেব বুঝতে না পেরে বললাম, “ভালোবাসতে যাব কেন খামোখা? তুমি তো আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দেবে।”
বউ বলল, “রাইট। তারপর তুমি একটা শান্তশিষ্ট মেয়ে বিয়ে করবে যার কোনও দিন প্রেম ছিল না। হেবি ভালো মামণি হবে। সে তোমার সব কথা শুনবে, তার কোনও সমস্যা থাকবে না…”
আমি বউকে বাধা দিয়ে বললাম, “বিয়ে করতেই হবে এরকম কোনও মানে নেই। একটা বিয়েতেই যা অভিজ্ঞতা হয়ে গেল, তাতে আবার বিয়ে করার কথা ভাবলেই আমার অস্বস্তি হচ্ছে। তুমি বরং এসব কথা ছাড়ো। নিজের কথা ভাবো। অনিরুদ্ধকে নিয়ে সংসার করবে তো? কোরো।”
বউ দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, “তুমি কি আমার সঙ্গে ঝগড়া করতে চাইছ?”
আমি বললাম, “না। এখানে ঝগড়া করার কী আছে? আমাদের মধ্যে সব কথাই তো পরিষ্কার হয়ে গেছে, নতুন কোনও কথা নেই তো আর। আছে নাকি?”
বউ বলল, “তুমি না বহুত ফালতু লোক। কিছু হলেই চ্যাটাং চ্যাটাং কথা শোনাও। আমি একটু ঘুরতে চাইছিলাম, তুমি মুডটা নষ্ট করে দিলে।”
আমি বললাম, “তুমিই বা ওই শুয়োরের বাচ্চাটার নাম নিলে কেন? না নিলে কিছু হত না।”
বউ বলল, “এবার পবিত্র জায়গায় কে গালাগাল দিচ্ছে?”
আমি বললাম, “পবিত্র জায়গায় অপবিত্র নামই বা নিলে কেন?”
বউ হেসে ফেলল, “হিংসুটে। মোমো খাওয়াবে?”
আমি গোঁ গোঁ করতে করতে মোমো স্টলের দিকে গেলাম।
৪৯ আত্রেয়ী
অনিন্দিতাদি বাড়ি ফিরে দুপুরে অল্প খেল। একেবারেই খেতে পারছিল না। জোর করে খাওয়ালাম।
অনিন্দিতাদিকে ঘরে শুইয়ে এসে দেখি বাবা টিভি দেখছে।
আমাকে দেখে বলল, “কী রে, সব ঠিক আছে?”
আমি বসলাম। ক্লান্ত গলায় বললাম, “নাহ। কিছুই ঠিক নেই। পারিবারিক সমস্যায় জেরবার অনিন্দিতাদি।”
বাবা চিন্তিত গলায় বলল, “এই চিন্তাটাই তো থাকে। মেয়ের বাবাদের এই চিন্তাটাই থাকে। বিয়ের আগে, আর বিয়ের পরে অনেক তফাত। যার জন্য সব ছেড়ে কোনও মেয়ে বাড়ি ছাড়ে, দেখা যায় সেই ছেলেটাই সবথেকে বেশি কষ্ট দিল জীবনে। এরকম গাদা গাদা একজ্যাম্পল আছে। আবার এমন একজ্যাম্পলও আছে, দেখতে গম্ভীর কোনও লোক, একেবারেই বোরিং পারসোনালিটি, কিন্তু সে ফ্যামিলি লাইফে চমৎকার। মানুষ চেনা কি এতই সহজ? স্বয়ং রবি ঠাকুরও চিনতে পারেননি। রবীন্দ্রনাথের বড়ো প্রিয় মেয়ে ছিলেন বেলা। রূপে, গুণে অতুলনীয়। যত্ন করে বড়ো করে তুলেছিলেন। মেমসাহেব শিক্ষিকা ছিল বেলার। বড়ো আশা করে তিনি বিহারীলাল বাবুর পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক জুড়বেন বলে বিয়ে দিয়েছিলেন। পরিণামে কী হয়েছিল জানিস? সে মেয়ের ক্ষয় রোগে মৃত্যু হয়েছিল। জামাই পছন্দ করত না রবীন্দ্রনাথ মেয়েকে দেখতে আসুন। সম্পর্কের ক্ষেত্রে সব সময় বাবা মা-ই যে ঠিক তাও নয়। সন্তানেরাও ঠিক হতে পারে। আসলে যে-কোনো সম্পর্ক ব্যাপারটাই বড্ড গোলমেলে। কী থেকে যে কী হয়ে যেতে পারে, কেউ জানে না।”
