অনিন্দিতাদি দিশেহারা মুখে বলল, “ওর বাচ্চা আমি রাখব না আত্রেয়ী। আমি ওকে সামনে দেখলে সহ্য করতে পারব না বিশ্বাস কর। একটা মানুষ সব বিশ্বাস এভাবে ভেঙে চলে যাবে আমি কিছুতেই মানতে পারছি না। ওই লোকটা আমার সঙ্গে শুয়েছে, আমার বাচ্চার বাবা হবে, এসব ভাবলেই আমার কেমন যেন হচ্ছে।”
আমি বললাম, “ঠিক আছে, একটা কাজ করি চলো, একটা কাফে আছে এখানে, কফি খাই। দুজনে অন্য কথা বলি। তুমি রিসেন্ট কী কী বই পড়েছ সেসব আলোচনা করি। করবে?”
অনিন্দিতাদি বলল, “কফি খাব? আচ্ছা, চ।”
দুজনে মিলে কাফেটায় গিয়ে বসলাম। দুটো কফি অর্ডার করে বললাম, “বলো দেখি, কী বই পড়লে?”
অনিন্দিতাদি কয়েক সেকেন্ড আমার মুখের দিকে তাকিয়ে কেঁদে ফেলে বলল, “মনে পড়ছে না বিশ্বাস কর।”
৪৭ কপালকুণ্ডলা
বাড়ির আবহাওয়া ভালো নেই। বাবা আজকাল আমার সঙ্গে ঠিক করে কথা বলে না। মাও ঠারেঠোরে বোঝায় এত বড়ো মেয়েকে বেশিদিন টানা যায় না।
আমি চাপ নিই না।
চাপ নেওয়ার কোনও কারণ খুঁজে পাই না। আল বাল ছাল লোকের সঙ্গে বিয়ে করে লাইফের মা মাটি মানুষ করার থেকে জীবনেও বিয়ে না করা অনেক ভালো।
বিয়ে করলে নিজের পছন্দের ছেলের সঙ্গেই করব, নইলে করব না।
মেলার মাঠে সার্কাস এসেছে, দেখতে যাব ভাবছি। কাউকে পাই না।
আমার নবকুমারটাও হয়েছে তেমনি। মুখের দিকে তাকাতেই তার সাহস হয়ে ওঠে না। যেন নতুন বউ। তাও অ্যারেঞ্জড ম্যারেজে।
ফুলশয্যায় দুধ নিয়ে এসেছে!
এর মধ্যে অবশ্য একটা কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছি।
তার জন্য সদুজ্যাঠাই দায়ী। এই তো, গত পরশুর কথা।
নবকুমার দোকান থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরের দিকে রওনা দিয়েছে, আমি ক্যাশে বসে মন দিয়ে তার যাওয়া দেখছি, এমন সময় সদুজ্যাঠা আমার পাশে এসে ফিসফিস করে বলল, “শুধু যাওয়াটা দেখছিস? জীবনে যদি কিছু করতে চাস, তাহলে সাইকেলটা নিয়ে যা। নিজে ঠিক কর, কী করবি।”
কথাগুলো যেন যাত্রাদলের বিবেকের মতো বলল সদুজ্যাঠা।
আমারও যে কী হল, সাইকেলটা নিয়ে জোরে চালিয়ে একদম নবকুমারকে পিছন থেকে দুম করে মেরে দিলাম। নবকুমার ছিটকে পড়ল রাস্তায়। আমিও পড়লাম।
আশপাশের বাড়ির কাকিমারা, যারা আড্ডা মারছিল সব হইহই করে ছুটে এল।
সবাই আমাকে আর নবকুমারকে রাস্তা থেকে ধরে তুলল।
আমার ভীষণ লজ্জা লাগছিল, নবকুমারের দিকে একবারও তাকাইনি।
এক কাকিমা বলল, “কী রে কপাল, তুই দেখতে পাস না? চোখে ন্যাবা হয়েছে?”
নবকুমারের মুখ আড়চোখে দেখলাম। রেগে গেছে বোঝা যাচ্ছে। আমি বললাম, “আমার যে কী হল, মনে হল মাথাটা ঘুরে গেল।”
কাকিমাদের দঙ্গলে সবাই গালে হাত দিল, বলল, “সে কী রে, তোর মাথা ঘুরাল কেন? কী হয়েছে তোর?”
আমি বুঝলাম এরা অন্য মানে বের করার চেষ্টায় আছে, তাতে প্রেস্টিজে গ্যামাক্সিন হতে পারে। আমি তাড়াতাড়ি সাইকেলটা তুলে “আমি আসছি পরে কথা হবে” বলে জোরে প্যাডেলে চাপ দিয়ে ধাঁ হয়ে গেলাম। দোকানে হাঁফাতে হাঁফাতে ঢুকতেই সদুজ্যাঠার সামনে পড়লাম। আগ্রহী গলায় সদুজ্যাঠা বলল, “কী রে কিছু পারলি বলতে?”
আমি দাঁত খিঁচিয়ে বললাম, “আমি কী বলব? মাঝখান দিয়ে সাইকেল দিয়ে গুঁতিয়ে দিয়েছি।”
সদুজ্যাঠা অবাক গলায় বলল, “সে কী রে? গুঁতিয়ে দিয়েছিস মানে?”
আমি চারদিকে তাকিয়ে গলা নামিয়ে বললাম, “সাইকেল দিয়ে ধাক্কা লেগে গেছে। কী করব বুঝতে না পেরে টেনশনে এই হাল হয়ে গেল।”
সদুজ্যাঠা মাথায় হাত দিয়ে বলল, “হা ঈশ্বর, তোর দ্বারা যদি কিছু হত! শেষে এই কেলোর কীর্তি করলি?”
আমি বললাম, “তুমি বলতে গেলে কেন? আমি তো দিব্যি এখানে বসেই ভালো ছিলাম।”
সদুজ্যাঠা বলল, “তো কী করব? নিজে একা একা গুমরে গুমরে মরিস! আমি এত হেল্প করি তাও কোনও লাভ হচ্ছে না। মনে হচ্ছে তোর বাবাকেই বলতে হবে।”
আমি হাঁ হাঁ করে উঠলাম, “একদম না, অনেক উপকার করেছ, আর করতে হবে না। বাবাকে বলার প্রয়োজন নেই।”
সদুজ্যাঠা ফিক ফিক করে হাসছিল।
কালকেও ক্যাশে বসে ছিলাম। নবকুমার খেতে এসেছিল ঠিকই, কিন্তু আমাকে দেখে এমন একটা দৃষ্টি দিল যে বুঝলাম হেবি রেগে আছে।
আমি রাগতে গিয়েও খুশি হলাম।
যাক, রাগ হোক, দুঃখ হোক, কষ্ট হোক, কিছুতে তো আমাকে মনে রাখছে। নইলে এতদিন তো ঠিক করে তাকাতও না।
আমার খুব ইচ্ছে করে জানতে, নবকুমার ঘরে গিয়ে কী করে। সেই যে ঘরে গিয়ে ঢোকে, আর তো বেরোয়ও না। কী করতে পারে? টিভি দ্যাখে? টিভিতে কী দ্যাখে?
ঘরে একটা সিসিটিভি বসাতে পারলে ভালো হত। সারাদিন ধরে নবকুমারকে দেখা যেত।
এর মধ্যে একটা খবরে মাথা গরম হয়ে গেল।
সাঁপুইদের ছেলে নাকি বাড়িতে জানিয়েছে, বিয়ে করলে আমাকেই করবে, নইলে করবে না।
শোনা অবধি মাথা কাজ করছে না।
লোকের ঝাঁট জ্বালালেও যে তাদের ভালো লাগে, জীবনে প্রথম দেখলাম মাইরি!
৪৮ জীমূতবাহন
কোথাও আপনি বেড়াতে যাবেন, আর এলাকার লোকের সঙ্গে দেখা হবে না, এটা হতে পারে না। ট্যুরের মধ্যে কোথাও না কোথাও ঠিক দেখা হয়েই যাবে।
আমাদেরও হল।
রাবংলার বুদ্ধ পার্কে টিকিট কাটছি, বউ কানে কানে বলে দিয়েছে রাত্তিরে আমার সঙ্গে বসে হুইস্কি খাবে, ড্রাইভার বলছে এখানে তাড়াতাড়ি করে নিতে, নামচি যাবার রাস্তার হাল খুব খারাপ, এমন সময় পিঠে একটা থাবড়া এসে পড়ল।
