তা জানুক, ক্ষতি নেই। অনিন্দিতাকে আমি হিসেবের মধ্যে ধরিওনি কোনও দিন।
আমার মাথায় ঋতুজার নামটাই ঘুরছে। আর ওর বরেরও। আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার যখন করেছে, এত সহজে ওকে আমি ছেড়ে দেব না। কলকাতায় কামড়ে দেওয়ার জন্য অনেক ভাড়াটে কুকুর পাওয়া যায় যাদের টাকা দিয়ে অবলীলায় আমার কাজে লাগানো যাবে। কত বড়ো সাহস! আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছে। ওর যে কী হাল করব, আমার মাথায় আগুন চড়ে যাচ্ছে মাঝে মাঝেই।
অফিস থেকে ছুটি নিয়েছি দুদিন। আগে অনিন্দিতার কাছে যেতে হবে। পালস বুঝতে হবে। স্বাভাবিকভাবেই প্রচুর রেগে থাকবে। দাঁড়িপাল্লায় সেন্টিমেন্টের জায়গায় পর্যাপ্ত সেন্টিমেন্ট চড়াতে হবে যাতে রাগটা কমে। বোঝাতে হবে ঋতুজা পাস্ট। তুমিই ফিউচার। দরকার হলে ঋতুজার চরিত্র খারাপ করে দিতে হবে। অনিন্দিতাকে মাথায় তুলতে হবে। একটা বিয়ের সার্টিফিকেট আজকাল মেয়েদের অনেক সুবিধে করে দিয়েছে। অনিন্দিতা সে সুবিধাটা পাবে। আমার চাকরি পর্যন্ত চলে যেতে পারে। তাই এই জায়গাটা আগে মেরামত করে নি। তারপর কুকুর ধরতে হবে। ঋতুজার বরকে আমি পায়ের তলায় না আনলে নাম পালটে নাম রাখব। কত বড়ো সাহস ওর, আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছে। ওর যে কী করতে পারি, সে সম্পর্কে ওর কোনও ধারণা নেই।
গাড়ি এসেছে, স্টেশনে যাওয়ার। গাড়িতে উঠে শহরটাকে দেখছিলাম। প্রতিটা শহর একরকম হয়, আর যেখানে যত বেশি লোক থাকে, সেখানে তত বেশি কেচ্ছা জন্মায় প্রতিটা কোণে। একটা মেয়ে কাল আমায় ফোন করেছিল। মেয়েটাকে মেসেজ করেছি। জাল পেতে যেতে হবে প্রতিটা মুহূর্তে, প্রতিটা সময়ে। যে মাছ উঠবে, সে মাছটাকেই ভেজে খেতে হবে।
পুরুষ মাত্রেই পলিগ্যামাস। এটা যারা বোঝে না, তারা বোকা।
ঋতুজা বোঝে, ঋতুজা বুদ্ধিমতী। আমি জানি, ওর বরের থেকে ও ঠিক বেরিয়ে যাবে একদিন, পৃথিবীর কোনও মানুষ আমার কাছে আসা থেকে ওকে আটকাতে পারবে না। আমি ঠিক করেছি এখন আর ঋতুজার সঙ্গে যোগাযোগ করব না। ফিরুক কলকাতায়। আমি নিশ্চিত, ঋতুজা আমাকে ফোন করবেই।
করবেই।
না করে যাবে কোথায়?
৪৬ আত্রেয়ী
ডাক্তার চৌধুরীকে অনিন্দিতাদি দেখায়। ওঁর চেম্বারে ওকে বসে থাকতে দেখে কষ্ট হচ্ছিল খুব। কেমন ভেঙে পড়া চেহারা।
আমি হাত ধরে ছিলাম। অনিন্দিতাদি বলল, “তুই স্কুলটা খামোখা গেলি না আজ আমার জন্য। ঠিক করলি না আত্রেয়ী।”
আমি বললাম, “এই কথাটা বারবার কেন বলছ বলো তো? এভাবে বোলো না। আমার দিদি থাকলে আমি কী করতাম? একা রেখে চলে যেতাম?”
অনিন্দিতাদি বলল, “আচ্ছা। বলব না। কিন্তু নিজের কেরিয়ারটা পরের জন্য…”
আমি অনিন্দিতাদির হাতে আলতো করে চিমটি কেটে বললাম, “এর বেশি বললে আমি খামচানো শুরু করব কিন্তু। আমার নখ ডেঞ্জারাস।”
অনিন্দিতাদি এত দুঃখেও হাসল। বলল, “আচ্ছা বলব না।”
ডাক্তারবাবু অনিন্দিতাকে দেখে চিনলেন। হাসিমুখে বললেন, “ভালো তো সব?”
অনিন্দিতাদি আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “বাইরে বসবি?”
আমি বুঝলাম অনিন্দিতাদি আমার সামনে কথা বলতে চাইছে না। আমি মাথা নাড়লাম, “ঠিক আছে। বসছি।”
বাইরে অনেকগুলো কৌতূহলী চোখ আমায় দেখছিল। স্বাভাবিক, এভাবে চেম্বারে ঢুকে কজন বেরোয়! কিন্তু অনিন্দিতাদির যা মানসিক অবস্থা, কিছু মনে করার জায়গাতেই কেউ থাকবে না।
আমি চুপ করে বসে মোবাইল ঘাঁটতে লাগলাম। অমৃত মেসেজ করেছে একগাদা। অনিরুদ্ধদাকে মেসেজ করেছিলাম বলে বেশ রেগে ছিল। এখন আবার সরি বলে যাচ্ছে। পাগল একটা। হাসি পেলেও হাসলাম না, ওকে একটা অ্যাংরি ইমোজি পাঠিয়ে লিখলাম, “অফিস করো। বিয়ের আগেই চাকরিটা যাবে মনে হচ্ছে তোমার।”
অমৃত লিখল, “বেশ তো, বউয়ের টাকায় খাব। আমার কোনও চাপ নেই।”
আমি লিখলাম, “আচ্ছা খেয়ো, আমি অনিন্দিতাদির সঙ্গে এসেছি, পরে মেসেজ করছি।”
অমৃত লিখল, “তুমি বেশি জড়িয়ে যাচ্ছ না তো?”
এই এক সমস্যা ওভার পজেসিভনেসের। মাঝে মাঝে মনে হয় গলা টিপে ধরছে। আমি লিখলাম, “না, জড়ানোর কিছু নেই। তোমার কোনও কলিগের কিছু হলে তুমি হেল্প করতে না?”
অমৃত লিখল, “তা ঠিক। আচ্ছা টেক কেয়ার।”
আমি হাঁফ ছেড়ে ফোনটা রাখলাম। অমৃতর কোনও কোনও ব্যাপার আমাকে বিরক্তও করে এটা কি ওকে বলা ঠিক? ভাবছিলাম। এটা হয়তো প্রেমের শুরুতে হয়। উথালপাতাল ভাব। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ম্যাচিওরিটি আসবে কোনও দিন নিশ্চয়ই। নইলে তো বড়ো ঝামেলা! কোথায় যাব, কী করব, সব কিছুর যদি জবাবদিহি করতে হয় তাহলে বড়ো সমস্যা হয়।
অনিন্দিতাদি মিনিট পনেরো পরে বেরোল।
চোখে মুখে অস্বস্তিটা বোঝা যাচ্ছিল।
আমি উঠে দাঁড়ালাম। বাইরে বেরিয়ে বললাম, “কী হল?”
অনিন্দিতাদি বলল, “তুই কিছু মনে করিসনি তো? আমার যে কী হল, তুই সবই জানিস, তবু তোকে বাইরে দাঁড়াতে বলে দিলাম।”
আমি বললাম, “ধুস, সেটা তো বুঝেছি। অস্বস্তি হলে কী করবে? তোমার জায়গায় আমি থাকলেও একই ব্যাপার করতাম হয়তো। তুমি কথা বলে স্যাটিসফায়েড তো?”
অনিন্দিতাদি বলল, “হুঁ, ডক্টর চৌধুরী খুব রেগে গেলেন। অ্যাবরশন এখন করানো যাবেই না বলছেন। আর করা গেলেও উনি অন্তত করবেন না।”
আমি বললাম, “সে কী? তাহলে কী করবে?”
