বাবা বলল, “এই তোর সমস্যা, একটা জিনিস নিয়ে বলতে থাকলে আর সেই লুপ থেকে বেরোতে পারবি না। আমি সেটা বলেছি তোকে? মিনিমালিস্টিক করে হেদিয়ে মরছিস! শোন, তোর মা তোর বউয়ের জন্য যে গয়নাগুলো রেখে গেছে, সেগুলো আত্রেয়ীকে দেখা, ওর যদি পছন্দ হয় সেগুলোই থাকুক, নইলে আবার নতুন করে কিছু বানানো যাবে। নিমন্ত্রিতদের তালিকা বানাতে হবে, পিওর বাঙালি ফুড না মোগলাই খাবার হবে সব হিসেব করতে হবে, ওরে বাবা কত কাজ, ভাবতেই মাথা ঘুরাচ্ছে, এই তুই আমাকে নোটপ্যাডটা আর পেনটা দে তো। লিস্ট করতে শুরু করি এখন থেকেই। কী চাপ, কী চাপ!”
বাবা সিরিয়াস হয়ে গেল।
যাহ্, কী থেকে কোথায় চলে গেল! আমি রেগেমেগে বসে রইলাম।
৪৩ আত্রেয়ী
অনিন্দিতাদি সারারাত জেগে বসেছিল। আমি ওর সঙ্গে কথা বলতে গেছিলাম। আমায় বলল, “তুই ঘুমা। জাগতে হবে না। একটা রাত দে। আমি ঠিক হয়ে যাব।”
অনিরুদ্ধদা ওর ফোনে বেশ কয়েকবার ফোন করেছে। সম্ভবত বাড়িতে ফোন করে জানতে পেরেছে অনিন্দিতাদি বেরিয়ে গেছে, সে কারণেই ফোন করেছে।
মজার ব্যাপারটা হল, এর মধ্যে আমাকেও ফোন করেছে। আমি ধরিনি আর। মেসেজ করে বলেছে, “প্লিজ পিক আপ দ্য ফোন। সিঙ্গল হবার কী কষ্ট কী করে বোঝাই? আমরা কি বন্ধু হতে পারি না?”
দেখে আমার মাথায় রক্ত উঠে গেছে। তবু অনিন্দিতাদিকে বলিনি। বলে লাভ নেই। অনিন্দিতাদি যা বোঝার বুঝে গেছে।
আমার অবশ্য একটা সময় পরে মনে হচ্ছে অনিরুদ্ধদা মানসিকভাবে অসুস্থ। নইলে একটা মানুষ এরকম করবে কেন? ঘরে বউ আছে অথচ অন্য একটা মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলেছে, আবার অন্য একটা নাম্বার পেলে তার সঙ্গেও শুরু করে দিচ্ছে, এরকম মানুষেরা আসলে কি মারাত্মক একাকিত্বে ভোগে? না কোনও রোগ! এগুলো কেমন রোগ? একটা সংসার, একটা মেয়ের জীবন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
ঘুম থেকে উঠে দেখলাম অনিন্দিতাদি বাথরুমে কল ছেড়ে দরজা বন্ধ করেছে। সম্ভবত কল ছেড়ে রেখে কাঁদছে যাতে কান্নার শব্দ না বেরোয়।
বাইরের ঘরে গেলাম। বাবা খবরের কাগজ পড়ছিল। আমায় দেখে বলল, “ঠিক আছে অনিন্দিতা এখন?”
আমি মাথা নাড়লাম।
বাবা বলল, “আমাকে কি এবার বলা যাবে কী হয়েছে?”
আমি বললাম, “সাংসারিক সমস্যা। মিটে যাবে হয়তো। নাও মিটতে পারে। কেন, এখানে থাকলে কি তোমার অসুবিধা আছে?”
আমার গলাটা খানিকটা রূঢ় শোনাল, বলে নিজেই বুঝতে পারলাম।
বাবা অবাক হয়ে বলল, “আমার কী অসুবিধা? তোর কী হয়েছে সেটা বল তো! অমৃতর সঙ্গে আবার ঝগড়া করেছিস নাকি?”
আমার লজ্জা পেয়ে গেল। বললাম, “না। ওসব কেন করতে যাব?”
বাবা বলল, “সে করতেই পারিস। সব সম্পর্কেই একটু আধটু মন কষাকষি, মতের অমিল না থাকলে সে সম্পর্কটাকে সুস্থ সম্পর্ক বলা চলে না।”
আমি বললাম, “না সেসব কিছু না। আমি ওরকম ঝগড়াটে বলে তোমার মনে হলই বা কেন?”
বাবা হেসে ফেলল, “তুই ঝগড়ুটে না?”
আমি রেগে গেলাম, “আমি ঝগড়াটে? তোমার মনে হয় এটা?”
বাবা বলল, “না না। একবারেই না। তুই একবারেই ঝগড়াটে না। মাঝে মাঝে শুধু একটু মাথা গরম করে ফেলিস এই আর কি!”
আমি বললাম, “সে তুমিও করো। সবাই করে। তাতে কেউ ঝগড়াটে হয় না।”
বাবা বলল, “তাহলে কি অমৃত ঝগড়াটে?”
আমি বললাম, “উফ, তুমি কেন এসব কথা বলছ বল তো? আমার অস্বস্তি হচ্ছে এসব শুনলে। দেখছ একজন মহিলা একটা ক্রাইসিসের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। সেটার সলিউশন বেরোক অ্যাটলিস্ট, তারপর নাহয় তুমি এসব কথা বলো।”
বাবা এবার সিরিয়াস হল, “তা ঠিক, আচ্ছা আমি কি কিছু করতে পারি? বলা যায় আমায়?”
আমি বললাম, “এখনই কিছু না। তবে সেরকম কিছু সমস্যা হলে বলব। অনিন্দিতাদি থাকবে হয়তো কদিন।”
বাবা বলল, “তা থাকুক। কী বাজার করব জানিয়ে দিস। খাওয়াদাওয়াটা ঠিক করে করে যেন। আজকাল আধুনিক যুগে মানুষের সমস্যাগুলো, মানসিক টানাপোড়েনগুলিও বড়ো অদ্ভুত হয়ে গেছে। আমাদের সময় এত জটিলতা ছিল না। টেকনোলজির যত আপগ্রেডেশন হবে, মানুষের সমস্যাগুলিও তেমনি এক-এক রকম ভাবে পালটাতে থাকবে। আমাদের সময় কী ছিল, টাইপরাইটার ছিল। ল্যান্ডলাইন ছিল, মোবাইল ছিল না। তখন মানুষের চলাফেরা একভাবে ছিল। এখন দেখ, মোবাইল আসার পরে সব কিছুই কেমন দ্রুত পালটে যাচ্ছে। এটা হবে। সমস্যা বাড়বে। এর সলিউশন খুঁজতে আমাদেরকেও পালটাতে হবে। নইলে সমূহ বিপদ। যাক গে, তোরা দুজনেই স্কুলে যাবি তো?”
আমি বললাম, “যাব। তাও একবার কথা বলে আসি।”
বাবা বলল, “ঠিক আছে। সেভাবে রান্না করতে বলে দিচ্ছি তবে। নিজের খেয়াল রাখিস মা। সবাইকে ভালো রাখতে গিয়ে নিজে অসুস্থ হয়ে পড়িস না।”
বাবার গলাটা হঠাৎ নরম হয়ে গেল।
আমার কেন জানি না খুব কান্না পেল।
৪৪ জীমূতবাহন
সকাল আটটা। বৃষ্টি কমলেও কুয়াশা আছে।
বউ পুরো বাচ্চাদের মতো ঘুমাচ্ছে।
সারারাত ওভাবেই ঘুমিয়েছে। আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল। কোনও মেয়ে এভাবে কোনও দিন আমাকে জড়িয়ে ধরেনি। আমার যা সমস্যা হবার সেগুলো হচ্ছিল।
যখন বুঝলাম ঘুমিয়ে পড়েছে, সোজা হয়ে ওকে সরাতে গেলাম। সরল না। উলটে আরও বেশি করে জড়িয়ে ধরে বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে ঘুমাল। বহুকষ্টে সামলাতে হল নিজেকে।
চিরকাল মেয়েদের থেকে দূরে থাকা ছেলেদের এভাবে নিজেকে সংযত রাখা যে কতটা চাপের, সেটা যার হয়, সে ভালো বুঝতে পারে। আর আমি তো বরাবর “আমাকে কেউ ভালোবাসে না আর আমাকে কেউ দেয় না” ক্লাবের প্রেসিডেন্ট। আমার মতো পাবলিককে কোনও মেয়ে জড়িয়ে ধরলে কী হতে পারে সেটা আমি ছাড়া কে বুঝবে?
