অনেকটা কথা বলে বউ কফিতে চুমুক দিল।
আমি বললাম, “সেটা বুঝলাম। কিন্তু বন্ধুত্ব হওয়া তো এক জিনিস, তাই না? স্বাভাবিক বন্ধুত্ব সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হতেই পারে। তুমি যদি ওকে ভালোবাসতে তাহলে বিয়ে করলে না কেন?”
বউ মাথায় হাত দিয়ে বলল, “আমি যে ওকে ভালোবাসি সেটা বুঝতে পারিনি প্রথমে। একটা সময় ও আমাকে প্রোপোজ করে। আমি সরাসরি না করে দি। আমার থেকে প্রত্যাখ্যান পাবার পর ও একজন মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়, সে রাজিও হয়ে যায়। আমার সঙ্গে তখন আর ওর কোনও রকম কথা হত না। কিন্তু আমি তো গুমরে গুমরে মরতে শুরু করি। এমনিতেই বরাবর ভীষণ একাকিত্বে ভোগা মানুষ আমি। অনি হুট করে কথা বন্ধ করে দিল, অনলাইন এসেও কথা বলছে না, আমি কিছুতেই মানতে পারছিলাম না। একদিন দুম করে ওকে জিজ্ঞেস করলাম, কী হে, বিয়ে হল? অনি জানাল সামনের মাসে বিয়ে। তারপর আবার কথা শুরু। আমি জড়িয়ে গেলাম। বিয়ের পরেও আমাকে কতবার বলেছে আমাকে নিয়ে সব ছেড়ে পালিয়ে যাবে। আমিই আটকেছি। একটা মেয়ে তো জড়িয়ে গেছে।”
আমি বললাম, “মেয়েটা তো জেনে গেছে, ওকে ছেড়েও দেবে। আমিও তোমাকে ছেড়ে দেব। দুজনে মিলে ভালোভাবে থাকবে এখন। তোমার লাইন ক্লিয়ার।”
বউ কফি খেতে খেতে বলল, “হলে ভালো, কারণ আমি অনিরুদ্ধকে ভালোবাসি। ওর বউ ওকে আমার জন্য ছাড়লে আমি ভেবে দেখতেই পারি।”
আমি হাসলাম, “অবশ্যই। এত সব কিছুর মধ্যে আমার লাইফের কটা দিন নষ্ট করলে এই যা।”
বউ বলল, “কারও জন্য করেছ ভাববে। সমাজসেবা টাইপ। অসুবিধা হবে না। তুমি ভালো মানুষ। তোমার কোনও ক্ষতি হবে না।”
আমি বললাম, “বাপ রে, বিরাট কমপ্লিমেন্ট দিয়ে দিলে। জানতামই না। আচ্ছা, এবার ঘুমাই। তুমি জেগে থাকলে জাগো।”
আমি শুয়ে পড়লাম। বউ কফি মাগ রেখে বলল, “শোনো না।”
আমি বললাম, “কী?”
বউ বলল, “আমি যদি তোমাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাই তোমার অসুবিধা হবে? আমার না ভয় লাগে এত বাজ পড়লে।”
আমি মাথায় হাত দিলাম।
এ কী আজব সমস্যা হল!
৪২ অমৃত
আত্রেয়ীকে আমি ভালোবাসি।
আত্রেয়ীকে আমার স্বপ্নে দেখতে ভালো লাগে।
এই যেমন আজকে ভোরের স্বপ্ন দেখলাম, আমার খুব জ্বর হয়েছে। আত্রেয়ী আমাকে ওর বাড়িতে নিয়ে গেছে। সারাদিন এক্কেবারে সুচিত্রা সেনের মতো আমার মাথার কাছে বসে আমার সেবা করে যাচ্ছে। ওর বাবা একবার এসে বললেন, “কী রে মা, ঠাকুর দেখতে যাবি না?”
আত্রেয়ী সুজয়দা পুচকির অ্যাডের পুচকির দাদার মতো করে বলল, “তোমরা যাও। আমি থাকি।”
এসব কথা তো বলতে ইচ্ছা করে নাকি? কিন্তু সেটা ভোর ছটা হলে তো বলা সম্ভব না। মেয়েটার স্কুল থাকে। বাড়িতে একগাদা কাজ থাকে।
তবু হোয়াটসঅ্যাপ করে দিলাম। দেখলে ভালো।
বাবা ভোরে উঠে প্রাণায়াম করে। আমি বসার ঘরে গিয়ে দেখলাম কপালভাতি করছে। আমাকে দেখে থামিয়ে বলল, “কী রে, এত সকালে উঠে পড়লি যে? অন্য দিন তো আটটার আগে নামগন্ধ পাই না!”
আমি বললাম, “এমনি, ইচ্ছা হল, উঠে পড়লাম।”
বাবা বলল, “অ। আচ্ছা শোন না, বলছি তোর কখন ইচ্ছা বিয়ে করার? শীতে না গরমে?”
আমি বললাম, “যখন খুশি।”
বাবা বলল, “শীতেই ভালো। লোক খাইয়ে সুখ আছে। গরমকালে গাড়োলে বিয়ে করে। তোর দাদা এক গাড়ল। গরমে বিয়ে করল। পাত্র ঘামছে, পাত্রী ঘামছে, পুরোহিত ঘামছে, বরযাত্রী ঘামছে, কন্যাযাত্রী ঘামছে, সবাই ঘেমো হয়ে বসে আছে। লোকে খাসি খেতে খেতে ঘামছে, অবিশ্যি ছাড়ছে না কেউই। বেশ একটা ইয়ে ব্যাপার।”
আমি বললাম, “আমার ওরকম বিয়ে করার ইচ্ছা নেই বাবা। ছোটোখাটো প্রোগ্রাম হোক। অত লোককে খাওয়ানোর কোনও দরকার নেই।”
বাবা অবাক হয়ে বলল, “মানে?”
আমি বললাম, “দু বাড়ি থেকে একটা কমন রিসেপশন হোক, সেখানে সবাই এসে খেয়ে যাক। অতগুলো টাকা নষ্ট করার কোনও দরকার নেই।”
বাবা বলল, “তোর কাছে আমি টাকা চেয়েছি? আর কে বলেছে এসব? আত্রেয়ী?”
আমি বললাম, “না না, ও তো বলেই দিয়েছে আমরা যা ঠিক করব ও তাতেই রাজি। কিন্তু আমার মনে হয় বিয়েতে এত টাকা অপচয় করার কোনও যৌক্তিকতা নেই।”
বাবা বলল, “বেশ তো, তাহলে ওর বাবার সঙ্গে কথা বল। দু পক্ষ রাজি থাকলে তো অসুবিধা হবার কথা না। কিন্তু আত্মীয়স্বজনরা যদি উলটোপালটা বলে তাহলে তুই সামলাবি তো?”
আমি বললাম, “ওদের কাজই তো উলটোপালটা বলা। ওদের তুমি আটকাতে পারবে? পৃথিবীর সেরা রান্না হলেও ওরা ঠিক কোনও না কোনও খুঁত খুঁজে বের করবে।”
বাবা বলল, “সেটা তুই ঠিকই বলেছিস। মন্দ না প্রস্তাব তোর। আচ্ছা তোর দাদার সঙ্গে আলোচনা করে নি।”
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, “এটা নিয়ে দাদা আবার কী বলবে? দাদার বিয়ে না আমার?”
বাবা বলল, “দাদা তোর বড়ো না? ওরও একটা মতামত আছে তো নাকি? ওরা যদি বলে, না মানব না, যা হবে ধুমধাম করেই হবে, তখন সেভাবেই করতে হবে। আমি গৃহে অশান্তি চাই না।”
আমি গোঁজ হয়ে বসে রইলাম।
বাবা বলল, “শোন না, বউমার নাম্বারটা দিবি। কথা বলব। কথা বলা দরকার। তোর মা নেই তো, আমাকে তো সব দিক সামলাতে হবে। গয়না কেনার কথা ভেবেছিস কিছু?”
আমি বললাম, “আমি কিছুই ভাবিনি। আমি তো মিনিমালিস্টিক বিয়ের কথাই বলে আসছি বরাবর। নিজেরা নিজেরা বিয়ে হবে, গুচ্ছ লোককে ডেকে গেলাবার কোনও যৌক্তিকতা পাই না আমি।”
