আত্রেয়ী বলেছে ও বন্ধুই ভেবেছিল।
আমি রেগেছি। আবার নিজেই নিজেকে বুঝিয়েছি। আমার এরকম করা ঠিক না। ও তো ব্লক করে দিয়েছে। অফিসের সৌরভদা বলে প্রেমের শুরুতে অনেক রকম ইনসিকিউরিটি থাকে। এই ফেসবুকের জমানায় এই সব ইনসিকিউরিটি ডানা মেলার সুযোগও বেশি পায়।
এসব ছেলে তো সামনে ওভাবে কথা বলার সাহস পাবে না। ফেসবুকের আড়ালটা ব্যবহার করতে পারছে বলেই যা নয় তাই বলে দিতে পারছে।
কথা হল কেউ যদি যা নয় তাই বলেও, একটা মেয়ের জায়গায় দাঁড়িয়ে আমি সেটাকে প্রশ্রয় দেব কেন? সবাই কি বন্ধু হয়? বন্ধু শব্দদুটো কি এতটাই সোজা যে যার তার সঙ্গে যা খুশি বলা যায়?
আত্রেয়ী আমার পিঠে মুখ গুঁজে যখন আসছিল, আমার এই সব প্রশ্নগুলো কোথায় যেন ডানা মেলে চলে গেছিল।
ঘরে বসে এই কথাগুলো আবার মাথায় ঘুরতে শুরু করল। আমি ফেসবুক বন্ধ করে গান শুনতে চেষ্টা করলাম। লাভ হল না।
অস্বস্তি হচ্ছিল। আমার কেন এরকম হয়? বসও বললেন কাজের প্রতি মন না দিলে সমস্যা বাড়ে। বিয়ের পর কি এরকম হবে? এতটা ইনসিকিউরিটি আসতে পারে?
আমি ফোন রেখে শুয়ে পড়লাম। খানিকক্ষণ ছটফট করার পর দেখলাম আত্রেয়ী ফোন করেছে। ধরলাম, “হ্যালো।”
আত্রেয়ী গলা নামিয়ে বলল, “একটা বাজে জিনিস হয়ে গেছে বুঝলে। এইজন্যই বিজি ছিলাম।”
আমি বললাম, “সেসব তো বলেছ বটে, কিন্তু আমি কিছুই বুঝিনি। কী ঘটেছে একজ্যাক্টলি?”
আত্রেয়ী বলে গেল। আমি সব শুনলাম। আত্রেয়ী বলল, “আমি রুটি করে আসছি দাঁড়াও।”
আমি গুম হয়ে বসে রইলাম। বাবা ফিরেছে। দাদা বউদিও। বউদি একবার ঘর নক করে গেছে। আমি ঘুমজড়ানো গলায় বলেছি, ঘুমাচ্ছি।
খানিকক্ষণ পরে আত্রেয়ী ফোন করল আবার। আমি ফোন ধরেই বললাম, “তুমি ওই লোকটাকে ফোন করতে গেলে কেন নিজের ফোন থেকে? মেসেজই বা করলে কেন?”
আত্রেয়ী কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল, “ওই সময়টা আমি কী করতাম? আমি ব্লক করে দিয়েছি অলরেডি।”
আমি গোঁ গোঁ করতে লাগলাম।
আত্রেয়ী বলল, “দ্যাখো অমৃত, মানুষের জীবন তো এরকম না যে, আমি তোমার প্রেমিকা বলে আর কোনও ছেলের সঙ্গে কথা বলতে পারব না কোনও ভাবেই। এরকম মানসিকতা মধ্যযুগে ছিল। তুমি বুঝতে পারছ তোমার কোনও একটা সমস্যা হচ্ছে? আমার কাছে একজন ভালো মনোবিদের নাম্বার আছে, তোমাকে দেব?”
আমি রেগে গিয়ে বললাম, “মনোবিদ মানে? আমি পাগল?”
আত্রেয়ী বলল, “পাগল তো বলিনি। কিন্তু আমার মনে হয় তোমার ট্রিটমেন্ট দরকার। সাধারণ ঘটনাগুলো নিয়ে তুমি যেভাবে ইস্যু বানিয়ে ফেলছ, তাতে দুদিন পরে দেখা যাবে তুমি কাউকেই সহ্য করতে পারছ না। আমি কাউকে লয়ালটি চেক করতে ফোন করেছি মানে এই না যে আমি তার সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছি। টিনএজারদের মতো করছ কেন?”
আমি বললাম, “আমি তো কোনও দিন প্রেম করিনি, আমি জানি না কার মতো করছি। তুমি করেছ, তুমি বলতে পারবে।”
আত্রেয়ী ঠান্ডা গলায় বলল, “তুমি ঝগড়া শুরু করতে চাইছ, তাই তো?”
আমি বললাম, “আমি কিছু শুরু করতে চাইছি না, এই ধরনের ভুলভাল লোককে তুমি ফোন নাম্বার দেবে না, ব্যস!”
আত্রেয়ী হেসে ফেলল, “আচ্ছা হেগোরাম, দেব না। খুশি?”
আমি রাগি গলায় বললাম, “আমি হেগোরাম নই, আমার পাতলা হাগা হয় না।”
আত্রেয়ী বলল, “আচ্ছা। শক্ত হাগারাম। খুশি? কাল দেখা করবে। বেশি চুমু লাগবে বুঝতে পারছি তোমার, নইলে পাগল হয়ে যাচ্ছ। ভাট বকছ।”
আমি এবার হেসে ফেললাম।
৪১ জীমূতবাহন
মাঝরাত।
বৃষ্টি নেমেছে তুমুল। মনে হচ্ছে আজকেই সৃষ্টির শেষ দিন। ঘুম ভেঙে গেছে।
বউ কাঁপছে আবার। বিড়বিড় করে বলে যাচ্ছে, “ছেড়ে যাস না, পাবলোদা, শোন না, শোন, বাবা মা সবাই মারবে আমায়। আমি কী করব বল? এই পাবলোদা, শোন না”…
আমি আলো জ্বালিয়ে ঠেললাম বউকে।
বউ উঠল না। আমি আবার ঠেললাম।
এবার চোখ খুলল, বলল, “কী হল?”
আমি বললাম, “আবার কী সব বলে যাচ্ছো।”
বউ বলল, “কটা বাজে?”
আমি ঘড়ি দেখলাম, “দেড়টা বাজে।”
বউ আনমনে বলল, “হুঁ। কফি খাব।”
আমি বললাম, “এত রাতে কে তোমাকে কফি বানিয়ে খাওয়াবে?”
বউ বলল, “তুমি? খাওয়াও না। ভালো লাগছে না।”
আমি বললাম, “আচ্ছা, দাঁড়াও। দেখছি।”
রুম সার্ভিসে ফোন করলাম। ফোন বেজে গেল। কেউ ধরল না।
মনে পড়ল রুমে ইলেকট্রিক কেটলি আছে। চিনি, চা আর কফির ছোটো ছোটো স্যাশেও আছে। গরম জল বসিয়ে কফি বানিয়ে দিলাম। বউ কম্বল জড়িয়ে খাটের ওপর উঠে বসে কফি খেতে খেতে বলল, “কলকাতা ফিরে আবার ডাক্তার দেখাতে হবে। কমে গেছিল এটা। আবার ফিরে এসেছে।”
আমি বললাম, “দেখিয়ো। বাড়িতে একা ঘুমাতে?”
বউ উপর নিচে মাথা নাড়াল।
বললাম, “একা ঘুমালে বুঝতে কী করে এরকম করছ?”
বউ বলল, “মাঝে মাঝে চেঁচিয়ে উঠতাম। বাবা বা মা ছুটে আসত। বাকি রাতটা আর ঘুমাতাম না।”
আমি বললাম, “তারপর?”
বউ বলল, “একজন সাইকিয়াট্রিস্টকে দেখিয়েছিলাম। উনি ওষুধ দিয়েছিলেন। কমেও গেছিল। ইদানীং আবার শুরু হয়েছে। মেন্টাল স্ট্রেসের জন্যই সম্ভবত।”
আমি বললাম, “কী রকম স্ট্রেস?”
বউ বলল, “অনিরুদ্ধ আর আমার কথা যখন শুরু হয়েছিল, আমি ওর সঙ্গে সেভাবে কথা বলতাম না। অনিরুদ্ধ বিভিন্ন কথা বলত, আর আমি তার উত্তর দিয়ে যেতাম। সোশ্যাল নেটওয়ার্ক ব্যাপারটা তো পুরোটাই অভ্যাস আসলে। অনিরুদ্ধ আমার সিস্টেমে ঢুকে গেল। আমরা সারাক্ষণ কথা বলতে শুরু করলাম। সব বিষয় নিয়ে। একটা সময় আমার পাস্ট নিয়েও কথা বলতে শুরু করলাম। ও আমাকে সাপোর্ট দিত। আমি ওকে।”
