আমি হতভম্ব গলায় বললাম, “তোমার তো নর্থ বেঙ্গলে বাড়ি। কোথায় যাবে তুমি এখন?”
অনিন্দিতাদি বলল, “আপাতত কোনও একটা হোস্টেলে থাকি। তারপর দেখা যাবে।”
আমি কিছু বললাম না। যেরকম চোখ মুখ শক্ত করে রেখেছে, কিছু বলা সম্ভব বলে মনে হল না।
কলিং বেল বাজাতে অনিন্দিতাদির শাশুড়ি দরজা খুললেন। অবাক গলায় বললেন, “কী ব্যাপার বউমা? তুমি এত তাড়াতাড়ি চলে এলে?”
অনিন্দিতাদি বলল, “একটু কাজ ছিল মা। বেরোতে হবে আমাকে। ওর সঙ্গে পরিচয় করুন, আত্রেয়ী, আমার কলিগ।”
অনিন্দিতাদির শাশুড়ি আমার দিকে তাকিয়ে একটু হেসেই অনিন্দিতাদির দিকে তাকিয়ে বললেন, “কোথায় যাবে তুমি? অনিকে বলেছ?”
অনিন্দিতাদি ব্যস্ত গলায় বলল, “হ্যাঁ বলে দেব। বাড়ি থেকে জরুরি ফোন এসেছে তো আসলে। আয় আত্রেয়ী, আমার ঘরে আয়।”
অনিন্দিতাদির শাশুড়ির হতভম্ব মুখ পিছনে ফেলে গুটিগুটি অনিন্দিতাদির পিছন পিছন ওর ঘরে গেলাম।
পরিপাটি করে সাজিয়ে রাখা ঘর। অবশ্য অনিন্দিতাদিকে দেখলেই সেটা বোঝা যায়, সব সময় এত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে থাকে। অনিন্দিতাদি খাটে বসল একটু। খাটের পাশের টেবিলে অনিরুদ্ধদা আর অনিন্দিতাদির বিয়ের ছবি। অনিরুদ্ধদা হাসি হাসি মুখে বসে বিয়ে করছে। ছবিটা দেখে কেমন একটা অদ্ভুত অস্বস্তি হল।
এই লোকটা এভাবে বসে বিয়ে করছে, এতটা অভিনয় কেউ করতে পারে? এতটা?
ভাবতে পারছিলাম না ঠিক। বিশ্বাসও হচ্ছিল না।
অনিন্দিতাদি বলল, “তোকে আর মেসেজ করেছে?”
আমাকে বেশ কয়েকটা মেসেজ করেছিল অনিরুদ্ধদা, কিন্তু আমি অনিন্দিতাদিকে আর চাপ দিতে চাইলাম না। বললাম, “না করেনি আর। কেন বলো তো?”
অনিন্দিতাদি বলল, “আমি ঠিক বুঝতে চাইছি আত্রেয়ী, ও কত দূর এগিয়েছে। এরকম একটা মানুষের সঙ্গে বিয়ে হল আমি তো ভাবতেই পারছি না। এরকম কেন হল বল তো আমার সঙ্গে?”
আমি বললাম, “কিচ্ছু হয়নি অনিন্দিতাদি। কিছুই হয়নি এখনও। তুমি এভাবে ভেঙে পড়ছ কেন? হয়তো এটাই অনিরুদ্ধদার কোনও অসুখ। মানুষ তো রোগের ঘোরেও এরকম কাজ করতে পারে। কথা বলতে হবে। দেখো, কথা বলে যদি সারানো যেতে পারে!”
অনিন্দিতাদি বলল, “কী সারাব আত্রেয়ী? তুই আমাকে বল দেখি, তোর সঙ্গে এরকম হলে কী করতিস তুই?”
আমার হঠাৎ করে মাথাটা ঘুরে উঠল। সত্যিই তো! এরকম হলে আমি কী করতাম? অমৃত যদি আমাকে লুকিয়ে অন্য কোনও মেয়ের সঙ্গে অনিরুদ্ধদার মতোই কিছু করে? বরাবরই ভীষণ শারীরিক ও, আমাদের প্রেমে শরীর আসে। ও এরকমই অন্য কারও সঙ্গে করতে পারে তো! চোখ বন্ধ করে ওর মুখটা মনে করলাম কয়েক সেকেন্ড ধরে। ফোনটা বের করে আমাদের একসঙ্গে তোলা ছবিগুলো দেখলাম। একটা ছবি আছে, যাতে ও আমাকে জাপটে ধরে আছে। কী সুন্দর ছবিটা! সময় পেলেই আমি এই ছবিটা দেখি। কয়েক সেকেন্ড ছবিটার দিকে তাকিয়ে মনের তেতো ভাবটা কাটালাম।
অনিন্দিতাদি আলমারি খুলল। লকার খুলে নিজের গয়নাগুলো খাটে ছুড়ে ফেলতে ফেলতে বলল, “এ বাড়ি থেকে যা দিয়েছিল, ও আমাকে যা কিনে দিয়েছে, সব রেখে যাব। শুধু আমার বাবা মা যা দিয়েছে তাই নিয়ে যাব।”
আমি বললাম, “মাথা ঠান্ডা করো প্লিজ। এভাবে খাটের ওপর ছুড়ে ফেলছ কেন?”
অনিন্দিতাদি আমার কথা শুনল না। কাঁদতে কাঁদতে যা করছিল করে যেতে লাগল। কিছুক্ষণ পর একটা ব্যাগ গোছানো সম্পূর্ণ হলে বলল, “আত্রেয়ী ক্যাব ডাক তো। আমি দেখি কোথায় যাওয়া যায়!”
আমি বললাম, “তুমি আজকের দিনটা আমার বাড়ি চলো অনিন্দিতাদি। তারপর দেখা যাবে। হুইমজিক্যাল ডিসিশন হয়ে যাচ্ছে না তো?”
অনিন্দিতাদি বলল, “না যাচ্ছে না। এক মিনিট দাঁড়া।”
অনিন্দিতাদি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। খানিকক্ষণ পর শাশুড়িকে নিয়ে এসে বলল, “মা, আমি বেরিয়ে যাচ্ছি। আপনারা বিয়েতে যা দিয়েছিলেন, খাটের ওপর থাকল। নিয়ে নেবেন।”
অনিন্দিতাদির শাশুড়ি অবাক হয়ে অনিন্দিতাদির দিকে তাকিয়ে বললেন, “মানে?”
অনিন্দিতাদি আমাকে বলল, “আয় আত্রেয়ী।”
প্রৌঢ়াকে পিছনে রেখে যেভাবে এসেছিলাম সেভাবেই বাড়িটা থেকে বেরিয়ে এলাম।
দুপুর গড়াচ্ছে। খিদেও পেয়েছে। ক্যাব এল। অনিন্দিতাদি গোটা রাস্তা একটা কথাও বলল না।
আমার ফোন বাজছিল। আমি দেখলাম অমৃত ফোন করছে।
ধরলাম, “হ্যালো।”
অমৃত বলল, “অন আসছ না দেখলাম, আজ খুব প্রেশার যাচ্ছে?”
আমি বললাম, “অন্য ব্যাপার আছে, আমি পরে তোমাকে বলি?”
অমৃত “আচ্ছা” বলে ফোনটা রেখে দিল।
ফোনটা রেখে দেখলাম অনিরুদ্ধদা হোয়াটসঅ্যাপ করেছে আবার, “কবে দেখা হচ্ছে?”
৪০ অমৃত
প্রেমের সমস্যা হল, ঝগড়ার প্রথমে মনে হয় দিই সব শেষ করে। তারপর যত সময় যায়, তত মনে হয়, ও কি আদৌ আমার কথাই ভাবছে?
আর তারপর যখন সব মিটে যায়, তখন প্রেম দশ গুণ বেড়ে যায়। এটা সমস্যা বললাম, এই কারণেই যে, আত্রেয়ীর সঙ্গে যেদিন সব মিটল, সেদিনই আত্রেয়ী ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ওর স্কুলে কোন কলিগের কী সমস্যা হয়েছে, সেসব একটা মেসেজে বলে বলল, রাতে জানাচ্ছে সব। বাবা ক্লাবে গেছে, দাদা আর বউদি বেরিয়েছে।
বাড়িতে বসে বসে নেই কাজ তো খই ভাঁজ আত্রেয়ীর প্রোফাইলটা খুললাম আবার। আত্রেয়ী জানিয়েছে, যেই ছেলেটা ওকে দিদিমণি দিদিমণি বলে বাজে ভাবে ফ্লার্ট করত, সেটাকে ব্লক করে দিয়েছে। আমার কথায় নাকি করেনি, ওর নিজেরই মনে হয়েছে ছেলেটা একটা জায়গায় সীমা পেরিয়ে যাচ্ছিল। আমি অনেক কষ্টে কিছু বলিনি। আমার বারবার মনে হয়েছিল ছেলেটাকে গিয়ে রাম খিস্তি মেরে আসি। কোথাকার কোন বেবুনের উল, আমার বউকে উলটোপালটা বলে ফ্লার্ট করার এত সাহস পায় কী করে? সামনে পেলে শরীরের বলগুলো ডিসম্যান্টেল করে টেবিল টেনিস খেলতাম! আত্রেয়ী জানিয়েছে ছেলেটার একটু ইয়ে ছিল বইকি, ও-ই ওকে কাটিয়ে দিয়েছে। আমি তখন বলেছি, ছেলেটার ইয়ে আছে জেনেও তুমি প্রশ্রয় দিয়েছিলে কেন?
