আমি হেসে বললাম, “হ্যাঁ ঠিক আছি। তুমি বলো না আমায় কী হয়েছে। কেমন লাগছে। আচ্ছা এসো।”
অনিন্দিতাদিকে নিয়ে টিচার্স রুম থেকে বেরোলাম।
ক্লাস টেনের পরীক্ষা চলছিল বলে ছুটি ছিল। টেন এ-তে ফাঁকা ক্লাস রুমে নিয়ে গিয়ে বসালাম।
অনিন্দিতাদি বসেই কেঁদে ফেলল। জোরে জোরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না।
আমি অনিন্দিতাদির হাত ধরে বসে রইলাম।
কান্না থামতে বলল, “আত্রেয়ী, আমার সব শেষ হয়ে গেল রে।”
আমি বললাম, “কেন গো? কী হয়েছে?”
অনিন্দিতাদি বলল, “আমি কনসিভ করেছি কালকে জানতে পারলাম।”
আমি খুশি হয়ে বললাম, “সে তো ভারী খুশির কথা।”
অনিন্দিতাদি বলল, “আর কালকেই জানতে পারলাম আমার বর আমাকে চিট করছে দিনের পর দিন।”
আমি স্তম্ভিত হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে বললাম, “মানে?”
অনিন্দিতাদি বলল, “বিয়ের আগে থেকে ওর একটা মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। মেয়েটা ওকে রিজেক্ট করায় আমাকে বিয়ে করে। বিয়ের পরে মেয়েটার মনে হয়েছিল ও ভুল করেছে। অনিরুদ্ধ ওর সঙ্গে আমাকে লুকিয়ে যোগাযোগ করে চলেছে। ওদের মধ্যে ফিজিক্যাল রিলেশনও আছে সম্ভবত।”
আমি বললাম, “ধুস। এগুলো মিথ্যেও তো হতে পারে। লোকমুখে শুনেছ? অন্যের কথা শুনে এসব বলতে নেই।”
অনিন্দিতাদি বলল, “না রে। প্রমাণ আছে। আমি কী করি বল তো? বাচ্চাটাকে নষ্ট করে ফেলব?”
অনিন্দিতাদি কেমন অসহায় চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
আমি কী বলব বুঝেই উঠতে পারলাম না।
৩৭
মানুষ সম্পর্কে বাঁচে। সম্পর্ক যতদিন না কারও সঙ্গে তৈরি হয়, মানুষ একরকমভাবে থাকে। সম্পর্কের পর সে মানুষের বাঁচা মরার রকমভেদ হয়।
বাঙালির যেমন দুর্গাপুজো। দুর্গাপুজোর আগে মানুষের জীবন একরকম থাকে। পরে আর-একরকম।
সম্পর্কটাও তাই। যারা বলে একটা ব্রেক আপে তাদের কিছু যায় আসে না, ভুল বলে। ব্রেক আপ মানুষকে দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে যায়। সব কিছুর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটাই পরিবর্তন হয়ে যায়।
অনিন্দিতাদিকে দেখে আমার অস্বস্তি হচ্ছিল। এই অনিন্দিতাদিই আমাকে একদিন বলেছিল, “কেন চাকরি করি জানিস? কোওন পরের বাড়ির ছেলে যেন একদিন দুম করে বলে না বসতে পারে, আমার টাকায় খাও পরো, লজ্জা লাগে না?”
খুব কাঁদছিল অনিন্দিতাদি।
আদৃতা এসে গেছিল রুমটায়। আমি ইশারায় ওকে চলে যেতে বললাম।
অনিন্দিতাদি বলল, “আমি কী করি বল তো আত্রেয়ী?”
আমি বললাম, “দাদাকে জিজ্ঞেস করো সরাসরি। কী আবার করবে? এটা তো আর প্রেম না যে ব্রেক আপ হয়ে গেলেই সব মিটে যাবে। রীতিমত সই সাবুদ করে বিয়ে করেছ। একজন স্ত্রী হিসেবে সমস্ত আইনগত সুবিধা পাবে তুমি। এসব মানুষকে সহজে ছাড়তে নেই। এ তো রীতিমত ফ্রড কেস দিদি।”
অনিন্দিতাদি কান্না থামিয়ে ঠান্ডা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি ওকে জেলে দি, ফাঁসি দি, যাই করি, ও তো আমায় ভালোবাসে না। তাহলে এসব করেই বা কী হবে?”
আমার চোয়াল শক্ত হচ্ছিল। বললাম, “হবে। অনেক কিছুই হবে। তুমি হয়তো একরকম ভেবেছ, কিন্তু যারা মানুষকে এভাবে ঠকায়, তাদের ছেড়ে দিলে তুমি অপরাধ করবে। অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, দুজনেই অপরাধী দিদি। অনিরুদ্ধদা যেমন অন্যায় করে দোষী, তুমি যদি ওকে সহজে ছেড়ে দাও, তবে তুমি অন্যায় সহ্য করে দোষী হবে। তুমি নাহয় ওকে ডিভোর্স দিয়ে দিলে, কিন্তু ও যে আর-একটা বিয়ে করে সে মেয়েটার জীবনও তোমার জীবনের মতোই অসহনীয় করে দেবে না তার কোনও গ্যারান্টি আছে?”
অনিন্দিতাদি আমার হাতদুটো ধরল হঠাৎ। বলল, “আচ্ছা, অ্যাবরশন কোথায় করা হয়, জানিস?”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “মানে? তুমি বাচ্চাটা নেবে না?”
অনিন্দিতাদি বলল, “না, নেব না। অনাদরের বাচ্চা রাখব না। তাতে আমি মরে গেলে যাব। কিন্তু এই বাচ্চা আমি কিছুতেই নিতে পারব না।”
আমি মাথায় হাত দিয়ে বসলাম। স্কুলের ঘণ্টা পড়েছে। ভাগ্য ভালো আমার এখন কোনও ক্লাস নেই। টিচার ইন-চার্জ যদি না অন্য কোনও স্টপ গ্যাপে পাঠান তাহলে কিছুটা সময় পাওয়া যাবে।
বললাম, “তুমি যাই করো অনিন্দিতাদি, একটা দিন বা দুটো দিন পরে করো। রাগের মাথায় বা কোনও কিছুর ঝোঁকে পড়ে কিছু করতে গেলে মানুষ আরও বেশি করে ভুল করে ফেলে।”
অনিন্দিতাদি ধরা গলায় বলল, “একটা মেয়ের তো সব কিছু ঘিরে ওই একজনই থাকে রে আত্রেয়ী। সে-ই তার সব হয়, ওই যে পৃথিবী না কী বলছিস সে সব। আমার তো পায়ের তলার মাটিটাই সরে গেছে। ঈশ, কী লজ্জা বল তো, লোকে যখন জানতে পারবে আমার হাজব্যান্ড আমাকে দিনের পর দিন ঠকিয়েছে, ঈশ।”
অনিন্দিতাদির গলা বুজে এল।
আমি আমার ব্যাগ থেকে বের করে জলের বোতল বের করে অনিন্দিতাদির হাতে দিয়ে বললাম, “জলটা খাও আগে। নাও।”
অনিন্দিতাদি অনেকটা জল খেল।
বললাম, “শোনো, আমাকে ফোনটা দাও। অনিরুদ্ধদার সঙ্গে আমি কথা বলি।”
অনিন্দিতাদি বলল, “তুই বলবি?”
আমি বললাম, “হ্যাঁ। ফোন ধরে দাও তো। সকালে কথা হয়েছিল?”
অনিন্দিতা বলল, “হ্যাঁ। আমি স্বাভাবিক কথা বলেছি। বুঝতে দিইনি কিছু।”
আমি বললাম, “কেন বুঝতে দাওনি?”
অনিন্দিতাদি বলল, “বুঝিয়ে কী হবে?”
আমি বললাম, “নাম্বারটা দাও। আমি অন্য একটা জিনিস করি। লয়ালটি টেস্ট। একটা চ্যানেলে হত, খুব দেখতাম।”
