অ্যাকসেপ্ট করেই পিং করল, “কী রে, অ্যাদ্দিন পরে মনে পড়ল?”
আমি বললাম, “একদম। কেমন আছিস রে? বিয়ে করেছিস দেখলাম!”
ফোনে অনিরুদ্ধর মেসেজ এল একটা, “আমার ঋতুজাকে যদি কিছু করেছিস তাহলে তোর কপালে দুঃখ আছে।”
অনিন্দিতা আমার মেসেজের রিপ্লাই করল, “এই তো। কদিন হল। তুই বিয়ে করলি?”
ঘরের কলিং বেল বাজল। কফি দিতে এসেছে।
বউ কফিতে চুমুক দিয়ে বলল, “উফ, এসব জায়গায় কফি খেতে হেবি লাগে। একটা সিগারেট ধরাই?”
আমি বললাম, “ঘর ধোঁয়ায় ভরে যাবে। কী দরকার?”
বউ বলল, “তাও ঠিক। ঘুমটা নষ্ট হবে। থাক।”
আমি ফোনের দিকে তাকালাম।
অনিন্দিতা আমার প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে একটা জিজ্ঞাসাচিহ্ন দিয়েছে।
আমি লিখলাম, “বিয়ে করেছি রে। তবে যে মেয়েটাকে বিয়ে করেছি, সে লোকটা একটা সদ্যবিবাহিত লোকের প্রেমিকা। খুব জটিল।”
অনিন্দিতা চোখ বড়ো বড়ো করা স্মাইলি পাঠিয়ে লিখল, “ওরে বাবা। সে কী রে! তুই মানছিস কেন? লোকটাকে ধরে ক্যালা।”
আমি হাসির স্মাইলি দিয়ে লিখলাম, “ধুস। সে তো ভুবনেশ্বরে বসে আছে। তাকে পাব কী করে?”
অনিন্দিতা লিখল, “ভুবনেশ্বরে? কী নাম রে? আমার বরও আছে। নামটা বল তো। দেখি বরকে বলে। চেনে নাকি!”
আমি চুপ করে বউয়ের দিকে তাকালাম। ফোনটা টেবিলের ওপর রেখে সোফায় পা তুলে বসলাম। অমিতাভ বচ্চন বিষ ভরা পায়েস খাচ্ছেন। ভীষণ ইমোশনাল সিন।
ফোনে মেসেঞ্জার টোন বাজল। হাতে নিয়ে দেখলাম অনিন্দিতা লিখেছে, “কী রে মড়া, কোথায় গেলি?”
আমি অনিরুদ্ধর ফেসবুক প্রোফাইল থেকে ওর ডিপিটা অনিন্দিতাকে পাঠিয়ে বললাম, “এই লোকটা।”
ওপাশে মেসেজটা সিন হল। আর কোনও রিপ্লাই এল না।
৩৬ আত্রেয়ী
কোনও কোনও দিন আসে, যে দিনগুলো টিভি সিরিজের সময় নষ্ট করার মতো সময় নিয়ে আসে। আমরা ঘুম থেকে উঠি, খাই দাই, স্কুল কলেজ অফিস যাই, আবার ফিরে খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি।
আর কোনও কোনও দিন আসে, যে দিনগুলো ঘটনাবহুল হয়। ওই একদিনেই এমন সব কাণ্ড ঘটে, যা আমাদের গোটা জীবন, চিন্তাভাবনাকে নাড়িয়ে দিয়ে চলে যায়।
এরকম সুন্দর সকালও তো আমার জীবনে খুব একটা আসেনি।
অমৃত যখন অপরাধী অপরাধী মুখ করে আমার সঙ্গে কথা বলছিল, বারবার ক্ষমা চাইছিল, আমার মনে হচ্ছিল ওর মাথার চুলগুলো ঘেঁটে দি। বাবা না থাকলে সারা মুখে চুমু খেতাম। এমন পাগলামি প্রেম তো কোনও দিন করিনি। প্রেম শব্দটা সম্পর্কেই একটা ভীতি কাজ করে এসেছিল চিরকাল। ভেবেছিলাম কোনও দিন বিয়ে করব না। বিয়ে সম্পর্কেও আমার ভীতি আছে।
অমৃত যখন অমন করে আমার ওপর হম্বিতম্বি করছিল, খুব রাগ হয়েছিল। শুতে পারছিলাম না। ছটফট করছিলাম। গোটা দিনটা তেতো হয়ে গেছিল। ক্লাস নিতে নিতে কখন যে দু চোখ দিয়ে অবিশ্রান্ত জলের ধারা নেমে যাচ্ছিল, বুঝতে পারছিলাম না। ছাত্রছাত্রীরা অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল, কিন্তু কেউই কিছু বলতে সাহস পাচ্ছিল না।
সম্পর্ক তো এভাবে হয় না। একজন মালিক হবে, আর একজন কুকুর। পায়ের তলায় রেখে দেবে তাকে। সে কুকুর কারও সঙ্গে কথা বলবে না। মালিক যেভাবে বলবে, যেমনভাবে চলতে বলবে, তেমনভাবে চলবে।
এরকম সম্পর্ক থেকেই তো আমি বরাবর ভয় পেয়ে এসেছি। তবে অমৃতও সেরকম হয়ে গেল। যতবার ভেবেছি, কান্না পেয়েছে। চোখ মুখ শব্দ করে টিচার্স রুমে বসে ছিলাম।
আদৃতার প্রগলভ কথা ভালো লাগেনি।
বরং অনিন্দিতাদি খানিকটা বুঝেছিল আমার মুড ঠিক নেই। কখন যেন পাশে এসে পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেছিল, “কী রে পাগলি, কী হয়েছে?”
কেউ এভাবে বললে ঠিক থাকা যায় না। আমি হঠাৎ করে কেঁদে ফেলেছিলাম।
অনিন্দিতাদিও আর জানতে চায়নি কী হয়েছে। কিন্তু অনেকক্ষণ ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছে। বলেছে, “মন খারাপ করিস না।”
আজ সকালে অমৃত স্কুলে নামিয়ে দিয়ে গেল। ওকে জড়িয়ে ধরে পিঠে মুখ গুঁজে বসে ছিলাম। অমৃত অপরাধীর মতো মুখ করে ছিল। তবু খুব কষ্ট হচ্ছিল।
ভালোবাসলে বুঝি এমনই হয়। এত নির্ভরতা কোত্থেকে আসে কে জানে!
স্কুলে নামিয়ে দিয়ে যাবার সময় অমৃত বলল, “রাস্তা পার হবে সাবধানে।”
তখনও আমার কান্না পাচ্ছিল। অনেক কষ্টে সেসব সামলে বলেছি, “তুমি বাইক চালিয়ো সাবধানে। আর রাগটা কমাও। এই বয়সে হাই প্রেশার হলে ভালো লাগবে?”
অমৃত ফিক করে হেসে দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল যতক্ষণ না আমি রাস্তা পার হলাম তারপর। স্কুলের গেট দিয়ে ঢোকার আগে আমি দাঁড়িয়ে ইশারা করলাম, “যাও।”
অমৃত বেরিয়ে গেল। যতক্ষণ ওর বাইকটা দেখা যায়, ততক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। ঝগড়া হবার পর মিল হলে বুঝি এমন ভাবেই ভালোবাসা বাড়ে?
ঘোরের মধ্যে ছিলাম। সেটা ভাঙল টিচার্স রুমে এসে। লাফাতে লাফাতে এসে অনিন্দিতাদিকে জড়িয়ে ধরতে যাব, দেখলাম অনিন্দিতাদি কেমন পাথরের মতো বসে আছে। রোজ কী সুন্দর করে চুল বেঁধে আসে, আজ আসেনি। চোখে মুখে প্রসাধনের চিহ্নমাত্র নেই। কাল পর্যন্ত কত সুন্দর করে সিঁদুর পরে এসেছিল, আজ সিঁদুরটাও পরেনি। বাণীদি খাতা দেখছিলেন। আদৃতা আসেনি তখনও। অন্য কোনও দিদিও আসেননি।
আমি অনিন্দিতাদিকে বললাম, “এই, কী হয়েছে? কোনও ব্যাড নিউজ?”
অনিন্দিতাদি ম্লান মুখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “না তো। কিছু হয়নি। তুই কেমন আছিস বল? ঠিক আছিস?”
