রাবংলায় কোন এক গ্রামে থাকার কথা ছিল, কিন্তু আসল জায়গায় দেখা গেল ড্রাইভার কোনও হোম স্টে না জোগাড় করে সরাসরি একটা হোটেলে নিয়ে তুলল।
বউ রাগারাগি করছিল বটে, কিন্তু সে ছোকরা নেপালি ভাষায় কী সব কিচকিচ করে বলে কেটে পড়ল।
বউ বলল, “ডিসগাস্টিং। আমার একদম এরকম লোকালিটির মধ্যে থাকতে ভাল্লাগে না। অফবিট জায়গা খুঁজতে বেরোলাম, কোনও কাজ হল না। হুস।”
আমি পাড়াগেঁয়ে গরিব আদমি। এই সব “অফবিট” শব্দ-টব্দ ফেসবুকেই শুনেছি, থুড়ি দেখেছি। চিরকাল ভিড়ের মধ্যে ঘুরে বেড়ানো অভ্যাস। বউয়ের কথা শুনে বললাম, “তাহলে কি বাক্স প্যাঁটরা নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ব?”
বউ রাগি গলায় বলল, “নাহ। আমার ঘুম পেয়েছে। খিদেও পেয়েছে। কিন্তু ড্রাইভারটাকে আমি ছাড়ব না। ওর কপালে দুঃখ আছে।”
আমি চুপচাপ ভালো মানুষের মতো হোটেলের রুমে ঢুকে পড়লাম। সুন্দর গিজার আছে। গরম জলে স্নান সেরে খেয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লাম যখন, তখন বেলা গড়িয়েছে। সাড়ে চারটে বাজে। বৃষ্টি বন্ধ হয়ে আবার হালকা রোদ উঠেছে।
বউ বলল, “তুমি শুয়ে থাকবে? বিকেলে বেরোবে না?”
আমি বললাম, “তুমি বেরোবে? তাহলে বেরোব।”
বউ বলল, “আমার একটু লোকাল বাজারে যেতে হবে। কেনার আছে কিছু।”
আমি বললাম, “ঠিক আছে, তৈরি হয়ে নাও।”
বউ বলল, “মদ খাব আজ। হুইস্কি কিনো। তুমি হুইস্কি খাও?”
আমি বললাম, “খাই। কিন্তু তোমার সঙ্গে খাব না। তুমি খেয়ো।”
বউ রাগি গলায় বলল, “কেন, খাবে না কেন? কী হয়েছে?”
আমি বললাম, “এমনি, ইচ্ছা নেই খাবার তাই খাব না। তোমায় কিনে দেব, খেয়ো যত খুশি।”
বউ জামাকাপড় নিয়ে বাথরুমে যেতে যেতে বলল, “যা ইচ্ছে করো। তৈরি হও। বেরোব।”
বেরোলাম কিছুক্ষণ পরেই।
ফোনটা যখন এল তখন সাড়ে পাঁচটা বাজে। বউ একটা দোকানে ঢুকে কীসব কিনছিল। আমার ফোনটা বেজে উঠল। দেখি আননোন নাম্বার। ধরলাম, “হ্যালো।”
“হ্যালো, ঋতুজা আছে? অ্যাকচুয়ালি ওর ফোনটা পাচ্ছি না।”
আমি কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বললাম, “আপনি?”
“আমি অনিরুদ্ধ। ঋতু মনে হয় আপনাকে আমার কথা বলেছে, তাই না ভাই?”
আমি আবার একটু চুপ করে থেকে বললাম, “ও, আপনিই সেই মাতৃসম্ভোগকারী বঞ্চিত শুয়োর?”
ওপাশ এবার একটু চুপ থেকে বলল, “মানে? কী বলতে চাইছেন?”
আমি চোখ বন্ধ করে যত খিস্তি জানি সব মনে করলাম। তারপর বলতে শুরু করলাম। কয়েক সেকেন্ড পরে ওপাশ থেকে ফোনটা কেটে গেল।
বউ দোকান থেকে বেরিয়ে দেখল আমি থরথর করে কাঁপছি।
অবাক গলায় বলল, “কী হয়েছে তোমার? মৃগী আছে নাকি?”
আমি ধাতস্থ হয়ে বললাম, “না, এমনি। চলো। যাওয়া যাক।”
৩৫
সন্ধ্যা নেমেছে। তার সঙ্গে নেমেছে তুমুল বৃষ্টি।
হোটেলের বয় জানাল রাবংলার বৃষ্টি এমনই। যখন হবে সারাক্ষণ ধরে হতেই থাকবে।
বৃষ্টির শব্দটা দারুণ লাগছিল। গরম গরম চিকেন পকোড়া আর কফি দিয়ে গেছে। আমি কফি খাচ্ছি। বউ কম্বলের তলায় শুয়ে টিভি দেখছে।
ফোনে মেসেজে ভরে যাচ্ছে। অনিরুদ্ধ অজস্র থ্রেট দিয়ে চলেছে। আমি দেখছি।
ফোনটার ব্যাপারে বউকে কিছুই বলিনি। চুপচাপ শপিং সেরে চলে এসেছি।
কীসব কিনল।
আমার মনটা একটু মদ মদ করছিল বটে এই ওয়েদারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত খাব না বলেই ঠিক করলাম।
এরকম নিঃস্পৃহ বেড়ানো আমার জীবনেও হয়নি। কোথাও গেলে বাড়ির সবাই মিলে বেড়াতে যেতাম ছোটোবেলায়। কাকার ছেলেরা, জেঠুর ছেলেরা মিলে লাফঝাঁপ দিয়ে সবাইকে অস্থির করে তুলতাম।
একটা ঘরে দরজা বন্ধ করে বসে থাকার কথা কোনও দিন ভাবিওনি।
নিজেকে কেমন সাইকো মনে হচ্ছে। পরিস্থিতি সুস্থ মানুষকে সাইকো বানিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
আমার নিজেকে তেমন মনে হচ্ছে।
অনিরুদ্ধ ফোন করা শুরু করল।
বউ বলল, “কে ফোন করছে?”
আমি বললাম, “অফিস থেকে ফোন আসছে। ধরব না ধুস।”
বউ বলল, “তুমি এরকম কাজ থেকে পালিয়ে থাকো নাকি?”
আমি বললাম, “কাজের মধ্যেই তো থাকি সারাদিন। এখন একটু পালিয়ে থাকি নাহয়।”
বউ বলল, “ও। আর-একটা কফি বলো। খুব ভালো বানিয়েছে।”
আমি রুম সার্ভিসে ফোন করলাম।
চুপ করে বসে টিভি দেখতে দেখতে মাথায় একটা বুদ্ধি এল।
বউকে বললাম, “তুমি ফেসবুকে আছ?”
বউ বলল, “আছি তো। কেন? অ্যাড করবে?”
আমি বললাম, “না না, এমনি। কোনও কারণ নেই।”
বউ বলল, “অ্যাড করলে করো, কিছু লিখো না। লোকজনকে জানাবার প্রয়োজন নেই। আমি কাউকে কিছু জানাইনি।”
আমি বললাম, “তুমি রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট না করলে লিখবই বা কী করে? তা ছাড়া অ্যাড করছি না। এমনিই মনে হল হঠাৎ করে আর কি।”
বউ বলল, “ওহ। তাহলে ঠিক আছে।”
সেট ম্যাক্সে পঞ্চান্ন কোটি বারের মতো সূর্যবংশম দিয়েছে। বউ সেটা দেখতে লাগল।
আমি আর কোনও কথা না বলে ফোন ঘেঁটে বউয়ের প্রোফাইল বের করলাম।
হুঁ, এই তো, অনিরুদ্ধ আছে!
কমেন্ট করেছে একটা ছবিতে।
অনিরুদ্ধর প্রোফাইল খুললাম।
বউয়ের সঙ্গে ফটো দিয়েছে, এবং কী সর্বনাশ! এ তো অনিন্দিতা! আমাদের সঙ্গে পড়ত একই কলেজে, একই ক্লাসে!
হাসি পেয়ে গেল।
পৃথিবী গোল।
অনিন্দিতা প্রি-ওয়েডিং থেকে শুরু করে গাদাগুচ্ছের ফটো দিয়েছে। সব বসে বসে দেখতে লাগলাম।
কী মনে হতে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টও পাঠিয়ে দিলাম।
মিনিট পাঁচেকের মধ্যে রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট হয়ে গেল। অনিন্দিতা অনলাইনই ছিল।
