আমি “আচ্ছা” বলে ফোন রাখলাম। হৃৎস্পন্দন বাড়ছিল।
ঠিক করে স্নান না করে অফিস গেলাম।
প্রতাপ দেখেই বলল, “কী রে ভাই, আজ এরকম ঝোড়ো কাকের মতো অবস্থা কেন?”
আমি মাথায় হাত দিয়ে বসে বললাম, “সমস্যা হয়ে গেছে। ঋতুজাকে পাচ্ছি না।”
প্রতাপ বলল, “সে তো বিয়ে করেছে। এখন না পেলেই বা কী করবি? বরের সঙ্গে ফুর্তি মারছে দেখ গে।”
আমি কড়া চোখে প্রতাপের দিকে তাকিয়ে বললাম, “ফালতু বকিস না। বরের সঙ্গে ফুর্তি মারবে কী, ওই বানচোদকে ও ছুঁতে পর্যন্ত দেবে না এটা আমি লিখে দিতে পারি।”
প্রতাপ বলল, “বেশ তো। তোর তো বউ আছে। ওর সঙ্গে থাক গিয়ে।”
আমি কয়েক সেকেন্ড প্রতাপের দিকে তাকিয়ে বললাম, “দে সে, প্রেমটা ড্রিবলিং, বিয়েটা গোল। বল জালে শেষ অবধি না জড়ালেও, কিছু ড্রিবলিং চিরকাল মনে থেকে যায়*।” (*লেখা ঋণ— বাউন্ডুলে)
প্রতাপ হেসে ফেলল, “ঋতুজার বর গোল দিয়ে দিল তো। এবার?”
আমি প্রতাপের দিকে স্থির চোখে তাকালাম। পেপারওয়েটটা হাতে ছিল। ইচ্ছা করছিল প্রবল জোরে প্রতাপের দিকে ছুড়ে মারি। অতি কষ্টে আটকে বললাম, “তোকে আমি একবার বলেছি, ও আমাকে ছাড়া কাউকে ছুঁতে দেবে না।”
প্রতাপ জলের গ্লাসটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “ওকে, কুল, কুল। মাথা ঠান্ডা কর প্লিজ। আমি কথা দিচ্ছি, এটা নিয়ে তোকে আমি রাগাব না। শোন, বল, আমাকে বল আমি কী করব।”
আমি বললাম, “ওকে কনভিন্স করা। সব কিছু ছেড়ে আমরা দুজন কোথাও পালিয়ে যাব। সম্ভব হলে স্টেটসে। কোথাও একটা হলেই হল। আমার বউ দরকার নেই, বউকে আমি ছেড়ে দিচ্ছি। ওকে কনভিন্স কর, ও বরকে ছেড়ে চলে আসুক।”
প্রতাপ মাথায় হাত দিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, “ভাই আমার জেল হবে। তুই খেপেছিস?”
আমি বললাম, “তুই না বললে তোকে খুনের দায়ে আমার জেল হবে এটা মনে রাখিস। আমার জন্য তোকে এটা করতে হবে।”
প্রতাপ বলল, “ওকে, কুল। মাথা ঠান্ডা কর। আমি বলব। কথা দিলাম। দে ওর নাম্বার দে।”
আমি বললাম, “তোকে তো বললাম, ওকে ফোনে পাচ্ছি না। বিকেলে ওর বরের নাম্বার পেতে পারি, ওকে ফোন করে নিস।”
প্রতাপ হতভম্ব গলায় বলল, “ওর বরকে ফোন করে আমি ওকে চেয়ে এসব বলব? তুই পাগল হয়ে গেছিস? কী সব বলছিস, এ কী রে?”
আমি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম, আমার ফোনটা বেজে উঠল। ভাবলাম ঋতুজা ফোন করছে, লাফিয়ে উঠে ধরতে গিয়ে দেখি অনিন্দিতা ফোন করছে।
আমি ব্যাজার মুখে প্রতাপের দিকে একবার তাকিয়ে ফোনটা রিসিভ করলাম, “হ্যালো।”
অনিন্দিতা বলল, “কী ব্যাপার বলো তো, কাল প্রায় রাত তিনটে অবধি হোয়াটসঅ্যাপে তোমাকে লাস্ট সিন দেখাচ্ছিল। কী করছিলে?”
আমি বললাম, “কিছু না। হবে কোনও সমস্যা। কেন, কী হয়েছে?”
অনিন্দিতা খুশি খুশি গলায় বলল, “একটা সারপ্রাইজ আছে।”
আমি বললাম, “কী?”
অনিন্দিতা বলল, “প্রেগনেন্সি কিট পজিটিভ ফিডব্যাক দিয়েছে।”
আমি হতভম্ব মুখে ফোনটা হাতে দাঁড়িয়ে রইলাম।
৩৪ জীমূতবাহন
পাহাড়ের সমস্যা হল কখন যে বৃষ্টি নামবে, আর কখন যে রোদ উঠবে কেউ বলতে পারে না।
হোম স্টেতে যেরকম ভালো আবহাওয়া পেয়ে বেরিয়েছিলাম, সিকিমে ঢোকার কিছুক্ষণের মধ্যে সেটা উবে গেল। পরিবর্তে শুরু হল আবার গতকালের মতো বৃষ্টি। গাড়িটা যাও বা চলছিল ধীরে সুস্থে, খানিকক্ষণ পরে দেখা গেল রাস্তায় আবার ধ্বস নেমে গেছে। গাড়ির লাইন লেগে গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই।
বউ ঘুমাচ্ছিল। উঠে পড়ে বলল, “বাহ, ধ্বস নেমেছে? সুন্দর।”
আমি রাগি গলায় বললাম, “সুন্দরের কী আছে? পাহাড়ে ধ্বস নামবে এটা সুন্দর? রাস্তা আটকে গেল, সেটা ভাল্লাগছে?”
বউ বলল, “তুমি রেগে যাচ্ছ কেন? পাহাড় মানেই তো আনসার্টেনিটি। এরকম তো হবারই ছিল। এত ভাবার কী আছে?”
আমি বললাম, “ভাবার আছে, কারণ আমার এত তাড়াতাড়ি মরে যাবার কোনও ইচ্ছা নেই। কোনও ভাবে যদি আমাদের গাড়ির ওপরেই ধ্বস নেমে যায়, তাহলে কী হবে?”
বউ বলল, “মরে যাবে! আবার কী হবে? বেঁচে থেকে কী এমন লাভ আছে?”
আমি বললাম, “সে জেনে তুমি কী করবে? তোমার মতো উদ্দেশ্যহীন লাইফ লিড করি না তো।”
বউ বলল, “তাই বুঝি? তা কী এমন উদ্দেশ্য আছে তোমার জীবনে? কী হবে তুমি? মুকেশ আম্বানি না শাহরুখ খান?”
আমার মাথায় রক্ত চড়ছিল। এরকম করে কেউ তর্ক করলে আমার খুব রাগ হয়ে যায়। আমি বললাম, “যাই হই, তোমাকে বলতে যাব কেন? তুমি যে চুলোয় যাও, বাঁচো, মরো, মাঝরাতে দুঃস্বপ্ন দেখে উঠে বসে থাকো, সেটা তোমার সমস্যা, তুমি বুঝবে। আমি আমার মতো করে থাকব। সেটাই ভালো।”
বউ বলল, “আচ্ছা। তাই হবে। তুমি তোমার মতো করেই থেকো। এবার একটা কাজ করতে পারো। ঘুমিয়ে পড়ো বরং।”
আমি বললাম, “ঘুমিয়ে পড়ব? এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আমি ঘুমিয়ে পড়ব? আমি কি তোমার মতো কুম্ভকর্ণ?”
বউ হেসে ফেলল। বলল, “তোমার হেড অফিস হেবি গরম। এত রাগ ভালো না। প্রেশার আছে তোমার?”
আমি বললাম, “জানি না। থাকলে থাকবে। তোমার জেনে কী কাজ?”
বউ বলল, “তা ঠিক। আচ্ছা। আমি আবার ঘুমাই তবে।”
বলে আমাকে অবাক করে চোখ বন্ধ করল, আর ঘুমিয়ে তলিয়ে গেল।
আমি কয়েক সেকেন্ড ওর দিকে কঠিন চোখে তাকিয়ে যখন বুঝলাম ও সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছে, আমি গাড়ি থেকে নামলাম। বৃষ্টি পড়ছে ঝিরঝির করে। রাস্তার অবস্থা সঙ্গিন। একটা মেশিন এসেছে, রাস্তা পরিষ্কার হচ্ছে। গাড়িতে এসে বসলাম। আধঘণ্টা পরে রাস্তা ছাড়ল।
