ভোর হতেই বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
শহরটার বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রূপ থাকে। রাত হলে একরকম।
ভোর হলে আর-একরকম।
কর্পোরেশনের গাড়ি বেরিয়েছে। পুলিশ টহলদারি গাড়ি ক্লান্ত হয়ে ফিরছে। ফাঁকা বাসগুলো রাস্তায় বেরিয়েছে কমসংখ্যক যাত্রী নিয়ে। অবশ্য পেপারওয়ালারা ভীষণ ব্যস্ত। তারা হুড়মুড়িয়ে সাইকেল নিয়ে রওনা দিয়েছে।
আমার এত সব কিছু দেখার সময় ছিল না। আমি বাইক চালিয়েছি মনের সুখে। আত্রেয়ীদের বাড়ির সামনে গিয়ে যখন পৌঁছোলাম তখন সাড়ে পাঁচটা।
বাইরের গেট বন্ধ।
আমি পাঁচিল ডিঙিয়ে কলিং বেল বাজালাম।
বেশ খানিকক্ষণ পরে আত্রেয়ীর বাবা ঘুমচোখে দরজা খুলে আমাকে দেখে বললেন, “এত সকালে? কী ব্যাপার?”
আমি বললাম, “ইয়ে, কাকু, না জেঠু, মানে বুঝতে পারছি না কী বলব, আত্রেয়ী আছে?”
আত্রেয়ীর বাবা দরজা ছেড়ে দাঁড়িয়ে বললেন, “হ্যাঁ আছে তো। এসো ভিতরে এসে বসো। কী হয়েছে? এত সকালে?”
আমি মাথা চুলকে বললাম, “তুমুল ঝগড়া। মার মার কাট কাট যাকে বলে।”
আত্রেয়ীর বাবা ঘুমচোখেই হো হো করে হেসে ফেলে বললেন, “মার মার কাট কাট? আচ্ছা, দাঁড়াও। আমি চা বসাই। দুজনে একটু গল্প করি, তারপর নাহয় মুনাইকে ডেকে দিচ্ছি। তোমার মার মার কাট কাট ঝগড়াটা আমার ভালো লেগেছে। একটু বলবে নাকি আমাকে?”
আমি সোফার উপর বসে পড়ে বললাম, “কিছুই না, মানে আমার মাথাটা হঠাৎ করে গরম হয়ে যায় তো। শনি খুব নিচে।”
আত্রেয়ীর বাবা কৌতুকপূর্ণ চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “ওরে বাবা, এসব জ্যোতিষ চর্চাও করা হয় নাকি?”
আমি বললাম, “না না, শনি নিচে সেটা দেখা তো খুব সোজা। এই দেখুন না আমার কেনো আঙুলটার যেখান থেকে উৎপত্তি, তার পাশের আঙুলটার উৎপত্তিস্থল থেকে কত নিচুতে। আমার এক বন্ধু জ্যোতিষচর্চা করে। ওর থেকেই শিখেছিলাম। ও আমাকে বলেছিল আমার শনি খুব নিচে। কী সব রত্ন দিতে চেয়েছিল, আমিই নিইনি।”
আত্রেয়ীর বাবা বললেন, “ভালো করেছ নাওনি। মানুষের ভাগ্য মানুষের নিজের হাতেই থাকে। তোমার শনি তোমাকেই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। রাগটাও। মুনাইয়েরও রাগ মারাত্মক। তোমারও। তা এত রাগ থাকা কি ভালো?”
আমি বললাম, “জানি তো ভালো না। চেষ্টা করি সামলাতে।”
আত্রেয়ীর বাবা বললেন, “মানুষের সবথেকে খারাপ রিপু রাগ। বাকিগুলোও বেকায়দায় ফেলে বটে, কিন্তু রাগ এমন একটা বস্তু যা সুস্থ, স্বাভাবিক মানুষকে অমানুষ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। চেষ্টা কোরো এ রিপু দমন করতে। আমি মুনাইকে ডাকছি, অপেক্ষা করো।”
ভদ্রলোক উঠে ভিতরের ঘরে গেলেন।
কিছুক্ষণ পরে আত্রেয়ী এল। আমাকে দেখে কঠিন গলায় বলল, “তুমি এত ভোরে?”
আমি উঠে আত্রেয়ীর হাত ধরে বললাম, “আমায় ক্ষমা করো প্লিজ। বিরাট ভুল হয়ে গেছে। তুমি যার খুশি প্রোফাইলে লাভ রিয়্যাক্ট দাও, যে তোমার প্রোফাইলে যা খুশি কমেন্ট করুক, আমি তোমাকে কিছু বলব না। প্লিজ। ক্ষমা করে দাও।”
আত্রেয়ী সরে গিয়ে বলল, “বাবা আছে, কী করছ? আমি ছেলেটাকে ব্লক করে দেব। খুশি?”
আমি বললাম, “করতে হবে না। আমারই ভুল। আমি সারারাত ধরে ভেবেছি। জ্যোতি বসুর পরে আমার এই রাগটাই দ্বিতীয় ঐতিহাসিক ভুল। মাইরি বলছি, আর হবে না।”
আত্রেয়ী হেসে ফেলে বলল, “ঠিক আছে। অসভ্য ছেলে। তোমার জন্য সারারাত ঘুম হল না আমার।”
আমি বললাম, “আমারও তো হয়নি। চলো তোমার ঘরে গিয়ে ঘুমাই।”
আত্রেয়ী চোখ বড়ো করে বলল, “কী শুরু করেছ? বাবা আছে দেখোনি?”
আমি জিভ কেটে বললাম, “ঠিক ঠিক। আসলে আবেগ কন্ট্রোল করতে পারছি না আর কী।”
আত্রেয়ী বলল, “সোফায় বসো। আমি চা করছি।”
আত্রেয়ীর বাবা এসে বললেন, “লুচি ভাজতে বলে দিস মা। ছেলেটা এত সকালে এসেছে, আমাদের বাড়ির স্পেশাল লুচি ছোলার ডাল খেয়ে যাক।”
আমি ক্যাবলার মতো হাসলাম।
৩৩ অনিরুদ্ধ
ঋতুজা কোনও মেসেজ করছে না চব্বিশ ঘণ্টা হয়ে গেল।
আমার মাথা কাজ করছে না। ঋতুজা মেসেজ না করলে আমার মাথা কাজ করে না।
মেসেজ করি রোজই। কিন্তু এবারে প্রথমে দেখলাম হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজগুলো সিন হচ্ছে না। আমার সঙ্গে কথা বলতে বলতেই ফোনটা কেটে গেছিল। প্রতি রাতেই ও বলে, তোমার মাথায় বিলি কেটে দিচ্ছি, তুমি ঘুমিয়ে পড়ো। আমার মাথার ঘন চুল ওর নাকি ভীষণ পছন্দ। যেদিন ওর বাড়ি গেছিলাম, আমার মাথায় অনেকক্ষণ বিলি কেটে দিয়েছিল। এরপর থেকে রাতে ফোন করলে বলবে, তোমার মাথায় বিলি কেটে দিচ্ছি।
এবারে ফোন কেটে যাবার পর আর কিছুতেই কানেক্ট করতে পারছি না। পাহাড়ে গেছে, নেটওয়ার্ক ট্রাবল হতে পারে ভেবে প্রথমে চেষ্টা করিনি, পরে অধৈর্য হয়ে গেলাম। আমার সঙ্গে কথা না বলে এতক্ষণ থাকার মেয়ে তো ঋতুজা নয়।
ওর বাড়ির ল্যান্ডলাইন নাম্বার আমার কাছে ছিল। সকাল হতেই সেখানে ফোন করলাম। ওর বাবা ধরলেন। গম্ভীর গলায় বললেন, “হ্যালো।”
আমাকে চেনেন ওর বাবা। আমি বললাম, “কাকাবাবু, আমি অনিরুদ্ধ বলছি, ঋতুজা আছে?”
ওপাশ থেকে গম্ভীর গলায় জবাব এল, “না, ও দার্জিলিং গেছে তো। তা ছাড়া ও এখানে থাকেও না এখন।”
আমি বললাম, “জানি তো। আচ্ছা, ওর হাজব্যান্ডের নাম্বারটা দেওয়া যাবে, একটু আর্জেন্ট ছিল আর কি।”
ওর বাবা বললেন, “আমার কাছে নেই। বিকেলের দিকে ফোন কোরো। যদি পাওয়া যায়, আমি তোমায় দিয়ে দেব।”
