আমি বললাম, “সিম্পলের দরকার নেই। তুমি আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দিয়ো।”
বউ জানলার দিকে মুখ ফেরাল, “তাহলে এত প্যাচাল পাড়ছিলে কেন?”
আমি বললাম, “তুমি ঝগড়া করতে চাইছ নাকি? ঝগড়া কোরো না দয়া করে। ঘুরতে এসেছ, ঘোরো। কিন্তু তোমার বানিয়ে দেওয়া ফরমুলা অনুযায়ী আমি চলব, এটা ভুলেও ভেবো না।”
বউ আর কিছু বলল না। চোখ বন্ধ করল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ঘুমিয়েও পড়ল।
আমি এবার সত্যি অবাক হলাম। এত তাড়াতাড়ি কেউ ঘুমাতে পারে কী করে?
তিস্তার কাছে এসে পড়েছিলাম। এত সুন্দর প্রকৃতি সত্ত্বেও মনটা খিঁচড়ে গেল সকাল সকাল।
কিছু কিছু মানুষের জীবন তারা না চাইতেও এত জটিল হয়ে যায় কী করে?
৩১ কপালকুণ্ডলা
বাবা মা দুজনেই আমার ওপর বেজায় খচে আছে। সাঁপুইরাও বলে গেছে এরকম মেয়ের জীবনেও বিয়ে হবে না। আমি তাতে খুশি হয়েছি বটে কিন্তু রেগেও যে যাইনি এমন না।
বাইরের লোক এসে আমার সম্পর্কে জ্ঞান দেবে এত সাহস পাবে কেন? বাবা কেন তাদের কিছু বলবে না? কই আমাকে যদি কোনও বাইরের লোক আমার বাবা মার সম্পর্কে কিছু বলে আমি তো তাকে ছেড়ে কথা বলব না। কপালে দুঃখ হয়ে যাবে তার। পাগলের মতো দৌড় করাব।
অবশ্য সদুজ্যাঠার কথা আলাদা। তবে সদুজ্যাঠা তো আর বাইরের লোক না। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও কোনও কোনও সম্পর্ক রক্তের সম্পর্কের থেকেও বেশি কিছু হয়। সদুজ্যাঠার সঙ্গে আমার সেই সম্পর্ক।
আমার নবকুমারের সম্পর্কে তো কিছুই জানতে পারতাম না সদুজ্যাঠা না থাকলে।
সদুজ্যাঠাই একদিন বিকেলে নবকুমারের টেবিলের সামনে গিয়ে বসল। নবকুমার তখন শিঙাড়ায় কামড় দিয়েছে। সদুজ্যাঠা একটা স্যান্ডো আর নীল চেক কালারের লুঙ্গি পরা অবস্থায় ছিল। ভুঁড়িটা এত বড়ো যে স্যান্ডো সেটাকে পুরোপুরি ঢাকতে পারে না। চকচকে মোটা কালো ভুঁড়ি বেরিয়ে থাকে। সদু জ্যাঠাকে বসতে দেখে নবকুমার শিঙাড়াটা কামড়ানো অবস্থাতেই অবাক হয়ে বড়ো বড়ো চোখ করে সদুজ্যাঠার দিকে তাকাল।
মাইরি বলছি, সেই সময়টায় নবকুমারকে এত মিষ্টি লাগছিল না, যে, আমার মনে হচ্ছিল ব্যাটার দুই গালে চকাস চকাস করে চুমু খেয়ে নি।
সদুজ্যাঠা বলল, “আপনি এ পাড়ায় নতুন। দেখছি কদিন ধরেই। তা কেমন লাগছে?”
নবকুমার শিঙাড়াটা নামিয়ে রেখে বলল, “ভালো লাগছে। শান্ত পাড়া। ভালো তো।”
সদুজ্যাঠা বলল, “বাড়ি কোথায়?”
নবকুমার আমার দিকে একবার তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নিল। আমি ক্যাশে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।
সে বলল, “মুর্শিদাবাদে।”
সদুজ্যাঠা বলল, “বাহ, নবাবদের জায়গা। তা কী করা হয়?”
আমার হাসি পাচ্ছিল। সদুজ্যাঠা কীরকম সিবিআইয়ের মতো জেরা শুরু করেছে।
নবকুমার অবশ্য বেশ ভদ্রলোক। সদুজ্যাঠার প্রশ্ন শুনে জবাব দিল, “এই তো, এই লোকাল কলেজে ক্লার্কের কাজ পেয়েছি।”
সদুজ্যাঠা বলল, “বেশ। বাড়িতে কে কে আছে?”
নবকুমার বলল, “বাবা মা।”
সদুজ্যাঠা বলল, “ও। এক ছেলে? তা প্রেম করো?”
নবকুমার সদুজ্যাঠার কথায় ঘাবড়ে গিয়ে বিষম খেয়ে বলল, “না না, সে কী! ওসব করার সময় কোথায়?”
সদুজ্যাঠা আমার দিকে তাকিয়ে একবার হেসেই গম্ভীর হয়ে নবকুমারের দিকে তাকিয়ে বলল, “ভালো ভালো। রসমালাই খাবে? আমি বানিয়েছি আজ। স্পেশাল।”
নবকুমার আবার ক্যাবলা চোখে তাকাল।
সদুজ্যাঠা বলল, “খাও খাও। টাকা দিতে হবে না। আমি বানিয়েছি। এই কেতো, এখানে একটা ভাঁড় দিয়ে যা তো। খেয়ে দ্যাখো, এসব জিনিস সবাই পারে না।”
কার্ত্তিক একটা রসমালাইয়ের ভাঁড় দিয়ে গেল। নবকুমার ভালো মানুষের মতো সে ভাঁড়টা শেষ করে হেসে বলল, “খুব ভালো হয়েছে। সত্যিই আপনার রান্নার হাত ভীষণ ভালো।”
সদুজ্যাঠা বলল, “রান্নার হাত না। মিষ্টির হাত। রান্নার হাত ওর ভালো।”
সদুজ্যাঠা আঙুল তুলে আমার দিকে দেখাল।
নবকুমার আমার দিকে তাকিয়েই জোরে জোরে কাশতে শুরু করল।
সদুজ্যাঠা জলের গ্লাস নবকুমারের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “যা চিংড়ি মাছের মালাইকারি করবে না, ভাবতে পারবে না। অসাধারণ হাত। অবশ্য চিংড়ি মাছের মালাইকারি করলেই যে মোচার ঘণ্ট করতে পারবে না, এমন তো নয়। সেও আমাদের মেয়ে অসাধারণ রান্না করে। আর খাসির মাংসের তো তুলনাই হয় না। ওরে ও কপাল, কী যেন হাঁড়িতে করিস অল্প আঁচে একটু একটু করে, কী নাম যেন?”
আমার সদুজ্যাঠার ওপর এমন রাগ হল না! ঈশ, এভাবে কেউ বলে? যদি বুঝে ফেলে? আমি রাগি গলায় বললাম, “আমি জানি না। আর আমি রাঁধতেও পারি না। কেন অকারণ বাড়িয়ে বলো?”
নবকুমার কেমন ভয় পেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “আমি চলি, হ্যাঁ?”
বলে ক্যাশে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট এগিয়ে দিয়ে চেঞ্জ না নিয়েই দৌড় মারল। সদুজ্যাঠা হাসতে লাগল।
আমি রাগি গলায় বললাম, “এটা কী হল?”
সদুজ্যাঠা বলল, “তোর লাইন ক্লিয়ার করলাম। এবার তো তোকে নিয়ে ভাববে রে পাগলি।”
আমি বললাম, “তোমায় মিথ্যে করে বলতে কে বলেছিল? আমি ভালো রাঁধি?”
সদুজ্যাঠা বলল, “আমি শিখিয়ে দেব তো। রাঁধা তো আর্ট রে! যত শিখবি, যত মনের মানুষকে রেঁধে খাওয়াবি, দেখবি তত ভালো লাগছে।”
আমি কপট রাগ দেখিয়ে বললাম, “তুমি হেবি খারাপ। আমাকে চমকে দিলে।”
সদুজ্যাঠা দাঁত বের করে হাসতে লাগল।
৩২ অমৃত
সারারাত ঘুমাতে পারিনি।
