বউদি ঘুম ভাঙাল সকাল নটা নাগাদ। দরজা ধাক্কাচ্ছিল।
ঘুমচোখে উঠে দরজা খুললাম। বউদি বলল, “এই তুমি অফিস যাবে না?”
আমি বললাম, “হ্যাঁ। যাচ্ছি, রেডি হচ্ছি।”
বউদি বলল, “কী ব্যাপার? তোমার মুখ চোখ বসে আছে কেন? কী হয়েছে?”
আমি গামছা নিয়ে বাথরুমে যেতে যেতে বললাম, “কিছু হয়নি। চিন্তা কোরো না।”
স্নান সেরে জামাকাপড় পরে খাবার টেবিলে গিয়ে দেখলাম বাবা বসে আছে।
আমাকে দেখে বলল, “কী রে, ওদের বাড়িতে কী পরে যাবি কিছু ঠিক করলি?”
আমি গম্ভীর গলায় বললাম, “একটু প্ল্যান চেঞ্জ হয়েছে বাবা। এই মুহূর্তে দেখা করাটা পিছোবে কদিন।”
বাবা অবাক গলায় বলল, “মানে?”
আমি বললাম, “মানে কিছু না। ওরা থাকবে না। কে একজন মারা যাবে, দিল্লি যাবে বলছিল।”
মিথ্যা করেই বললাম কথাটা।
বাবা বলল, “কী আশ্চর্য! আগে বলবি তো! দে ফোনটা দে, ওর বাবাকে ফোন করি।”
আমি বললাম, “ধুস, ওরা এখন খুব ব্যস্ত। তুমি এসব নিয়ে চিন্তা কোরো না।”
বাবা আমার চোখের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বলল, “কী হয়েছে? ঝামেলা?”
আমি ভাতে ডাল মেখে ব্যস্ত হয়ে খাওয়া শুরু করে বললাম, “কী যে বলো!”
বাবা চুপ করে বসে থেকে বলল, “ঠিক আছে। তবে আমি তোকে যতদূর চিনি, তুই তুমুল ঝগড়া চালাচ্ছিস এখন। ভুল বললাম?”
আমি বাবার দিকে তাকিয়ে বললাম, “না। তুমি সবই ঠিক বলো। আমাকে খেতে দাও প্লিজ।”
বাবা আর কিছু বলল না। চুপ করে খেতে লাগল।
৩০ জীমূতবাহন
হোম স্টে ছেড়ে আমরা রওনা দিলাম যখন তখন সকাল সাড়ে দশটা বাজে। ড্রাইভার জিজ্ঞেস করেছিল কোন দিকে যাব।
বউ বলে দিল রাবংলার দিকে কোনও হোম স্টেতে নিয়ে যেতে।
ড্রাইভার আর কোনও প্রশ্ন করল না। গাড়ি স্টার্ট দিল।
আগের দিন যে এত বৃষ্টি হয়েছে এখন কিছুই বোঝা সম্ভব না। একদম ঝকঝকে আকাশ। হালকা মেঘ থাকলেও তার থেকে বৃষ্টি হবার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। অবশ্য পাহাড়ের আবহাওয়া বোঝা সম্ভব নয় কারও পক্ষে। আবার কখন মেঘ জড়ো হয়ে বৃষ্টি নামবে কেউ জানে না।
বউ জানলার বাইরে মুখ করে বসে ছিল। বলল, “আমার কোনও জায়গা ছেড়ে আসতে মায়া লাগে। এই যে এই হোম স্টেতে ছিলাম, দু রাত। তাতেও মন খারাপ হয়ে গেল।”
আমি বললাম, “ভালো তো। মায়া থাকা ভালো। আমায় মায়া না করে ডিভোর্সটা দিয়ে দিয়ো, তাহলেই হবে।”
বউ বলল, “দেব। চিন্তা করছ কেন? তোমার কপালে আমার মতো বউ জোটা ডিজাস্টার। ভাবাই যায় না। তোমার জন্য কেমন মেয়ে চাই বলো তো?”
আমি বললাম, “কী রকম?”
বউ বলল, “একদম চার ফুট দশ ইঞ্চি হাইট। টুকটুকে ফরসা। মাথা ভর্তি ঘোমটা থাকবে। চোখ সব সময় পায়ের দিকে থাকবে। সম্মান ছাড়া কথাই বলবে না। বাংলা সিরিয়ালের আদর্শ গৃহবধূ টাইপ আর কি।”
আমি বললাম, “আমার বিয়ে করার কোনও ইচ্ছা নেই আর।”
বউ বলল, “তাই নাকি? ওরম মনে হয়। ডিভোর্স পেলেই তুমি ড্যাং ড্যাং করে বিয়ে করতে ছুটবে।”
আমি বললাম, “কেন? এ কথা তোমার মনে হল কেন?”
বউ বলল, “কারণ সব মানুষই বিয়ে করতে চায়। একটা সম্পর্কে জড়াতে চায়। একা থাকতে চাওয়া মানুষেরাও শেষমেশ বিয়ে করেই ফেলে। ব্যতিক্রমী মানুষ যে নেই তা নয়, কিন্তু তার পারসেন্টেজ কম। আর তুমি তো পিওর ম্যারেজ মেটিরিয়াল টাইপ। ভালো হাজব্যান্ড হবে তুমি।”
আমি বললাম, “ও। জেনে খুশি হলাম।”
বউ বলল, “আমি নর্থ পোল হলে তুমি মঙ্গল গ্রহের সাউথ পোল। তোমার সঙ্গে আমার কোনও মিলই নেই।”
আমি বললাম, “তা ঠিক। তুমি মডার্ন মানুষ। বিবাহিত পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখাকে তোমার খারাপ বলে মনে হয় না। ভালো কিন্তু।”
বউ বলল, “খারাপ কেন? মানে সব সম্পর্কই যে সমাজের ডিফাইন করা পথ মেনে হতে হবে এটা কোথায় লেখা আছে? কিছু কিছু সম্পর্ক তো সিলেবাসের বাইরেও হতে পারে।”
আমি বললাম, “একশো বার হতে পারে। আমার তা নিয়ে কোনও বক্তব্য নেই। কিন্তু সেই সম্পর্ককে লালন পালন করতে গিয়ে যখন অন্য মানুষের জীবনে প্রভাব পড়ে, তখন সমস্যা দেখা দিতে পারে। তোমার প্রেমিকের বউ কোনও দোষ করেনি। আমিও কোনও দোষ করিনি। আমাদের দুজনের জীবন জড়ানোর কি কোনও প্রয়োজন ছিল? মেয়েটি জানলে মারাত্মক কষ্ট পাবে।”
বউ জানলার বাইরে থেকে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি কি আমার গিলটি ফিলিংস জাগানোর কোনও চেষ্টা করছ?”
আমি বললাম, “তা কেন? কথাই আছে পরের ছেলে পরমানন্দ, যত গোল্লায় যাবে তত আনন্দ। তুমি গোল্লায় যাও না, আমার কী দরকার তোমার মধ্যে গিলটি ফিলিংস জাগিয়ে? সমস্যা হল, আমি যে বিয়ে করেছি আমার বাড়ির লোক থেকে শুরু করে পাড়ার লোক সবাই জানে। ডিভোর্সের পরে বিভিন্ন জায়গায় কথা হবে। সেটা আমার ক্ষেত্রে কোনও সমস্যা না করলেও আমার বাবা মার সমস্যা হতেই পারে, তাই না?”
বউ বলল, “তাহলে ডিভোর্স কোরো না। নিজের মতো করে একটা মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক করে ফেলো। মিটে গেল।”
আমি হেসে ফেললাম, “সব কিছু খুব সোজা ভাবো তুমি, তাই না? পৃথিবীটা এতই সোজা?”
বউ বলল, “আমরাই তো কঠিন করে ফেলি। ভেবে নিতে চাইলে বানিয়েও নিতে পারবে। কী হয়? তুমি থাকবে তোমার মতো, আমি আমার মতো। রাতে এক ঘরে থাকব। সম্পর্ক দুজনের আলাদা হবে। সবাই জানবে আমরা হ্যাপিলি ম্যারেড কাপল। সিম্পল।”
