এভাবে বিয়ে হয়ে হানিমুনে এসে বউয়ের মুখে এসব কথা আমার প্রেম জিনিসটা থেকেই অনেকটা ভক্তি তুলে দিয়েছিল।
রাতে সুন্দর রান্না হয়েছিল। পেট ভরে খাওয়া হয়ে গেছিল। বাইরে বৃষ্টি কমেনি। বৃষ্টির শব্দে একটা চমৎকার ঘুম হয়। এসব ঘুমকে ক্ল্যাসিকাল মিউজিকের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। যেন কোনও ওস্তাদের আলাপ।
বউ হোম স্টের মহিলার ঘরে গিয়ে বকবক করছিল। আমি ওর জন্য অপেক্ষা করলাম না। কম্বলে সেঁধিয়ে চোখ বন্ধ করতেই ঘুম চলে এল। আকাশ পাতাল কাঁপানো ঘুম। পাহাড়ে যে এত ভালো ঘুম আসে জানতাম না। মনে হয় নাকও ডাকতে শুরু করেছিলাম।
ঘুমটা ভাঙল মাঝরাত নাগাদ। মনে হচ্ছিল কোনও আর্তনাদ শুনছি। ঘুম ভাঙলেও চোখ খুললাম না। তবে বুঝলাম বউ কাতরাচ্ছে, বলছে, “পাবলোদা, শোন না, আমায় ছেড়ে যাস না প্লিজ। শোন না পাবলোদা, আমায় সবাই খারাপ মেয়ে বলবে। তুই পারবি আমায় ছেড়ে থাকতে? আমায় বাঁচা পাবলোদা, শোন না, প্লিজ যাস না, এই পাবলোদা।” চোখ খুললাম। আলো জ্বাললাম।
বউ ছটফট করছে। আমি ডাকলাম, “এই, এই।”
শুনল না।
নিরুপায় হয়ে ওর হাত ধরে নাড়া দিলাম। বউ ধড়মড় করে উঠে বসল।
আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম, “কী হল?”
বউ অবাক গলায় বলল, “কী হল? কী হয়েছে?”
আমি বললাম, “পাবলোদা কে? সেই দাদা?”
বউয়ের ঠোঁট দিয়ে কেমন লালা টাইপের পড়ছিল। ও হাতের চেটো দিয়ে সে লালাটা মুছে বলল, “হ্যাঁ। সেই দাদা। মাঝে মাঝে এই দুঃস্বপ্ন দেখি। সব ফিরে আসে।”
আমি বললাম, “ঘুমাও। একবার ঘুম ভেঙে গেছে তো। আর সেসব আসবে না।”
বউ ক্লান্ত ভঙ্গিতে শুল।
আমি বললাম, “আলো জ্বালানো থাকবে?”
বউ বলল, “থাকুক।”
আমি বললাম, “এসব দুঃস্বপ্ন দ্যাখো যে, কোনও মনোবিদকে দেখিয়েছ কোনও দিন?”
বউ বলল, “না।”
কেমন কুঁকড়ে শুল। আমি বললাম, “কী হল?”
বউ বলল, “ঠান্ডা লাগছে।”
আমি বিয়ের প্রথম রাতের দোর্দণ্ডপ্রতাপ মেয়েটার সঙ্গে এই মেয়েটাকে মেলাতে পারছিলাম না। বললাম, “আর-একটা কম্বল দেব?”
বউ বলল, “দাও।”
আমি আর-একটা কম্বল ওর গায়ে জড়িয়ে দিলাম। বউ বলল, “তুমি ঘুমাও। আমার মনে হয় আর ঘুম আসবে না।”
আমি বললাম, “ঠিক আছে। জেগে আছি আমি। তুমি শোও।”
ওইরকম কুঁকড়ে শুয়ে বড়ো বড়ো চোখ করে দেওয়ালের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল। কিছুক্ষণ পরে ঘুমিয়ে পড়ল।
ঘুমের ঘোরে মাঝে মাঝেই শিউরে উঠছিল।
আমি চুপ করে বসে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম।
সারারাত।
২৯ অমৃত
ঝড় আসার আগে কিছুই বোঝা যায় না কখন ঝড় আসে, কীভাবে আসে। কিন্তু যখন আসে, তখন সব কিছু ওলটপালট করে দিয়ে চলে যায়।
কারও সঙ্গে অনেকটা মেলামেশা, প্রচুর ভালোবাসার পরেও সে মানুষটাকে চেনা অত সহজ না।
আত্রেয়ীর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা যে হঠাৎ করে এরকম একটা জায়গায় চলে আসতে পারে, আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। অথচ সবই তো ঠিক ছিল। ওদের বাড়ি গেলাম, ক্যাবলামি করে চলে এলাম। আমার বাড়ির লোকজনও জেনে গেল, তারপরে হঠাৎ করে এভাবে আমাকে সব জায়গা থেকে ও ব্লক করে দেবে? কী এমন ভুল কথা বলেছিলাম আমি?
আমার রাগটা ঝড়ের মতো আসে, ঝড়ের মতো যায়। যখন ছিল, আমি আত্রেয়ীকে একবারও ফোন করার চেষ্টা করিনি। নিজে বসে বসে গোঁ গোঁ করেছি।
একটু রাতের দিকে যখন রাগ কমল, আত্রেয়ীকে ফোন করলাম। ফোন সুইচড অফ। আমি ওকে একটা মেইল করে লিখলাম, “একটা ফালতু ছেলের জন্য তুমি আমার উপর রাগ করছ?”
মেইল করে পায়চারি করছি। রাত আড়াইটা বাজে প্রায়।
কোনও উত্তর না আসায় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম ভাঙতে দেখলাম আত্রেয়ী মেইলের রিপ্লাই করেছে।
“তোমাকে আমি পর ভাবিনি। পর ভাবিনি বলেই হয়তো আমি তোমাকে এভাবে গ্রহণ করেছিলাম, যেভাবে আর কাউকেও কোনও দিন গ্রহণ করার কথা স্বপ্নেও ভাবিনি। সোশ্যাল মিডিয়া আর মানুষের জীবনে তো আকাশ পাতাল পার্থক্য থাকে অমৃত। আমার উপর কোনও ছেলের দুর্বলতা থাকতেই পারে, কথা হল, আমার কি আছে? আর মজা করতে পারব না? এরপর কি নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্যও তোমার অনুমতি নিতে হবে বলো তো? মেয়ে মাত্রই ক্রীতদাসী ভাবলে কেন তুমি আমাকে? কেন ভেবে নিলে সার্কাসের বাঘের মতো বেত দেখানো মাত্রই তুমি যেভাবে বলবে সেভাবে আমাকে হাঁটাচলা করতে হবে? কেন আমাকে একটা আলাদা মানুষ ভাবতে পারবে না? আমার একটা পৃথক সত্তা থাকতে পারবে না? কাউকে ভালোবাসলে তাকে বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করতে নেই? পজেসিভনেস আর সন্দেহের মধ্যে মনে হয় কিছু হলেও তফাত থাকে। সেটা বোঝার মতো বুদ্ধি আশা করি তোমার আছে। তুমি ভেবে দেখো, আমি কিন্তু এরকমই। এগোতে চাইলে ভেবে এগিয়ো। আমাকে নিয়ন্ত্রণ করার কথা যদি ভেবে থাকো, তাহলে এখানেই থেমে যেয়ো। তোমার আদরগুলো আমার মনে থাকবে। কিন্তু আমার নিজের স্বাধীনতা যদি কোথাও গিয়ে আটকায়, তাহলে সে সব কিছুকেই স্মৃতিতে রূপান্তরিত করতে আমি দ্বিতীয়বারও ভাবব না। আমার বাবা আমাকে একজন ইন্ডিপেন্ডেন্ট সেলফ ডিপেন্ডেন্ট মেয়ে ভাবার শিক্ষা দিয়ে গেছেন। আমি সেভাবেই চলব। ভালো থেকো। আত্রেয়ী।”
মেইলটা বেশ কয়েকবার পড়লাম। কী করব, বুঝতে পারলাম না।
ফেসবুকের পোস্টটার স্ক্রিনশট নিয়ে রেখেছিলাম। ছেলেটার কমেন্টে আত্রেয়ীর উত্তরগুলো দেখছিলাম। একে স্বাধীনতা বলতে হবে? বেশ কিছুক্ষণ সেগুলোর দিকে তাকিয়ে ফোনটা অফ করে ঘুমিয়ে পড়লাম।
