কী মনে হতে আমি ওর ফেসবুক প্রোফাইল খুললাম মোবাইল থেকে। দেখলাম সকালে একটা প্রোফাইল পিকচার দিয়েছিল। তাতে একটা ছেলে ভীষণ ফ্লার্ট করেছে। অবাক করার মতো ব্যাপার, আত্রেয়ী সে কথার উত্তরও দিয়েছে। কী মনে হতে ছেলেটার প্রোফাইল খুললাম। মাঝে মাঝেই ডুয়াল মিনিং স্ট্যাটাস আছে। আর তার প্রত্যেকটাতেই আত্রেয়ী কমেন্ট করেছে। ছেলেটা সে কমেন্টের রিপ্লাই করেছে ফ্লার্ট করে। ওকে মিন করেই যে কথাগুলো লেখা সেগুলো বুঝতে পেরেও আত্রেয়ী প্রতিটা কথার উত্তর দিয়ে গেছে।
মাথায় কোত্থেকে একটা অসহ্য রাগ এসে চেপে বসল।
বউদি চা এনে দিয়ে বসে বলল, “কই গো, তাহলে যাবে তো ওদের বাড়িতে?”
আমি অন্যমনস্ক হয়ে বলল, “হুঁ।”
বউদি বলল, “কী হুঁ? যাবে না?”
আমি বললাম, “যাব।”
বউদি কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “কী হয়েছে ঠাকুরপো? মেজাজ খারাপ?”
আমি এড়ানোর চেষ্টা করলাম, “না, এই অফিসে একটু চাপ যাচ্ছে আর কি! আমি একটু পরে কথা বলি বউদি?”
বউদি চুপ করে আরও কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার এই মুখটা অফিসের কাজের ব্যাপারে কিছু না। যাই হোক, আমাকে বলতে চাইলে বলতে পারতে। আমি এলাম।”
বউদি উঠে বেরোল।
আমি গুম হয়ে বসে রইলাম। তারপর মোবাইলটা বের করে প্রতিটা কমেন্টের স্ক্রিনশট নিয়ে আত্রেয়ীকে হোয়াটসঅ্যাপ করলাম।
ফোন করলাম আবার।
ফোন রিং হয়ে গেল।
বিরক্ত হয়ে ঘরের মধ্যে পায়চারি শুরু করলাম।
মিনিট কুড়ি পরে আত্রেয়ী ফোন করল আমায়। আমি তৈরি হয়েই ছিলাম, ধরলাম, “হ্যালো।”
“হ্যাঁ বলো। স্নান করছিলাম। কী হয়েছে?”
আমি বললাম, “হোয়াটসঅ্যাপ চেক করো। তারপর ফোন করো।”
আত্রেয়ী হেসে বলল, “আরে বলো না।”
আমি থমথমে গলায় বললাম, “না, আগে চেক করো। তারপর ফোন করো।”
ফোনটা কেটে দিলাম।
কয়েক মিনিট পরে আত্রেয়ী আমাকে ফোন করে বলল, “দেখলাম।”
আমি বললাম, “কে ছেলেটা?”
আত্রেয়ী বলল, “বন্ধু।”
আমি বললাম, “কেমন বন্ধু?”
আত্রেয়ী বলল, “এমনি, স্পেশাল কিছু না। ফেসবুকেই এক বান্ধবীর মাধ্যমে আলাপ। ওর কথাগুলোই এরকম।”
আমি বললাম, “এরকম মানে? শুয়োরটার এত সাহস হয় কী করে এভাবে কথা বলার?”
আত্রেয়ী একটু থমকে বলল, “আচ্ছা, আমি বলে দেব এরকমভাবে কথা না বলতে।”
আমি বললাম, “তুমিই বা রাস্তার মেয়ের মতো ওর কথার উত্তর দিচ্ছিলে কেন ওভাবে? কে হয় তোমার ও?”
আত্রেয়ী এবার রাগল, “এসব কী বলছ তুমি? রাস্তার মেয়ে মানে?”
আমার সুর চড়ল, “রাস্তার মেয়ে ছাড়া কী? ওই জানোয়ারটার এত সাহস হবে কীভাবে তোমাকে এভাবে কথা বলবে? আমার সামনে থাকলে তো ওকে আমি খুন করে পুঁতে দিতাম জাস্ট।”
আত্রেয়ী হেসে ফেলল, “আচ্ছা তাই দিয়ো।”
আমার রাগ কমল না, বরং বাড়ল, “শোনো।”
আত্রেয়ী বলল, “বলো।”
আমি বললাম, “ওকে ব্লক করো। এখনই।”
আত্রেয়ী অবাক গলায় বলল, “মানে?”
আমি বললাম, “যা বলছি তাই করো। এখনই শুয়োরটাকে ব্লক করো।”
আত্রেয়ী কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল, “না করলে?”
আমি বললাম, “না করলে সম্পর্কটা এখানেই শেষ করো।”
আত্রেয়ী আবার চুপ করে থেকে বলল, “একটা বাইরের ছেলের জন্য এত বড়ো সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলে?”
আমি রাগি গলায় বললাম, “নিলাম। তুমি ওকে ব্লক করবে না করবে না?”
আত্রেয়ী বলল, “তুমি আমাকে বিশ্বাস করো না?”
আমি বললাম, “বিশ্বাস অবিশ্বাসের প্রশ্ন আসছে না তো এখানে। যে তোমার সঙ্গে এভাবে ওপেন ফ্লার্ট করে, সে তোমার ফ্রেন্ড লিস্টে থাকবে না, ব্যস।”
আত্রেয়ী বলল, “তুমি বুঝতে পারছ তুমি এবার অকারণ জোর খাটাচ্ছ?”
আমি বললাম, “হ্যাঁ বুঝতে পারছি। দশ মিনিট সময় দিলাম। হয় ছেলেটা থাকবে, নয় আমি থাকব।”
ফোনটা কেটে দিলাম। আমার হার্টবিট বেড়ে যাচ্ছিল।
কয়েক মিনিট পরে ফেসবুক খুলে দেখলাম আত্রেয়ী অ্যাকাউন্ট ডিঅ্যাক্টিভেট করে দিয়েছে।
২৮ জীমূতবাহন
আমার এক বন্ধু ছিল পিন্টু। পিন্টু চিরকাল চেষ্টা করে গেল একটা ভালো মেয়ে তোলার। পিন্টু আমার থেকে দু বছরের বড়ো।
আমি যখন নাইনে পড়ি, পিন্টু দেখি একটা লেডিস সাইকেল কিনল।
আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে বলেছিলাম, “ছেলে হয়ে লেডিস সাইকেল কিনলি কেন?”
পিন্টু ভারী চালিয়াতের মতো বলেছিল, “যে মেয়েটা আমাকে পছন্দ করবে, তাকে আমি এই সাইকেলটা চালাতে দেব।”
ক্লাস টুয়েলভ নাগাদ পিন্টু আমাদের সবাইকে চমকে দিয়ে দারুণ সুন্দরী একজন প্রেমিকা জোগাড় করল। সত্যিই সে মেয়েটা সাইকেলটা চালাত।
পিন্টু জীবন লাগিয়ে দিয়েছিল প্রেমের পিছনে। এইচ এস কোনও মতে টপকে পাস কোর্সে বিএ করল।
পিন্টু যখন সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে, মেয়েটা তখন এইচ এস। মেয়েটার বাপ সম্বন্ধ নিয়ে এল।
পিন্টুকে কিছু না জানিয়েই মেয়েটা বিয়েতে রাজি হয়ে গেল।
পিন্টু আমাদের কাছে এসে খুব কাঁদল। তারপর ওর মা ওর বউয়ের জন্য যা যা গয়না রেখেছিল, আলমারির চাবি জোগাড় করে সব গয়না একটা প্যাকেটে জড়ো করে মেয়েটাকে বিয়েতে দিয়ে একটা লরির তলায় বডি দিয়ে দিল।
পিন্টুর মা এখনও কাঁদেন, কেন গয়নাগুলো লকারে না রেখে আলমারিতে রেখেছিলেন। আমরা বুঝি না, দুঃখটা ছেলের জন্য বেশি, না গয়নার জন্য।
তবে মরাল অফ দ্য স্টোরি হল, এই ঘটনার পর আমাদের পাড়ার ছেলেদের মধ্যে প্রেমের প্রতি একটা ভাটা এসে গেল। সবথেকে বেশি বোধহয় আমার উপরেই এসেছিল। এই কারণটার জন্যই কোথাও গেলে মেয়ে-টেয়ে দেখতাম না বেশি। গুটিয়ে যেতাম।
