আমি বললাম, “ধুস! তোমার কি মাথা খারাপ?”
বউ বলল, “অনিরুদ্ধকে পরিয়ে দিয়েছিলাম তো আমি। মজা করে। আবার রিমুভার দিয়ে রংটা মুছেও দিয়েছিলাম। এসো না, ভালো লাগবে দেখো।”
আমার যেটুকু ইচ্ছা হয়েছিল, অনিরুদ্ধর নামটা শুনে সব ইচ্ছা মেঘ হয়ে জানলা দিয়ে বেরিয়ে গেল।
আমি খাটে পাশ ফিরে শুয়ে বললাম, “ওসবে আমার কোনও রুচি নেই। তুমি যা ইচ্ছা করো।”
বউ বলল, “অনিরুদ্ধর নাম শুনে ফাটল? কী কী করেছি শুনলে তো আরও ফাটবে তোমার।”
আমি বললাম, “আমি শুনে কী করব তুমি কী কী করেছিলে? দুদিন পরে আমাকে ডিভোর্স দেবে, তুমি তোমার মতো যার সঙ্গে খুশি থাকবে, আমি আমার মতো যার সঙ্গে খুশি থাকব। এর বাইরে আমার কিছু জানার প্রয়োজন নেই।”
বউ বলল, “বললে বুঝি ফোনটার মতো আমাকেও দেওয়ালে ছুড়ে মারবে? হেবি রাগ তোমার কিন্তু। আচ্ছা, এত রাগ কী করে হয়? কোনও স্পেশাল প্র্যাকটিস করতে হয়? আমার জানো তো, সেভাবে রাগ হয় না। কেউ কিছু বললে আমি শুনতে ভালোবাসি। অনিরুদ্ধ যেদিন বিয়ে করল, সেদিন একটু রাগ হয়েছিল বটে কিন্তু আমি ওকে বুঝতে দিইনি। আসলে তো ও আমাকেই ভালোবাসে, কেন খামোখা রাগ করব বলো?”
আমি বললাম, “তুমি আবার আমাকে ফালতু কথাগুলো বলে যাচ্ছ। তোমাকে আমি বলেছি এসব বাজে উটকো প্যাচাল আমার শোনার কোনও ইচ্ছা নেই। তুমি তোমার মতো করে একটা জীবন ভেবে নিয়েছ, তাতে আমার কোনও জায়গা নেই সেটা তুমিও জানো, আমিও জানি। আমাকে কেন তুমি এসব শোনাতে যাচ্ছ? তোমার পাঁঠা, তুমি যেদিক দিয়ে খুশি কাটবে।”
বউ বলল, “তা তো কাটবই। আমি স্বাধীনচেতা মেয়ে। আমার যেটা ইচ্ছা আমি সেটা করব।”
আমি বললাম, “সেটা কোরো। তবে কী জানো তো, অনেকে স্বাধীনচেতা হতে গিয়ে ভালো মন্দের তফাতটা ভুলে যায়। কোনটা ঠিক, কোনটা বেঠিক, সেটার পার্থক্য করতেও ভুলে যায়। সমস্যা শুরু হবার আগে তারা বুঝতেও পারে না, আসলে সে এতদিন ধরে একটা সমস্যাকেই ডেকে আনছিল।”
বউ নেলপালিশটা মেঝেতে রেখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি প্রচুর জানো, না? খুব জ্ঞানী মনে করো নিজেকে?”
আমি চুপ করলাম। জানলা দিয়ে বৃষ্টির ছাঁট আসছে। তবু জানলাটা বন্ধ করতে ইচ্ছা করল না।
বউ বলল, “দুটো মানুষের মধ্যে সম্পর্ককে ওভাবে বোঝানো যায় না। অনিরুদ্ধ আর আমার ওয়েভলেন্থ ম্যাচ করে। আমাদের চিন্তা ভাবনা সব মিলে যায়। আমরা কথা বলতে পছন্দ করি। তুমি এগুলো বুঝবে না। কটা প্রেম করেছ তুমি? কিছুই তো করোনি। কী করে বুঝবে? সব সময় ভেবে নাও ওয়ান ইজ টু ওয়ান প্রেমই হয়। ভুল ভাবো। প্রেম হতেই পারে দুজনের মধ্যে। তাতে তৃতীয় ব্যক্তি এলেও কোনও ক্ষতি নেই।”
আমি উঠে বসলাম। বললাম, “ঠিক আছে। বেশ করেছ যা করেছ। তুমি আমাকে একটা কথা বলো শুধু, অনিরুদ্ধর বউ পুরো ব্যাপারটা জানে তোমাদের?”
বউ একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চুপ করে বলল, “না।”
আমি বললাম, “তাহলে?”
বউ বলল, “এভরিথিং ইজ ফেয়ার ইন লাভ…”
বউ কথা শেষ করতে পারল না, আমি বললাম, “নিজেকে ওর বউয়ের জায়গায় বসিয়ে দ্যাখো তো! কেমন লাগছে?”
বউ একটু চুপ করে বলল, “ঠিক লাগছে। আমার বর আমার প্রতি সব কর্তব্য করে তো!”
আমি বললাম, “তবু লুকিয়ে অন্য মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। কেন তোমাকে বলে না?”
বউ রেগে গেল, “বেশ করেছে বলে না। তোমার কী তাতে?”
আমি হেসে বললাম, “আমার কিছু না। আমাকে মুক্তি দিয়ো তাড়াতাড়ি। তারপর যা ইচ্ছে করো আমার কিছু যায় আসে না।”
বউ বলল, “দেব তো! শহরে ফিরেই দেব। আমার যেন খেয়েদেয়ে কাজ নেই ওনার সঙ্গে সংসার করতে হবে!”
আমি বললাম, “খেয়েদেয়ে কাজ আমারও নেই। নইলে কি আর তোমার মতো একটা মেয়ে জোটে?”
বউ বসা অবস্থা থেকে লাফিয়ে উঠে বলল, “কী, কী বললে? আমার মতো? কেন, আমি কী করেছি?”
আমি বললাম, “কী করেছ আয়নার সামনে মিনিটখানেক দাঁড়িয়ে নিজেকেই জিজ্ঞেস করো। আমি কেন তোমাকে সিদ্ধান্ত বলতে যাব? নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করো, নিজেই নিজেকে উত্তর দাও। সহজ ব্যাপার তো!”
বউয়ের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
আমার আবার ওর চোখে চোখ পড়ে গেল। কাজলটা কেমন টেনে পরেছে!
চোখ সরাতে পারলাম না। হৃৎস্পন্দন বেড়ে চলল।
এই হৃদযন্ত্রটার কি কোনও কাজ নেই? যেখানে বেশি পারফরমেন্সের দরকার নেই, সেখানেও আমাকে জ্বালাতন করতেই হবে?
২৭ অমৃত
মানুষ এমন একটা প্রাণী যার জীবন সরলরেখায় চলে না। অবশ্য বেশিরভাগ প্রাণীরই তাই। যে ইঁদুরটা সকালে গর্ত থেকে বেরোয়, রাতে সে নিজেও জানে না গর্তে ফিরবে কি না।
জীবন জিনিসটাই আসলে অনিশ্চিত।
আমার যেমন।
যে আত্রেয়ীর সঙ্গে সব কিছু এত মসৃণ চলছিল, যাকে কিনা আমি এত ভালোবাসছিলাম, তার সঙ্গে হঠাৎ করে পশুর মতো আচরণ করতে গেলাম কেন? তাও এমন একটা সামান্য বিষয় নিয়ে, যার কোনও মাথামুন্ডু নেই।
ঘটনাটা শুরুও হয়েছিল হঠাৎ করেই। প্রবল ভালোবাসাবাসির পর আত্রেয়ীকে ওদের বাড়ির গলিতে নামিয়ে দিয়ে আমি যখন বাড়ি ফিরলাম তখন রাত আটটা।
বাবা বাইরের ঘরে টিভি দেখছে। বউদি রান্না বসিয়েছে। দাদা ব্যায়াম করছে।
বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে ফিরে আমি মোবাইলে ফোন করতে গেলাম আত্রেয়ীকে। ফোন রিং হয়ে কেটে গেল।
