বাবা সেটা শুনে কিঞ্চিৎ খচেছে, তবে তারপরে নিজেকে ডিফেন্ড করতে বলেছে বউকে ভালোবাসা পুণ্যের কাজ। অমু যদি বউকে ভালোবাসে তাহলে তো সেটা ভালোই হবে।
দাদা খুক খুক করে হেসেছে।
বউদি প্রথম প্রথম খুব রাগ দেখিয়েছিল। এখন আত্রেয়ীর ছবি দেখেছে। আত্রেয়ীর সঙ্গে একদিন ফোনে কথাও বলেছে।
বাবা আত্রেয়ীর বাবার সঙ্গে ফোনে কথাও বলে ফেলেছে। ঠিক হয়েছে এ হপ্তার শেষে ওদের বাড়ি যাব সবাই মিলে।
সবাই মিলে বাড়ি ভর্তি আচ্ছে দিনের পরিবেশ।
আমার অবশ্য সমস্যা কমেনি।
বরং বেড়েছে। যে আমি কোনও দিন অফিস পালানোর কথা স্বপ্নেও ভাবতাম না, সে আমিই সেকেন্ড হাফ হলেই আত্রেয়ীকে দেখার জন্য পাগল পাগল হয়ে যাচ্ছি। ইনোভেটিভ সব আইডিয়া বের করতে হচ্ছে অফিস থেকে বের হবার জন্য। একদিন আমার পাইলসের ব্যথা বেড়েছে বললাম।
আর-একদিন বললাম, মেজো দাদু অসুস্থ।
নিজের দাদুই নেই তায় আবার মেজো দাদু! কতজনকে যে ভালোবাসার স্বার্থে পৃথিবীতে ইমপোর্ট করতে হচ্ছে তার হিসেব নেই।
সব কিছুর শেষে যখন আত্রেয়ীকে স্কুল থেকে বেরোতে দেখি, আমার দিকে তাকিয়ে ফিক করে ওর ভুবনজয়ী হাসিটা হাসতে দেখি, তখন মনে হয়, এ মেয়েটার জন্য হাসতে হাসতে জীবন দিয়ে দেওয়া যায়।
বাইকের পেছনে বসে যখন মেয়েটা আমার কোমরে হাত দেয়, খুনসুটি করে চিবুকটা কাঁধে ছোঁয়ায়, তখন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়। এই পৃথিবীতে, এত মানুষের মধ্যে এই মেয়েটা আমার। আর আমি ওর। এর থেকে ভালো অনুভূতি বোধহয় আর কিছু হয় না।
অফিস থেকে বেরিয়ে বাইকটা স্ট্যান্ড করে কিছুক্ষণ দাঁড়ানোর পর ওদের স্কুল ছুটি হল। আমাকে দেখে চারদিকে তাকিয়ে রাস্তা পার হয়ে এসে আমার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “তুমি রোজ রোজ এভাবে অফিস পালাচ্ছ, চাকরিটা না থাকলে কী হবে?”
আমি বললাম, “তোমার চাকরি আছে তো, ঠ্যাঙের ওপর ঠ্যাং তুলে খাব।”
আত্রেয়ী আমার পেটে একটা ঘুসি মেরে বলল, “ছাতা খাওয়াব। বউয়ের টাকায় খাবে, লজ্জা লাগবে না?”
আমি বললাম, “অন্যের বউয়ের টাকায় তো খাব না। নিজের বউয়ের টাকায় খাব।”
আত্রেয়ী কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “খুব ইয়ে হয়েছে না? আর বাবার সামনে তো কাপড়েচোপড়ে করে ফেলেছিলে, হুহ।”
আমি বললাম, “চলো, এখনই চলো। তোমাদের বাড়ি যাই। এবার দেখো কত স্মার্টলি কথা বলব।”
আত্রেয়ী বলল, “থাক। হয়েছে। ওই দ্যাখো, বাণীদি কেমন দেখতে দেখতে যাচ্ছেন। কত সিনিয়র উনি। তুমি এবার থেকে দূরে দাঁড়াবে বাইক নিয়ে। লজ্জা লাগে না বুঝি আমার?”
আমি বললাম, “এত লজ্জা রাখো কোথায় তুমি? ব্যাংকে?”
আত্রেয়ী হেসে ফেলল। বলল, “চলো। খিদে পেয়েছে।”
আমি বললাম, “আমারও। বিরিয়ানি খিদে পেয়েছে। খাবে বিরিয়ানি?”
আত্রেয়ী বলল, “বিয়ের পিঁড়িতে দুজনে ভুঁড়ি নিয়ে বসলে ভালো লাগবে দেখতে?”
আমি বললাম, “লাগবে। আমাদের বিরিয়ানি। আমরা বুঝব। চলো।”
আত্রেয়ীকে হেলমেট দিলাম। ওর জন্য নতুন হেলমেট কিনেছি। আত্রেয়ী পিছনে উঠে আমাকে ধরে বসলে বাইক স্টার্ট দিলাম।
আত্রেয়ী টুক করে ওর চিবুকটা আমার কাঁধে রেখেই হেসে ফেলল।
আমি বললাম, “অ্যাক্সিডেন্ট হবে কিন্তু। বাইক চলার সময় চুপ করে বসবে। এটা তো আর সিনেমা না যে গান গাইতে গাইতে পিছনে ফিরে চুমু খাব। অত ক্ষমতা নেই আমার।”
আত্রেয়ী বলল, “আমার কিন্তু খুব আদর পাচ্ছে।”
আমি বললাম, “তাই? আমার তো সকাল থেকে। তাইলে বিরিয়ানি আগে না চুমু?”
আত্রেয়ী আমার কাঁধে আলতো চাপ দিয়ে বলল, “তুমি যেটা চাইবে।”
আকাশ মেঘলাই ছিল। বৃষ্টি নামল যেন আমাদের কথা শুনেই।
খানিকটা গিয়ে বাইকটা রাস্তার বাঁদিকে দাঁড় করালাম।
চুমৌষধি হইতে বড়ো ঔষধি নাই।
কোনও এক মহাপুরুষ বলেছেন।
কে বলেছেন জিজ্ঞেস করিয়া লজ্জা দিবেন না।
২৬ জীমূতবাহন
ক্লাস টুয়েলভ অবধি বয়েজ স্কুল। কলেজ কো-এড হলেও ছেলেদের সঙ্গে থাকতাম, মেয়েদের থেকে বরাবর দূরে।
সেই ছেলে যখন একটা পাহাড়ি গ্রামে বসে বৃষ্টির মধ্যে একটা সুন্দরী মেয়ে, যে কিনা আমার বউ বলে সবাই জানে, তাকে মনোযোগী হয়ে কাজল পরতে দ্যাখে, তার কী হতে পারে?
আমি তাকাতে চাই না, যতবারই মনে পড়ে, এ মেয়ে আমার নয়, অন্য কেউ আছে এই মেয়ের জন্য, তবু না চাইতেও চোখ পড়ে যায় আয়নায়। কেমন শিল্পীর মতো চোখের পাশ দিয়ে কাজল পরছে! একটু টেনে দিল কাজলটা। তাতে আমার একটা হার্টবিট মিস হল। বৃষ্টির জল হোম স্টের সামনের রাস্তা দিয়ে বয়ে চলেছে নদীর মতো, রান্নাঘর থেকে একটা মন কেমন করা মাংসের গন্ধ ভেসে আসছে, আর আমি ক্যাবলার মতো একটা মেয়ের কাজল পরা দেখছি।
যাতে ওদিকে চোখ না যায়, তার চেষ্টা করলাম। মোবাইল বের করে খুটখুট শুরু করলাম। লাভ হল না। আড়চোখটা বিশ্বাসঘাতকতা শুরু করল। ঠিক চোখ চলে যায়।
কাজল পরা হলে নিপুণ হাতে এবার লিপস্টিক দিতে শুরু করল। লাল রঙের লিপস্টিক, লাল, কিন্তু লাল নয়। কী অদ্ভুত রং! বউ ঠোঁটদুটো এক করে মন দিয়ে লিপস্টিক দিল।
আমি এবার খানিকটা অধৈর্য হয়েই জিজ্ঞেস করলাম, “এত সাজছ কেন? এই বৃষ্টিতে আজ তো আর কোথাও যাওয়া হবে না!”
বউ এবার নেলপালিশ ধরেছে। ঠান্ডা মেঝেতেই পা পেতে বসে পড়েছে। আমায় বলল, “সাজার জন্য কোনও এক্সকিউজ লাগে নাকি? আমি তো এমনি এমনি সাজি! তুমি নেলপালিশ পরবে নাকি? এসো।”
