আমি লিখলাম, “হ্যাঁ, হোক না পচা, তবুও তো আমার।”
অমৃত হাসির ইমোজি পাঠাল। লিখলাম, “খেয়েছ?”
অমৃত লিখল, “জাস্ট। তোমার পিটিএম কেমন যাচ্ছে?”
লিখলাম, “জঘন্য। তোমাকে নিয়ে এসে বসাতে পারলে ভালো হত, বুঝলে?”
অমৃত লিখল, “আমার তো তাই ইচ্ছা। সারাদিন তোমার কাছে এসেই বসে থাকি।”
আমার হাসি পেলেও হাসলাম না।
আদৃতা পাশে এসে বসে মোবাইলে ঝুঁকে পড়ল। আমি মোবাইলটা সরিয়ে নিয়ে বললাম, “কী হল? এসব কী?”
আদৃতা বলল, “তোর ইয়ে কী লিখেছে দেখাবি না ভাই? দেখা না, কী হয়েছে। আরে শেষে তো সেই বর যাবে দূরে আর শাশুড়ির সাথেই লড়ে মরতে হবে।”
আমি বললাম, “আমার শাশুড়ি নেই। শ্বশুর আছে।”
আদৃতা বলল, “তাও ভালো। বেঁচে গেছিস। আর কে কে আছে?”
আমি বললাম, “বলব না। সব বললে হয় নাকি?”
আদৃতা জোরে আমার গাল টিপে দিয়ে বলল, “ওলে বাবা লে, আমার সোনা মেয়ে রে। সবই তো দুদিন পরে জানতে পারব। এখন বলতে কী হয়?”
আমি হাসলাম, “গুরুদেবের বারণ আছে তো। কাউকে বলা যাবে না।”
আদৃতা চোখ টিপে বলল, “গুরুদেব? তা কে সে গুরুদেব? বাবা রামরহিম?”
আমি জোরে হেসে উঠলাম। বাণীদি তাকালেন, কিছু বললেন না।
আদৃতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “লুকো লুকো ভাই। এই সময়টাই জীবনের সেরা সময়, বুঝলি? তারপর সব কিছু সামলাতে হবে। লাইফ পুরো হ্যাজ হয়ে যাবে। মেয়েদের জীবন তিনটে জিনিসে চলে বুঝলি?”
আমি কৌতূহলী হয়ে বললাম, “কী তিনটে জিনিস?”
আদৃতা ডার্টি পিকচারের বিদ্যা বালানের মতো মুখ করে বলল, “স্যাক্রিফাইস, স্যাক্রিফাইস, স্যাক্রিফাইস।”
আমি আবার হাসলাম।
আদৃতা বলল, “হাসছিস না? হেসে নে। কিন্তু এই স্যাক্রিফাইসের মতো জিনিস হয় না। বিয়ের আগে লেগ পিস পছন্দ করিস? বিয়ের পরে বর খাবে সেটা। তুই তো ব্রেস্ট খাবি। শক্ত শক্ত পিস। দাঁতে ছিবড়ে লাগে। কিন্তু তোকেই সেটা খেতে হবে। মাছের পেটি পছন্দ করতিস? ছেলে খাবে তো, কাঁটা পিস খেতে পারবে না সে। তোকে ল্যাজা খেতে হবে, যেটা তুই সবথেকে বেশি অপছন্দ করিস। বরের শরীর খারাপ হতেই পারে, কিন্তু তোর? নৈব নৈব চ। ওই নিয়েই কাজ করতে হবে। কাজের মেয়ে না এলে তো আরও ভালো। ঘর মোছ, বাসন মাজ, সব তোকেই করতে হবে। এর অন্যথা হবে না। সর্বোপরি আছে শাশুড়ি মাতার জ্ঞান। বউমা, রাতে এটা খায় না, বউমা, ভাদ্র মাসে ওটা খেতে নেই, বউমা, শরীর খারাপ হলে ঠাকুরঘরে যায় না… মেরে ফেল কেউ আমায়।”
আমি বললাম, “এত রাগ?”
আদৃতা বলল, “রাগই রাগ। মেয়েদের বিয়ে মানেই তো সব শেষ। বুঝবি বুঝবি। এখন অনেক কিছু মনে হবে। কত কত প্রতিশ্রুতি দেবে সে। রাজরানি করে রাখব, সব কাজ করে দেব, তোমাকে কোনও কিছুতে হাত দিতে দেব না… শেষমেশ…”
আদৃতার গলা জোরে হয়ে গেছিল। বাণীদি শুনতে পেয়েছিলেন। বললেন, “এইটুকু বয়সেই তোর এই অবস্থা আদৃতা। আমার বয়সে এলে কী করবি তুই?”
আদৃতা বলল, “সত্যিই জানি না দিদি। মরে যাব আমি শিওর। তুমি একশো বছর বাঁচো। কিন্তু আমার তোমার মতো এতদিন বাঁচার কোনও দরকার নেই।”
অনিন্দিতা টিচার্স রুমে ঢুকল। ওকেও বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল। আমাদের দেখে হাসল। আদৃতা বলল, “এই দ্যাখো, আর-এক নতুন বিয়ে ভদ্রমহিলা। তা দিদিভাই, কেমন লাগছে বরকে?”
অনিন্দিতা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে চুল ঠিক করতে করতে বলল, “অনিরুদ্ধ? ঠিকই আছে। সপ্তাহান্তে কলকাতা আসে। বাকি সময়টা চাতক পাখির মতো বসে থাকা।”
আদৃতা বলল, “ভুবনেশ্বরে চলে যা না। কী হবে চাকরি করে?”
অনিন্দিতা হেসে বলল, “চাকরিটা দরকার। নিজের পায়ে দাঁড়ানোটা সব মেয়ের দরকার। বুঝিস না সেটা?”
আদৃতা বলল, “তা আর বুঝি না? এটাই তো অক্সিজেন এখন।”
ওদের কথা শুনছিলাম। হঠাৎ দেখি অমৃত মেসেজ করেছে, “আজকেও দেখা করব কিন্তু। এসো।”
২৫ অমৃত
হিমুর একটা নদী ছিল।
ময়ূরাক্ষী।
আমারও আছে।
আত্রেয়ী।
আমার সর্বক্ষণ সঙ্গে থাকার নদী।
সৈয়দ মুজতবা আলী লিখেছিলেন প্রেমে না পড়লে বোঝা যায় না আপনি বুদ্ধিমান না বোকা। প্রেমে পড়লে মানুষ উলটো হয়ে যায়। চালাকরা বোকা হয়ে যায়, আর বোকারা চালাক।
প্রেমে পড়ার পর আবিষ্কার করলাম আমি আসলে হেবি চালাক ছিলাম। হ্যাঁ, মানে সিরিয়াসলি, এখন বোকা হয়ে গেছি।
নইলে আত্রেয়ীদের বাড়িতে গিয়ে ওরকম কম্মোটা করি? অনেকটা সময় অবধি আমি বুঝতেই পারছিলাম না যে আমি ওদের বাড়ি আছি। হঠাৎ করে খেয়াল পড়ল। আর তারপরেই আমি ট্রিপ করে গেলাম।
দুই ভদ্রলোকের একজন যে আত্রেয়ীর বাবা, আর একজন যে জেঠু, সেটা বোঝার পর আমি কিঞ্চিৎ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছিলাম। অমন প্রিয় অমলেটও তখন অচেনা লাগছিল। সেটাও প্লেট থেকে যেন আমার দিকে তাকিয়ে গাইছিল, “সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে”।
সে সময়টা আত্রেয়ী পরিত্রাতা হয়ে না এলে আমার যাবতীয় কারিকুরি ওখানেই শেষ হয়ে যেত। “এই তুমি বেরোবে না, তোমার না অফিসের কাজগুলো বাড়িতে গিয়ে করতে হবে”, বলে আত্রেয়ী এমন তাড়া দিল, আমি হুড়মুড় করে অমলেটটা খেয়েই দৌড় দিলাম। দুই ভদ্রলোক আমার যাওয়ার পথের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন। পরে আত্রেয়ী বলেছে ওর বাবা আর জেঠু দুজনে মিলে ওকে ব্যাপক নাকি লেগপুল করেছে।
আমার বাবাও কম করছে না অবশ্য। ঘোষণা করেই দিয়েছে আমি নাকি বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ বউপাগলা ছেলে হব। বউ উঠতে বললে উঠব আর বসতে বললে বসব। সেটা শুনে দাদা বলেছে তার মানে এ গুণটা অমু তোমার থেকেই পাবে বাবা।
