ওর ফোনটা এখনও মেঝেতে পড়ে আছে। নিজে আর তুলতে যায়নি। আমার ওপর তেমন রাগারাগিও আর করেনি। যেন ঠিক আছে, এরকম তো হতেই পারে। কিছুক্ষণ পরে কম্বল টেনে নিয়ে ঘুমিয়েও পড়ল। আমি চুপ করে কিছুক্ষণ বসে থেকে শুয়ে পড়েছিলাম। মাঝরাতে দেখি আমার গায়ের ওপর পা তুলে দিয়েছে। গলার ওপর হাত। হাতটা কোনও মতে সরালাম। পা-টাও। বৃষ্টি নেমেছিল মাঝরাতেও। ও নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকল। একবারও উঠল না। আর আমার ঘুম এল না। পায়চারি করলাম। হোম স্টের বাইরের রাস্তায় খানিকক্ষণ হাঁটাহাঁটি করলাম। পাহাড়ের নিস্তব্ধতা চিরে ঝিঁঝির ডাক আসছিল। শীতও লাগছিল। এখানে রাতের দিকে শীত পড়ে। উদ্দেশ্যহীনভাবে অন্ধকারেই অনেকটা হেঁটে আবার ঘরে এসে বসলাম। কান, মাথা, নাক ঠান্ডা হয়ে গেছে।
ছেলেদের কাঁদতে নেই নাকি। আমার ভীষণ কান্না পেল। নিজের বর/বউয়ের আর-একটা সম্পর্ক জানার পরে মানুষ কি এভাবেই কাঁদে? আদৌ কাঁদে? আমার তো সব কিছুই দুম করে হয়ে গিয়েছিল, তাহলে আমার কেন কান্না পাবে? একটা সম্পর্ক, যাকে সবাই জোর করে নাম দিয়ে দিতে চেয়েছে, সে সম্পর্কে আমি কেনই বা দুম করে অধিকারবোধ দেখাতে যাব? কান্নাই বা আসবে কেন? এগুলো কেন হবে? মাথায় হাত দিয়ে অনেকক্ষণ বসে সোফাতেই ঢুলে পড়েছিলাম। ঘুম ভাঙল সেই বৃষ্টির শব্দেই। ও তখনও ঘুমাচ্ছে।
হোম স্টের মালকিন নিজে এসে চা দিয়ে গেলেন। দরজা খোলার শব্দে ও উঠে পড়ল। খাটে বসে বেশ কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “গুড মর্নিং।”
আমার মনে হল ও কি কালকের রাতের কথা ভুলে গেছে? সেটা আর জিজ্ঞেস না করেই বললাম, “গুড মর্নিং। চা দিয়ে গেছে। চিনি খাও তো?”
ও আঁতকে উঠে বলল, “একবারেই না। চিনি খেলে খুব ফ্যাট হয় জানো না?”
আমি বললাম, “হতে পারে।”
ও বাইরের দিকে তাকিয়ে বলল, “ঈশ, কী রোম্যান্টিক ওয়েদার।”
আমি কিছু বললাম না। চুপ করে বসে চা খেতে লাগলাম।
চায়ের কাপ হাতে নেবার পর ওর ফোনের দিকে চোখ পড়ল। বলল, “এই, তুমি আমার ফোনটা ভেঙে দিয়েছ না?”
আমি ওর দিকে তাকালাম। কেমন বাচ্চাদের মতো প্রশ্নটা করল। আমি বললাম, “ভুলে গেছ?”
ও খাটে বসে পড়ে বলল, “ভুলব কেন? ভোলার কিছু নেই। ফোন ছুড়ে ফেলতে পারো, মন থেকে কি কাউকে ছুড়ে ফেলতে পারবে?”
আমি বললাম, “একেবারেই না। সম্ভবও না সেটা। তোমায় আমি ফোন কিনে দেব। কাল আমার কাজটা উচিত হয়নি একেবারেই।”
ও বলল, “একদম। ভালোই হল, নতুন ফোন পাব। কাল আমার ভয় পাওয়া উচিত ছিল, কিন্তু পাইনি। স্বাভাবিক। তোমরা জায়গায় যে-কোনো ছেলে থাকলেও তাই করত। ইন ফ্যাক্ট তুমি যে বললে না খাদে ঠেলে ফেলে দেবে, সেটাও করতে পারত। তুমি তো কিছুই করলে না।”
আমি বললাম, “আমার কিছুই করার ক্ষমতা নেই। আমি নিজের কাজের জন্য যথেষ্ট দুঃখিতও বটে। তুমি আমার ফোন থেকে তোমার প্রয়োজনীয় ফোনগুলো সেরে নিতে পারো।”
ও হাত নেড়ে বলল, “দরকার নেই। বেড়াতে এসেছি, বেড়াই। পরে দেখা যাবে। অ্যাকচুয়ালি তোমাকেও দোষ দেওয়া যায় না। দুম করে কাউকে এভাবে বিয়ে করে মুরগি করা হলে তার রাগ হতেই পারে। আমি কিছু মনে করিনি। তুমি চাপ নিয়ো না।”
আমি বললাম, “নিচ্ছি না চাপ। তুমি ডিভোর্সের জন্য যা যা করার দরকার করে নিয়ো কলকাতা গিয়ে। আমি ভাবছি আর পাহাড়ে না গিয়ে বৃষ্টি কমলে এখান থেকেই কলকাতা ফিরে যাই। অকারণ ঘোরার তো কোনও মানে দেখতে পাচ্ছি না।”
ও বলল, “না না। আমি এখন কলকাতা যাচ্ছি না। ঈশ, জঘন্য। আর শোনো, তোমার চিন্তা করতে হবে না। ডিভোর্স হয়ে যাবে। মিউচুয়ালি করা কোনও ব্যাপারই না। আর আমরা তো রেজিস্ট্রিই করিনি এখনও। অত জটিল কিছু হবে না। খামোখা তোমার কটা দিন নষ্ট করলাম, এটা ঠিক। চিন্তা কোরো না, আমার একটা ফিক্সড ডিপোজিট আছে, তোমায় সব ক্ষতিপূরণ দিয়ে দেব। তুমি আমায় পাহাড় ঘোরাও বুঝলে? চাপ নিয়ো না। টাকা দিয়ে দেব। আমি ধার রাখব না।”
কেমন হাত পা নেড়ে নেড়ে ও কথাগুলো বলল। সব নিশ্চিন্ত যেন। কোথাও কোনও চিন্তা নেই, সব কত সহজ সরল। কেউ কেউ নিজের পৃথিবীটাকে এরকম বানিয়ে নিতে পারে। তাকে সামনে পিছনে কিছু ভাবতে হয় না। অন্যের জীবনে কী প্রভাব পড়ছে ভাবতে হয় না। সে সব কিছুই ভেবে নেয় তার মনমতো চলবে।
আমার চা খাওয়া হয়ে গেছিল। কাপটা সামনের টেবিলে নামিয়ে রেখে বললাম, “বেশ। কোথায় কোথায় যাবে বলো। ঘুরব।”
ও লাফ দিয়ে বলল, “ইয়েস।”
আমি অবাক হয়ে গেলাম। এই মেয়েটা আদৌ সুস্থ তো?
২৪ আত্রেয়ী
পেরেন্টস টিচার মিটিং-এর মতো ভয়াবহ ব্যাপার আমার জীবনে আর কিছু নেই। এক-একজন বাচ্চার বাবা এমনভাবে তাকিয়ে থাকে যেন গিলে খাবে। অথচ ব্যাপারটাকে বাইপাস করার জায়গা নেই। করতেই হবে। অত্যন্ত ক্লান্তিকরভাবে প্রথম পর্বটা শেষ হল। এই সময়টা মেসেজও দেখা যায় না। নিজের ডেস্কে এসে বসে সবার আগে মোবাইল দেখলাম। অমৃতর মেসেজ জমে আছে। একটা কবিতা লিখেছে কাঁচা হাতে। হাসি পেলেও হাসলাম না। বাণীদি কেমন অন্তর্ভেদী দৃষ্টি নিয়ে তাকান, ভীষণ লজ্জা লাগে। রিপ্লাইতে লাভ সাইন দিলাম বেশ কয়েকটা। অমৃত অনলাইনই ছিল। লিখল, “আমার এই পচা কবিতাও ভালো লাগল?”
