আমি বললাম, “তোমার ঘুম পায়নি?”
বউ বলল, “গাড়িতে ঘুমালাম তো। তুমি ঘুমালে ঘুমাও। আমি একটু টেক্সট করব ওকে।”
বউ ব্যাগ থেকে ফোন বের করে মেসেজ করতে শুরু করল।
আমি কেমন ক্যাবলার মতো কয়েক সেকেন্ড সেদিকে তাকিয়ে বললাম, “ভদ্রলোকের বউ? পাশে নেই?”
বউ হাসল, “বউ সাথে থাকে না তো। উইকএন্ডে দেখা হয় শুধু। বাকি পাঁচ দিন আমার সঙ্গে টেক্সট চলে। ও কটা দিন আমিই বউ আর কি।”
আমি বললাম, “ওহ। ঠিক আছে।”
বউ বলল, “তোমার আনএথিকাল লাগছে না ব্যাপারটা? স্বাভাবিক। শোনো, তোমাকে বেশি কিছু করতে হবে না। কয়েক দিন আমার সঙ্গে থেকো। তারপর ডিভোর্স দিয়ে দিয়ো। আমি তো বাড়ি চলেই গেছিলাম। পরক্ষণে মনে পড়ল আমি যদি তোমার সঙ্গে স্বাভাবিক দাম্পত্যে না থাকি তবে ওর বউয়ের সন্দেহ হতে পারে।”
আমি চুপ করে বসে থেকে বললাম, “অমলকান্তি পালিয়ে গেছিল কেন? ও কি কিছু বুঝেছিল?”
বউ জোরে হেসে উঠে বলল, “নাহ। অত বুদ্ধি ওর নেই। আমার একটা ভলান্টিয়ার দরকার ছিল। অমলকান্তি ছিল না, তুমি এলে। একই হল।”
আমি বললাম, “ভলান্টিয়ার? মানে মুরগি?”
বউ বলল, “তুমি রেগে যেয়ো না। কটা দিন কষ্ট করো। তারপর ডিভোর্স হয়ে যাবে।”
আমি বললাম, “ডিভোর্স করে তুমি কী করবে? ওই ভদ্রলোক তো বিবাহিত।”
বউ কাঁধ ঝাঁকাল, “ও এইসব বিয়ে-টিয়ে নামের ইন্সটিটিউশন মানে না। বউকে ছেড়ে আমার কাছে চলে আসবে যে-কোনো দিন।”
আমার সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছিল। বউ টেক্সট করতে করতে ফোন করল এবার। ফোনটা নিয়ে ঘরের বাইরে চলে গেল।
আমি খাটে চুপ করে বসে রইলাম। নিজেকে চার অক্ষরের বোকা মনে হল। অদ্ভুত একটা রাগ হচ্ছিল।
সমস্যা হল, এক-একটা মানুষের এক-একটা জিনিস থাকে না। আমার যেমন বেশ কিছু অনুভূতি ভোঁতা। যেভাবে বিয়ে হল তা মনে হয় এই দু হাজার উনিশ সালে এসে কারও হওয়া সম্ভব না। বিয়ে আদৌ করব কি না সেটাও কোনও দিন ঠিক ছিল না। বাড়ি থেকে তাড়া দিচ্ছিল বটে, কিন্তু আমি ঠিক কাটিয়ে যাচ্ছিলাম। বিয়ের নামে আমার বরাবর একটা ভীতি কাজ করত। যেভাবে বিয়েটা হয়েছিল সেটাও একটা ঘোরের মধ্যে।
বিভূতিভূষণের আমলে এসব বিয়ে হত বটে। কিন্তু ঘোর কলকাতা শহরে এভাবে জোর করে বিয়ে দেওয়ার কারণটা একটু একটু করে খোলসা হচ্ছিল। হিসেবমতো আমার রেগে যাওয়া উচিত। চেঁচামেচিও করা উচিত। আমার কিছুই আসছিল না। আমি কেমন একটা জড়ভরতের মতো কয়েক মিনিট বসে রইলাম। দলা পাকিয়ে একটা কান্না যে আসছিল না তা অস্বীকার করব না, তবে সেটা গিলে ফেলছিলাম। এভাবে একটা মানুষের সঙ্গে কী করে পরপর অঘটন ঘটতে পারে? জোর করে বিয়ে, হানিমুনের নাম করে বন্ধুর কাছে হাত পেতে টাকা নিয়ে আসা, আর তারপরে এরকম একটা গল্প শোনা, আমার নিজেরই সব কিছু কেমন অবিশ্বাস্য লাগছিল। জ্ঞানত কারও কোনও ক্ষতি করিনি, পাড়ার কারও জন্য হাসপাতালে রাত জাগতে হলে সবার আগে আমিই দৌড়োই। যখন যা দরকার আমি চলে যাই সবার আগে। সেই আমার সঙ্গে এরকম একটা বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার হতে পারল? ডিভোর্স হয়েই বা কী হবে? এ ক্ষত তো চিরকালীন হয়ে থাকবে। রাগ হচ্ছিল। একটু একটু করে।
খাটে শুয়ে পড়লাম। বালিশে মাথা দিয়ে চাদর টেনে নিলাম। ঘুম আসছিল না তবে চোখ বুজে রইলাম। কিছুক্ষণ পরে বউ এসে পাশে শুল ফোনে কথা বলতে বলতেই। ন্যাকা ন্যাকা গলায় কথা বলছিল, “তুমি কিন্তু নিজের খেয়াল রাখবে। এরপরে এসো, আমার কোলে মাথা রেখে শুয়ো, আবার আমি তোমার চুলে বিলি কেটে দেব।”
আমি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে বসে থেকে উঠে বসলাম। বউয়ের হাত থেকে ফোনটা নিয়ে দেওয়ালে ছুড়ে মারলাম।
বউ আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে উঠে বসে বলল, “এটা কী করলে তুমি?”
আমি নিজেও বুঝতে পারিনি এটা আমি করতে পারি। একটু ভেবে নিয়ে বললাম, “আমি করিনি। ঘুমের ঘোরে আমার এরকম একটা রোগ আছে। তুমি কিছু মনে কোরো না। আমার ফোন দিয়ে ফোন করো। আমি তোমাকে ফোন কিনে দেব একটা।”
বউ চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “আইন-টাইন জানা আছে? বধূনির্যাতন হলে কী হতে পারে জানো? চাকরি তো যাবেই, জেলের ঘানি টেনে জীবন কেটে যাবে।”
আমি বললাম, “পাহাড়ে অনেকের বউ খাদে পড়ে মরে যায় জানো তো? পা স্লিপ করে যায়। বেশি চাপের কিছু না। একটু ঠ্যালা দিলেও হয়। কিংবা ধরো তোমার গলাটা টিপে দিলাম। তারপর খাদে ফেলে দিলাম। কে বুঝবে?”
বউ আতঙ্কিত হয়ে আমার দিকে তাকাল। বলল, “তোমাকে নিরীহ ভেবেছিলাম।”
আমি শুয়ে পড়ে চোখ বন্ধ করে বললাম, “ঘুমিয়ে পড়ো। কাল সকালে দার্জিলিং যাবে। আর ওই কে আছে না, তার সঙ্গে আর-একবার কথা বললে তাকে ধাপার মাঠে পুঁতে দিয়ে আসব। আমাকে চেনো না তুমি।”
বউ অবিশ্বাসী চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
২৩
ছোটোবেলায় পড়েছিলাম জীব আর জড়। প্রকৃতিটা প্রাণী বাদে যেসব গাছপালা আর জড় পদার্থ নিয়ে তৈরী, তাদের কি আমাদের দুঃখ, কষ্ট, আনন্দ, সুখ ইত্যাদিতে কিচ্ছু যায় আসে? মনে তো হয় না। সকাল থেকে ক্রমাগত বৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে।
দার্জিলিং যাবার সিদ্ধান্ত ক্যান্সেল করতে হয়েছে এই বৃষ্টিতে বেরোতে পারা যাবে না বলে। একটা কম্বল মুড়ি দিয়ে নিশ্চিন্তে কেমন গুটিশুটি মেরে বউ ঘুমাচ্ছে। আমি জানলা খুলে খাদ দেখছি আর মাঝে মাঝে বউয়ের দিকে তাকাচ্ছি। এই মেয়েটা আমাকে ভালোবাসে না। সব কিছুই হঠাৎ করে হয়ে গেছে। তবু এই বাইরের বৃষ্টি আর এই কুঁকড়ে থাকা শোয়াটা সব কেমন অবিশ্বাস করতে বলছে!
