আমার হয়েছে সেই অবস্থা। এমন জ্যাম লাগল সেবক থেকে, আর দার্জিলিং যাওয়া হল না। তিস্তা বাজারের থেকে যে রাস্তা কালিম্পং-এর দিকে বেঁকে গেছে, সে রাস্তায় খানিকটা গিয়ে নাম না জানা জায়গায় একটা নির্জন হোম স্টে-তে যখন পৌঁছোলাম তখন রাত সাড়ে আটটা।
বউয়ের চাপ ছিল না। খানিকক্ষণ পর পর ঘুমিয়েছে। আমার গাড়িতে ঘুম এসেছিল বটে, কিন্তু এত খিদে পেয়েছিল যে ঘুম ভেঙে গেছিল। গোটা রাস্তা গাড়ি শামুকের গতিতে এগিয়েছে। হোম স্টে-তে পৌঁছে চেঞ্জ না করেই বিছানায় শুয়ে পড়লাম।
বউ একটা জানলা খুলে দিল। শীত নেই তেমন। জানলার কাছে গিয়ে সিগারেট ধরিয়ে কয়েকটা টান দিয়ে বলল, “তুমি জীবনে কটা প্রেম করেছ?”
আমার মাথা ধরে গেছিল। তবু বউয়ের প্রশ্নটা কানে এল। একটা হালকা হাওয়া আসছে বাইরে থেকে। বললাম, “হাফখানা। তাও একটা বিয়েবাড়িতে। ক্লাস ইলেভেনে। মেয়েটা বিয়েবাড়ির পরে আর ফোনও ধরল না।”
বউ খ্যাক খ্যাক করে কয়েক মিনিট হেসে বলল, “তা বোঝাই যায়। তোমার দ্বারা প্রেম হবে না।”
আমি বললাম, “ইয়ে মানে সিগারেটটা না খেলে হয়? আমার কেমন মাথা ধরছে।”
বউ বলল, “তুমিও ধরাও একটা। নাকি কাউন্টার নেবে?”
আমি বললাম, “আমার ইচ্ছে করছে না।”
বউ বলল, “গুড। আচ্ছা, তুমি আমাকে বিয়ে করেছ। তোমার সম্মান রক্ষার্থে এই সিগারেটটা আমি ফেলে দিলাম।”
আমাকে অবাক করে বউ সিগারেটটা জানলা দিয়ে ফেলে দিল।
আমি খানিকক্ষণ সেদিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকলাম। বাপরে। কত সম্মান। বলতে ইচ্ছা করছিল, আমাকে এত সম্মান দিলেন মা, আমি কি এত সম্মানের যোগ্য? বললাম না। যা জিনিস, এখানে কোনও সিন ক্রিয়েট করে দিলে কেলো হয়ে যাবে।
বউ আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “খুশি?”
আমি মাথা নাড়লাম, “হ্যাঁ, খুশি।”
বউ খাটের ওপর বসে মাথার চুল খুলে দিল। কত চুল রে বাপ! আমার চুলে শ্যাম্পু করতে দু টাকার সানসিল্কে হয়ে যায়। এর যা চুল দেখছি, তাতে শিওর গোটা বোতল লাগে। ধুস, কী সব মাথায় আসছে।
বউ আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “অমলকান্তি হলে এখন কবিতা আউড়াত। শুনে শুনে কান পচে গেছে। চুল নিয়ে লোকের কী এত কবিত্ব আসে কে জানে! হিন্দির চুল নিয়ে তো আসতে পারে।”
আমি হেসে ফেললাম। বউ বলল, “তোমার প্রেম হয়নি তাহলে সেভাবে?”
দরজায় কেউ নক করল। বউ দরজা খুলল। গরম কফি দিয়ে গেল দু কাপ। বউ আমার দিকে আমার কাপটা এগিয়ে দিয়ে বলল, “এ নাও। ভালো লাগবে।”
আমি ভাবছিলাম আমার কী ভাগ্যি। অবশ্য যেরকম ওয়েদার, যখন তখন যা তা হতেই পারে। আমার বউয়ের যা রূপ দেখেছি, ঠিক কিছুই বিশ্বাস হয় না। উঠে বসে কফিতে চুমুক দিলাম। বেশ ভালো লাগল। বউ আবার জিজ্ঞেস করল, “তোমার প্রেম হয়নি তাহলে সেভাবে?”
আমি মাথা নাড়লাম, “না। হয়নি। তোমার?”
বউ বলল, “আমারও হয়েছে। ফিজিকাল রিলেশনও।”
আমি চমকালাম না। এ মেয়ের থেকে কিছুই অপ্রত্যাশিত না। বললাম, “অমলকান্তির সঙ্গে?”
বউ মুখ কুঁচকে বলল, “ধুস! ওই দু লাইনের ফেসবুক কবির দু ইঞ্চিও আছে নাকি সন্দেহ আছে আমার। ও তো আমার বডিগার্ড ছিল।”
আমি খাবি খেয়ে বললাম, “মানে? ওকে তুমি ভালোবাসতে না? ওর সঙ্গে বিয়ে করতে গেছিলে যে?”
বউ চুপ করে কফি খেতে লাগল। কিছুক্ষণ পর বলল, “অ্যাকচুয়ালি ওর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা পুরোটাই লোক দেখানো। ওকে আমার দরকার ছিল কিছু মানুষের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য। আমি যাকে ভালোবাসি সে একজন বিবাহিত মানুষ। কয়েক মাস হল বিয়ে হয়েছে।”
আমি চমকালাম।
বউ হেসে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “ওর কিন্তু বিয়েতে বিন্দুমাত্র মত ছিল না। বাড়ি থেকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা দুজন দুজনকে পাগলের মতো ভালোবাসি।”
কফিটা কেমন বিস্বাদ লাগছিল। তবু জিজ্ঞেস করলাম, “তাহলে তুমি এখানে এলে কেন?”
বউ বলল, “ওকে জ্বালাতে। প্রেমে একটু জ্বালানো পোড়ানোরও দরকার আছে, তাই না?”
আমি ক্যাবলার মতো মাথা নাড়লাম।
বউ বলল, “প্রথম যখন প্রোপোজ করেছিল, আমি শুরুতেই না করে দিয়েছিলাম ওকে। ও কিন্তু হাল ছাড়েনি। ক্রমাগত আমায় বিভিন্নভাবে বুঝিয়ে গেছে আমার ওপর ওর সফট কর্নার আছে। বাইরে চাকরি করে ও। বিয়ের কার্ড দিতে কলকাতা এসে বলল দেখা করবে। আমার বাড়িতেই এল। কেউ ছিল না সেদিন। কার্ড দেওয়া হল, কিন্তু তার থেকেও বেশি যেটা হল, আমি আবিষ্কার করে বসলাম আমি ওকে ভালোবাসি। দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরে খুব আদর করলাম। ও আমাকে কথা দিয়েছিল বিয়েটা করবে না। কিন্তু বাড়িতে জানানো মাত্র এত সমস্যা বেড়ে গেল যে বিয়েটা ওকে করতেই হল। যদিও আমাদের মধ্যে যোগাযোগটা ঠিকই আছে এখনও। আমরা মিটও করি।”
আমি অবাক গলায় বললাম, “আর ওর বউ?”
বউ হেসে বলল, “বিন্দুবিসর্গ জানে না। ও বলেইনি ওকে কিছু।”
আমি বললাম, “কিন্তু সেটা কি ঠিক হয়?”
বউ বলল, “এভরিথিং ইজ ফেয়ার ইন লাভ অ্যান্ড ওয়ার। চলো ডিনার করে আসি।”
বউ উঠল।
আমার আর উঠতে ইচ্ছা করছিল না।
খিদেটা কোথায় যেন ঢুকে গেল।
২২
মাংসের গন্ধ ভালোই বেরিয়েছিল। চিকেন রুটি করেছিল। বউ অনেকটা খেল। খিদে পেয়েছিল। আমি একটা রুটির বেশি খেতে পারলাম না। অস্বস্তি লাগছিল।
ঘরে এসে বউ বলল, “তোমার আমার স্টোরিটা শুনতে ইচ্ছে করছে?”
