সদুদা বাবার থেকেও বড়ো। আমাদের দোকানের কর্মচারী থেকে এখন প্রায় সবটাই সামলায়।
আমাদের দোকানের ডিডি গেঞ্জি বলা যেতে পারে। চোখ বন্ধ করে ভরসা করা যায়।
আমার যখন ছেলেপক্ষ তাড়িয়ে বাড়িতে মার ঝাঁটাপেটা খাবার উপক্রম হয়, তখন আমি সদুদার ঘরে গিয়ে লুকাই। আমাদের দোকানের পিছনেই সদুদার ছোট্ট একখানা ঘর। একখানা ছোটো টেবিলফ্যান চালিয়ে গেঞ্জিটা মিশমিশে কালো ভুঁড়ির উপর তুলে দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমায়। এরকম গায়ের রংওয়ালা লোকেদেরই আবলুশ কাঠ গায়ের রং বলে বোধ হয়।
সদুজেঠু বলা উচিত, কিন্তু কোলে পিঠে করে মানুষ করেছে, ছোটোবেলা থেকে দাদা চলতে চলতে এখনও সেটাই বলি। আবার সদুজ্যাঠাও বলি কখনও কখনও। পাগল তো আমি। ডাকের ঠিক ঠিকানা নেই কোনও।
সাঁপুইদের তাড়িয়ে যথারীতি আমি সদুদার ঘরে সেঁধিয়েছি।
সদুদা এক ধামা মুড়ি নিয়ে বসেছিল। মাখা সন্দেশ দিয়ে মুড়ি মেখে খায়। হেবি লাগে। আমিও খাই। তবে এখন ভালো লাগছিল না। চুপ করে গিয়ে বসলাম।
সদুদা মুড়ি খেতে খেতে বলল, “তোর বাপ তোর বিয়ে দিয়েই ছাড়বে কপাল। পালিয়ে যেতে পারবি না।”
আমি রেগে ছিলাম। ঘোঁৎ করে একটা শব্দ করে বললাম, “জানি তো। মেয়েরা তো বাবা মার বোঝা। যত তাড়াতাড়ি ঘাড় থেকে নামানো যায় তত মঙ্গল। কই, আমার মতো দোকান বাবাও কি চালাতে পারে? একবারও কেন ভাববে না, মেয়ে যদি বিয়ে করতে না চায় তবে থাক?”
সদুদা ফিক ফিক করে হাসতে হাসতে বলল, “যদি মেয়ের বাবারা সেটা ভাবত, তবে পৃথিবীটাই অন্যরকম হয়ে যেত। মেয়েজন্ম তো পাপ। তাও তো ভালো রে, এ দেশেরই কোনও কোনও রাজ্য আছে, যেখানে আল্ট্রাসোনোগ্রাফি করে দেখে নেয় পেটে মেয়ে আছে, তারপর গর্ভাবস্থাতেই সে মেয়েকে মেরে ফেলা হয়। তোর বাপের মোটা মাথায় আর কী ঢুকবে? মেয়ের বিয়ে ছাড়া আর কিছু ভাবতেই পারবে না। যে দেশে মেয়ে জন্মালে বাবারা মেয়ের বিয়ের জন্য টাকা জমাতে শুরু করে, যেখানে মেয়ের বিয়ে মানেই একগাদা জিনিস দিতে হয়, সে দেশে মেয়েকে বিদায় করাটা অস্বাভাবিক কেন হবে?”
আমার কান্না পাচ্ছিল। কাঁদলাম বেশ খানিকক্ষণ হুহু করে। একমাত্র সদুদার কাছেই আমি প্রাণ খুলে কাঁদতে পারি। সদুদা কান্না থামাল না। আমাকে চুপ করে কেঁদে যেতে দিল। কান্নার বেগ কমলে সদুদা বলল, “মানুষ একটা মেয়ের বাইরেটা দ্যাখে। তার সাজগোজ দ্যাখে, চোখ দ্যাখে ট্যারা নাকি, দাঁত দ্যাখে ফোকলা নাকি, পা দ্যাখে খোঁড়া নাকি। যেমন করে গোরু কেনে লোকে হাট থেকে, সেভাবে দ্যাখে। অথচ মেয়েটার কী ইচ্ছা, কটা মানুষ দ্যাখে?”
আমি ফোঁপাতে ফোঁপাতে বললাম, “তুমি থামো। খালি বড়ো বড়ো কথা। নিজে বিয়ে না করে ভুঁড়িওয়ালা ময়রা সেজে জীবন কাটিয়ে দিলে আর আমাকে বাতেলা মারছ। বিয়ে করতে পারতে না? তোমার যদি মেয়ে হত, কত সুখে থাকত বলো তো?”
সদুদা হাসল, “আমিও আসলে তোর বাবার মতোই। বাতেলায় অন্ধকার করে দেবে, আর আসল জায়গায় গিয়ে দেখা যাবে আমিও ওদের মতোই করছি। আমার ইচ্ছায় হত না, আমার বউয়ের ইচ্ছায় হত হয়তো। তোর বাবা কি তোকে কম ভালোবাসে? মা কি কম ভালোবাসে? তা তো না। কিন্তু তোকে বিয়ে দেওয়ার জন্য ওরা এত উতলা কেন? কারণ এটাই সিস্টেম। সিস্টেম ভাঙার কথা সবাই ভাবতে পারে না। তবে যারা ভাঙে তারাই টিকে যায়, বাকিরা গতানুগতিক হয়ে থেকে যায়। তুই বল না, নেতাজির আমলে কত লোক তো থাকত, একজনের নামও কেউ জানে? তুই তোর প্রপিতামহের নাম জানিস? কিন্তু সুভাষচন্দ্র বোসের নাম সবাই জানে। কেন জানে? কারণ লোকটা ওই নিস্তরঙ্গ সুখী, মেরুদণ্ডহীন বাঙালি জীবনটাকে ভাঙতে পেরেছিল। মানুষকে বিশ্বাস করাতে পেরেছিল যে, দ্যাখো, চেষ্টা করলে পারব না হয়তো, কিন্তু পারতেও তো পারি। তুই সৌরভ গাঙ্গুলির কথা ভাব না। লোকটার তো সব ঠিক ছিল না। লাফিয়ে ওঠা বল খেলতে পারত না, হুক পুল তো ছেড়েই দিলাম। টিম থেকে বাদ দিয়ে দিল। চ্যাপেল জানে, এ ছোঁড়া ঘাসের পিচে পায়খানা করে দেবে। ভেবেছিল যাবে সাউথ আফ্রিকান পিচে, বুকে-টুকে বল খেয়ে পালিয়ে আসবে। কিন্তু আদতে কী হল? সেই ছেলেটাই অবলীলায় ঘুরে দাঁড়াল। গড়পড়তা বাঙালি চিন্তাধারা নিয়ে চললে পারত? অনেক তো পেয়েছিল জীবনে, অত বড়ো বাড়ি, অতগুলো বাড়ি, দেশের ক্যাপ্টেনও ছিল, কী দরকার ছিল খেলার? রিটায়ারমেন্ট নিয়ে নিলেই তো পারত। নাহ, নেয়নি। এখানেই লোকটা সবার থেকে আলাদা। সবাই পারে না। কেউ কেউ পারে। যারা পারে, তারা থাকে। তোর বাবা পারবে না, থাকবেও না।”
আমি মুগ্ধ হয়ে সদুদার কথা শুনছিলাম। কত সুন্দর করে কথা বলে লোকটা, কত জ্ঞান, অথচ মিষ্টির দোকানেই কাটিয়ে দিল গোটা জীবন। মানুষের জীবন বড়ো জটিল। কে যে কোথায় কেন আছে, কেউ বলতে পারে না।
কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বললাম, “ও সদুদা, বাবার আগের বউয়ের কথা বলো না গো। কেমন ছিল দেখতে?”
সদুদা উত্তর না দিয়ে মন দিয়ে মুড়ি খেতে লাগল। এই কথা জিজ্ঞেস করলেই সদুদা চুপ মেরে যায়। কখনও মুড হলে একটু বলে। বেশিরভাগটাই বলে না।
আমি উঠলাম না আর। চুপ করে বসে রইলাম। কোথাও যেতে ইচ্ছা করছিল না।
২১ জীমূতবাহন
কথায় আছে, “অভাগা যেদিকে চায়, সাগর শুকায়ে যায়।”
