ট্রেন ছুটে চলেছে দ্রুত গতিতে।
আমি আরও কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম, “তুমি কি আমার সঙ্গে সংসার করতে চাও? না মজা করে ঘুরতে এলে এই অবধিই?”
বউ আমার দিকে চোখ ছোটো ছোটো করে তাকিয়ে বলল, “তুমি কি চাও? তোমার আমাকে পছন্দ?”
আমি বললাম, “আমি অত ভেবে দেখিনি। সব কিছু এত ঝড়ের গতিতে হয়ে গেল, তুমি বাড়িও চলে গেলে, আবার এখানেও নিয়ে চলে এলে, আমি ঠিক করে কিছু বুঝতেই পারছি না, আমার সঙ্গে কী হচ্ছে বা হতে চলেছে।”
বউ ফিক ফিক করে হাসতে হাসতে বলল, “ষোলো বছর বয়স ছিল। এক মেধাবী দাদা প্রেগন্যান্ট করে দিয়েছিল। অনেক কষ্টে সে যাত্রা বেঁচেছিলাম। এই ফ্যাক্টটা জানলে তুমি আমাকে বিয়ে করতে?”
আমি ওর দিকে তাকালাম। হাসি হাসি মুখটা কখন যেন সিরিয়াস হয়ে গেছে।
ট্রেনের স্পিড বাড়ছে।
আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
১৯ আত্রেয়ী
মানে এ ছেলেটা এরকম কেন? কেন? আর আমার কপালেই এরকম জুটবে কেন?
বাইকটা দাঁড় করালি করালি, তাও জেঠুমণির সামনেই? আর আমার জেঠুকেই জিজ্ঞেস করে বসলি, “জেঠুমণি ভালো আছ?”
আমার মনে হচ্ছিল হৃৎপিণ্ড বেরিয়ে যাবে এত জোরে হার্টবিটের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম।
জেঠুমণিও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছিল। একবার ওর দিকে, আর-একবার আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “হ্যাঁ ভালো আছি, কিন্তু তুমি কে বাবা?”
অমৃত আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “নামো তো।”
আমি খানিকটা ঘোরের মাথাতেই বাইক থেকে নামলাম।
অমৃত নিজে নামল, হেলমেট খুলল, তারপর বাইক স্ট্যান্ড করে জেঠুমণিকে ঢিপ করে প্রণাম করে বলল, “আমার নাম অমৃত। আমি আত্রেয়ীকে বিয়ে করব।”
জেঠুমণি কাশতে শুরু করল।
আমি রেগেমেগে ওর হাত ধরে বললাম, “তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি?”
অমৃত এবার বুঝল কেস করেছে। একবার আমার দিকে আর একবার জেঠুর দিকে তাকিয়ে বলল, “খুব ভুল করে ফেললাম মনে হচ্ছে?”
জেঠুমণি কাশতে কাশতে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “ওকে ঘরের ভেতর নিয়ে জল-টল দে। মনে হয় বেশি উত্তেজনায় কী বলতে হবে বুঝতে পারেনি।”
অমৃত মাথা চুলকে বলল, “তাই হবে। আমি ঠিক নরমাল নই, বুঝলেন?”
আমি দাঁতে দাঁত চিপে রাগি গলায় বললাম, “বাইকটা বাড়ির ভেতরে ঢুকিয়ে এসো। অনেক করেছ।”
অমৃত বাইক স্ট্যান্ড থেকে নামাতে গিয়ে পড়তে পড়তে বাঁচল। আমিই ধরলাম। তারপর দুজনে মিলে বাইকটা বাড়ির ভেতর নিয়ে এলাম।
বাবা বাইরে শব্দ শুনে বাইরে এসেছিল। জেঠুমণি বাবাকে দেখে বলল, “বাপ্পা দেখ রে তোর জামাই এসেছে।”
বাবা হতভম্ব গলায় বলল, “মানে?”
আমার মনে হচ্ছিল শাবল দিয়ে গর্ত করে মাটির ভিতর ঢুকে যাই। অমৃতকে দেখিয়ে বাবাকে বললাম, “ওর নাম অমৃত।”
বাবা কয়েক সেকেন্ড অমৃতর দিকে তাকিয়ে বলল, “ওহ। আচ্ছা। বেশ তো।”
বাবাও বাক্যহারা হয়ে গেছে। আমি অমৃতর দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বললাম, “আমার বাবা! প্রণাম করো।”
অমৃত বাবার পায়ে ডাইভ দিল। বাবা চমকে উঠে “থাক বাবা, থাক থাক”, বলে সরে গেল।
অমৃতকে বললাম, “ঘরের ভিতর চলো।”
অমৃত ঘোরের মধ্যেই কোনও দিকে না তাকিয়ে বসার ঘরে গিয়ে সোফায় বসে পড়ল।
জেঠুমণি জোরে হেসে উঠল। বাবা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “কী রে? কী ব্যাপার?”
জেঠুমণি বলল, “বুঝলি না? আমাদের মেয়ে তার মতো একটা পাগল জোগাড় করেছে। ভারী মজার ছেলে। চ আলাপ করি।”
আমি কী করব বুঝতে না পেরে রান্নাঘরে দৌড়োলাম। সেখান থেকেই দেখলাম অমৃতর সামনে বাবা আর জেঠুমণি বসেছে।
আমি জিভ কাটলাম। এ কী সমস্যায় পড়লাম রে বাবা! এরকম করে কিছু হয় নাকি? এ কেমন পাগল ছেলে!
ডিম দেখতে পাচ্ছিলাম। কড়াইতে তেল গরম করে ডিম ছাড়লাম। অমলেটটা হতেই প্লেটে নিয়ে শিগগিরি বসার ঘরে দৌড়লাম। ওকে একা ছাড়া যাবে না। আবার ছড়িয়ে লাট করে যদি!
অমৃত অবশ্য ডিমের প্লেট দেখেই আমার দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ গলায় বলল, “বাহ, তুমি তো আমার পালস পড়তে পারো দেখছি। তুমি কী করে বুঝলে আমার এখন অমলেট খেতে ইচ্ছা করছিল?”
বাবা মুগ্ধ গলায় অমৃতর দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার অমলেট ভালো লাগে বুঝি?”
অমৃত চামচ দিয়ে অমলেট কাটতে কাটতে বলল, “আমার বেসিকালি সব কিছু ভালো লাগে। কিন্তু সন্ধে হলে অমলেটের যে মারকাটারি একটা ব্যাপার আছে, সেটাকে অস্বীকার করার কোনও জায়গা নেই।”
জেঠুমণি হাসতে হাসতে বলল, “কীরকম?”
অমৃত বলল, “দেখুন পৃথিবীতে মাছ, মাংস অনেক কিছুই আছে খাবার মতো। কিন্তু ওই যে তাওয়ায় ডিমটা দেওয়া হয়, তারপর যে জিনিসটা প্লেটে আসে, আর তার সঙ্গে চারদিক জুড়ানো যে গন্ধ, এর তুল্য বোধহয় আর কিছু হতে পারে না। অ্যাটলিস্ট আমার কাছে। হ্যাঁ, এক-একজন মানুষ এক-এক রকম। আপনার হয়তো ফিশফ্রাই ভালো লাগে। লাগতেই পারে। গণতান্ত্রিক দেশ, সবার পছন্দ সমান হবে, এমন মাথার দিব্যি কে দিয়েছে?”
বাবা বলল, “তোমাদের আলাপ কোথায়?”
অমৃত মন দিয়ে ডিম খাচ্ছিল। এতক্ষণ পরে বোধহয় বুঝতে পারল ও আমার বাবার সামনে বসে আছে। অমলেট সহ প্লেটটা সামনের টেবিলে রেখে আমার দিকে অসহায় চোখে তাকাল।
আমার কেন জানি না, ঠিক এই সময়টাই ছেলেটাকে ভীষণ জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা করছিল।
একজন মানুষ এতটা পাগল, এত ভালো হয় কী করে?
২০ কপালকুণ্ডলা
মাঝে মাঝে আমি ভুলে যাই আমার মা বাবার দ্বিতীয় পক্ষের বউ। সদুদা মনে করিয়ে দেয়।
