মাথায় সারাক্ষণ একটা কথাই পাক খায় আজকাল। বিয়েটা কবে হবে?
আত্রেয়ী বলল অবশ্য বাড়িতে বলবে। সমস্যা তো এটাই। দুজন মানুষ ভালোবাসবে, তারপর পরিবার চলে এসে সব কিছু জটিল করে দেবে। অবশ্য আমার মনে হয় না আমাদের দুই পরিবার থেকেই কোনওরকম সমস্যা হতে পারে। দু পক্ষই যথেষ্ট লিবারাল। তবু ভয় লাগে।
ভালোবাসার মানুষকে হারানোর ভয়ের থেকে বড়ো ভয় বোধহয় আর কিছু হয় না। আত্রেয়ী আমার ঘাড়ে আলতো করে আদর করে, আমি চুপ করে বসে থাকি। আদর করার পরে আত্রেয়ী বলে ঠিক এমন করে ও ওর কুকুরকেও আদর করে। বলেই ফিক ফিক করে হেসে ফেলে।
শুনে আমি বুঝতে পারি আমার হেবি রেগে যাওয়া দরকার, কিন্তু আমি রাগতে পারি না। আত্রেয়ীর কানে কামড়ে দিয়ে বলি, দ্যাখো তো, এভাবেই তোমার কুকুরও কামড়ায় নাকি? দুজনে মিলে খুনসুটি শুরু হয়।
আত্রেয়ীর বাড়ির সামনে যখন ওকে নিয়ে নামালাম, দেখলাম একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন। আত্রেয়ী আগে দেখেনি। যখন দেখল তখন দেরি হয়ে গেছে। আমার কোমর খামচে ধরে বলল, “জেঠুমণি। তুমি বাইকটা দাঁড় না করিয়ে সোজা বেরিয়ে যাও।”
আমার মাথা কাজ করছিল না। আমি উলটোটা করলাম। সোজা আত্রেয়ীর জেঠুমণির সামনে বাইকটা দাঁড় করিয়ে দিলাম।
ভদ্রলোক একবার আমার দিকে, আর-একবার আত্রেয়ীর দিকে বিস্মিত চোখে তাকালেন।
আমি আর-একটু ছড়ালাম, ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে বত্রিশ পাটি বের করে বললাম, “জেঠুমণি ভালো আছ?”
আপনি-টাপনি না, সরাসরি তুমি।
আমি কেস খাব না তো কে খাবে?
১৮ জীমূতবাহন
কথায় আছে কপালে থাকলে কী যে হতে পারে ভগাদাও জানেন না।
আমার হয়েছে সেই অবস্থা। দার্জিলিং মেইলে বউসুদ্ধ এসি টু টিয়ারের টিকিট ম্যানেজ হয়ে গেল। আমাকে অবশ্য কিছুই করতে হয়নি। সবই তিনি করেছেন।
আমাকে অফিস থেকে স্টেশনে যেতে বলেছিল। গিয়ে দেখি পায়চারি করছে। আমাকে দেখে কড়া গলায় বলল, “টাকা জোগাড় হয়েছে?”
আমি ব্যাজার গলায় বললাম, “ধার করেছি।”
বউ খুশি খুশি গলায় বলল, “বেশ তো। ধারে ঘোরার মজাই আলাদা।”
আমি বললাম, “ট্রেনের টিকিট কী হবে? মেঝেতে বসে যাবে?”
বউ বলল, “আমার টিটি মামা আছে কি মুখ দেখতে? চলো দেখি।”
তারপর আমার হাত ধরে টেনে টেনে নিয়ে গেল এক কালো কোটওয়ালা ভদ্রলোকের কাছে। দেখেই চিনেছি, এ চিজ ছিল বিয়েতে। আমাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসাতে এর অবদানও কম না।
এরপর পুরোটাই মোহন সিরিজের গল্প, “কী হইতে কী হইয়া গেল কেহ বলিতে পারে না।”
প্রথমেই এসিতে তুলে দিল আমাদের। তারপর ঠিক দেখা গেল সাইড আপার লোয়ারে দুজন অ্যাবসেন্ট। বোলপুর স্টেশনে পেরোনোর পর অবাক চোখে দেখলাম ম্যানেজ হয়ে গেল।
আমার সালোয়ারধারী বউ চোখ নাচাতে নাচাতে বলল, “দেখলে তোমার বউয়ের ক্ষমতা?”
আমি খাবি খেয়ে বললাম, “সে তো বিয়ের দিন থেকেই দেখছি, এ আর নতুন কী?”
বউ বাইরের দিকে তাকিয়ে বলল, “তা ঠিক। বাড়িতে বলেছ তো?”
আমি বললাম, “হ্যাঁ। বলেছি।”
বউ বলল, “আমিও বলেছি।”
আমি বললাম, “অমলকান্তি যাবে নাকি দার্জিলিং?”
বউ আমার দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বলল, “ওই শুয়োরটা কেন যাবে? মানে কেন? কী কারণে?”
আমি বললাম, “না মানে ওর সঙ্গে তো তোমার বিয়ে হবার কথা ছিল। তাই ভাবলাম।”
বউ বলল, “বিয়ে হয়েছে?”
আমি বললাম, “না তা হয়নি।”
বউ কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমাকে দেয় কে? সিরিয়াসলি, কে দেয় তোমায়?”
আমি বললাম, “ইয়ে মানে কেউ দেয় না বলেই তো তোমার সঙ্গে বিয়ে হয়েছে।”
বউ বলল, “তাও ঠিক। যাক গে, এ যাত্রায় বেঁচে গেলে। ডিভোর্স করার ইচ্ছে নেই আমার। ইচ্ছে করছেও না।”
আমি দীর্ঘশ্বাস চেপে বললাম, “কেন? মানে আমি কি খুব ইম্প্রেসিভ কিছু কাজ করেছি?”
বউ মাথা দুদিকে নাড়িয়ে বলল, “না। আমার মুড নেই। দাঁড়াও, একটু ফুঁকে আসি বাইরে থেকে।”
আমি আঁতকে উঠে বললাম, “ফুঁকবে মানে? ট্রেনে স্মোকিং ব্যান না?”
বউ বলল, “না না, মাঝের প্যাসেজটায় ফুঁকব। কেন, তোমার একা থাকতে ভয় লাগবে?”
আমি হাসব না কাঁদব বুঝতে না পেরে বললাম, “না ঠিক আছে, যাও।”
বউ ফুঁকতে গেল।
আমি কয়েক মিনিট আলুসেদ্ধর মতো বসে থেকে দরজা ঠেলে মাঝের প্যাসেজে গিয়ে দেখলাম বউ মন দিয়ে সিগারেট ফুঁকছে। আমাকে দেখে বলল, “কী ব্যাপার? কাউন্টার নেবে?”
আমি ভয়ে ভয়ে মাথা নাড়ালাম, “না লাগবে না।”
বউ বলল, “মদ খেতে ইচ্ছা করছে।”
আমি ঘাবড়ে গিয়ে বললাম, “থাক। দার্জিলিং গিয়ে খেয়ো নাহয়।”
বউ বলল, “হ্যাঁ, তাই করতে হবে। তুমি স্মোক করো তো, নাও না কাউন্টার।”
আমি বললাম, “আচ্ছা দাও।”
বউ সিগারেটটা এগিয়ে দিয়ে বলল, “বহুদিন পাহাড় দেখি না। ঝাঁটের লাইফ হয়ে গেছে। বালছাল কবিদের সাথে এইজন্য প্রেম করতে নেই। শুধু বাতেলা। এইসব অমলকান্তি-ফান্তি কোত্থেকে যে জোটালাম কে জানে! তুমি কোনও দিন কবিতা লিখেছ?”
আমি বললাম, “আমার মেলে না। মানে ছন্দ। আর বুঝিও না ঠিক ওসব।”
বউ আমার হাত থেকে সিগারেট নিয়ে মন দিয়ে টান দিতে দিতে বলল, “মেয়েরা কবিতা হেবি খায়। জনি সিন্সের ইয়ের থেকেও বেশি খায় দুই লাইনের কবিতা। আমিও খেয়েছিলাম। মাল যে ডরপোক বেরোবে বুঝিনি।”
আমি ভালো মানুষের মতো মুখ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
