মানালি বুঝতে পারল না ধ্রুব এত ঠান্ডা মাথায় কেন কথা বলে যাচ্ছেন। ঝড়ের খানিকটা আভাস সে পাচ্ছিল।
ধ্রুব বললেন, “ইয়েলো জার্নালিজম অনেক দেখেছি। তবে আপনাদের মতো নির্লজ্জ এবং নির্বোধ জার্নালিস্ট এই প্রথম দেখলাম। চাকরি চলে গেলে কী করবেন ভেবেছেন? ওহ, আপনারা তো মেয়ে। মেয়েদের তো সাত খুন মাফ। কিছু বলা যাবে না। বললেই সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্টের কেস করে দেবে।”
মানালি বুঝল ধ্রুবর রাগ ওয়ার্ম আপ শুরু করে দিয়েছে। সে ফোনটা কেটে অফ করে রেখে দিল।
২৩
ঋতিকে নামিয়ে দীপের ফিরতে ফিরতে রাত সাড়ে দশটা হয়ে গেল।
বাড়ি থেকে বারবার ফোন আসছিল রাস্তাতেই। দীপ ধরেনি। দরজা খুলে তাকে দেখে মা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, “ফোন ধরছিলি না কেন?”
দীপ বলল, “বারবার বলেছি যখন ফোন ধরব না তখন বুঝে নেবে ড্রাইভ করছি, রাস্তায় যা জ্যাম ছিল।”
বাবা বসার ঘরে বসে টিভি দেখছিল। বলল, “একবার ফোন করে দিলেই পারতিস। তোর মা তো সন্ধে সাতটার পর থেকেই রোজ ঘর বার করা শুরু করে দেয়। ইতিহাসে কাঁচা ছিল তো।”
দীপ অবাক হয়ে বলল, “মানে? এর সঙ্গে ইতিহাসে কাঁচা হবার সম্পর্ক কোথায়?”
বাবা বলল, “ওই যে, তোর যে রোজ ফিরতে দেরি হয় সেটা ভুলে যায়।”
মা বাবাকে ধমক দিল, “তুমি থামো তো! আমার কেমন চিন্তা হয় তা যদি বুঝতে।”
বাবা বলল, “আমার ভাগের চিন্তাটাও তুমি নিয়ে রেখেছ আগেকার দিনের সুলতানদের মতো। আমি আর কী করব।”
মা বলল, “তুই হাত পা ধুয়ে আয়, আমি খেতে দিচ্ছি।”
দীপ বলল, “না না, আমি খেয়ে এসেছি, অফিসেই। আজ আর খাব না।”
বাবা অবাক গলায় বলল, “বাবা, অফিসগুলো দেখছি আজকাল খাবারও দিচ্ছে। কালে কালে কত দেখব। আমাদের অফিসে তো ক্যান্টিনের খাবার একদিন খেলে দশদিন পেট খারাপে শুয়ে থাকতে হত। সবই আইটির দয়া।”
মা গজগজ করছিল। দীপ তাড়াতাড়ি বাথরুমে ঢুকে হাত পা ধুয়ে ঘরে ঢুকে গেল।
ঋতি মেসেজ করেছে বাড়ি ফিরে গেছে। দীপ দেখল হোয়াটসঅ্যাপে চিত্রলেখার একগাদা মেসেজ এসেছে।
শেষে একটা ভয়েস মেসেজ এসেছে। রাত আটটা নাগাদ। দীপ প্লে বাটন টিপল, ওপাশ থেকে চিত্রলেখার গলা ভেসে এল, “দীপ, তোমাকে সারাদিন ধরে বারবার চেষ্টা করে গেলাম। পেলাম না। আমি বুঝতে পারছি তুমি একটা সন্দেহের ওপর ভিত্তি করে একটা ডিসিশন নিয়েছ। আমি জানি, বুঝতে পারি তুমি যে সিদ্ধান্তটা নিয়েছ সেটা তোমার দিক থেকে খুবই ভ্যালিড, কিন্তু বিশ্বাস করো, ছেলেটা ইচ্ছা করে তোমাকে কথাগুলো বলেছে। আমাদের মধ্যে এমন কোনও কিছুই হয়নি। ছেলেটা একটা সাইকো দীপ। ও চায় আমার জীবনটা দুমড়ে মুচড়ে যাক। আজ ও সফল। আমি হেরে গেলাম দীপ। ভালো থেকো। এইটুকুই বলব। আর কখনও তোমাকে বিরক্ত করব না। সবশেষে একটা রিকোয়েস্ট করব। আমরা একবার শেষ বারের জন্য মিট করতে পারি? অনেক হ্যাংলার মতো কথাগুলো বললাম। তবু জানিয়ো।”
থেমে থেমে কথাগুলো একটু একটু করে বলেছে চিত্রলেখা। দীপ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে বসে থাকল। হঠাৎ করে একটা অপরাধবোধ তার মাথায় একটু একটু করে চেপে বসছিল।
সে ফোনটা রেখে ড্রেস চেঞ্জ করে খাটে এসে বসল। ঋতি ফোন করছে। ধরল দীপ, “সব ঠিকঠাক তো?”
ঋতি বলল, “ইয়েস অ্যান্ড থ্যাংক ইউ।”
দীপ বলল, “ফর হোয়াট?”
ঋতি বলল, “আর কীসের জন্য হতে পারে? সব কিছুর জন্য। বিশেষ করে আজকের দিনটার জন্য।”
দীপ বলল, “তাহলে তো সেম টু ইউ বলতে হয় ঋতি রানি।”
ঋতি বলল, “বাড়িতে সব ঠিকঠাক তো? এত রাতে ফিরলে, বাবা মা কিছু বললেন না?”
দীপ বলল, “আমার তো হয়েই থাকে রাত। প্রায়ই। অতটা চাপ হয় না। তোমার বাবা কিছু বললেন বুঝি?”
ঋতি হাসল “আমারও হয়, তবে আজ একটু বেশিই হল। তবে সবথেকে খারাপ পার্ট হল আমাকে ভাত খেতে হল।”
দীপ আঁতকে উঠল, “সে কী! বলোনি তুমি যে খেয়ে এসেছ?”
ঋতি বলল, “না। বললেই মা একগাদা প্রশ্ন শুরু করে দিত। ওই গ্র্যান্ড ভাইভা অ্যাটেন্ড করার থেকে ভালো খেয়ে নেওয়া। বমি করলাম অবশ্য।”
দীপ বলল, “বোঝো। বমি করলে যখন মা কিছু বুঝল না?”
ঋতি বলল, “আমার দোতলায় ঘর তো। ওরা নিচে থাকে। বুঝবে না। এসেই মিউজিক সিস্টেমে হাই ভলিউমে গান চালিয়ে দিয়েছিলাম।”
দীপ হাসতে হাসতে বলল, “যাহ্, তাহলে তো কোনও চিন্তাই নেই।”
ঋতি বলল, “নেই আবার। হুহ। আমার মার প্রশ্নের সামনে তো কোনও দিন পড়নি, তাই বলছ এই কথা। যেদিন পাবে, দেখবে একে ফরটি সেভেনের মতো থেকে একের পর এক প্রশ্ন বেরিয়ে আসছে।”
দীপ বলল, “ওরে বাবা। সেটা আবার কবে হবে? ফ্লাইটে তো সেরকম কিছু মনে হল না।”
ঋতি বলল, “কী করে মনে হবে? তুমি তখন অপরিচিত একজন মানুষ ছিলে। এর পরে তো আর থাকবে না দীপবাবু। তখন বুঝবে।”
দীপ বলল, “আচ্ছা? বেশ তাই হোক।”
ঋতি বলল, “তো? কাল থেকে আবার সেই থোড় বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোড়?”
দীপ বলল, “আর একমাস পরে তো তোমার সেটা থাকছে না। তখন?”
ঋতি বলল, “তোমাকে বলেছি না এটা মনে করাবে না?”
দীপ বলল, “তবে কী মনে করাব বলো? মনে করতে না চাইলেও তো সেটাই মনে পড়ে যাচ্ছে। কী করব?”
ঋতি বলল, “মনে করবে না ব্যস। তুমি আমাকে এমন করে ভালোবেসো যেন কোথাও যেতে না হয়। পারবে?”
দীপ বলল, “পারব। অবশ্যই পারব।”
