উত্তেজিত লাগছিল খানিকটা।
একটু ভেবে বিশ্বরূপদাকে ফোন করল সে। একটা রিং হতেই ধরল বিশ্বরূপদা, “এই তো, তোর ফোনের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম, বল। ধ্রুব ফোন করেছে নাকি?”
মানালি কথার উত্তর না দিয়ে বলল, “নিউজটা শনিবার যাবার কথা ছিল না?”
বিশ্বরূপদা বলল, “দেরি হয়ে যেত তো। অন্য কোনও মিডিয়া নিউজটা করে দিলে ফুল কেলো হয়ে যেত। রিস্কটা নেওয়া গেল না আর কি! এত বড়ো স্কুপ অন্য কোনও মিডিয়া পেলে ছাড়ত? তোর কী মনে হয়? তুই তো এখন টক অফ দ্য টাউন হয়ে যাবি। এত বড়ো এক্সক্লুসিভ নিউজ করলি। দেখ দেখ, কত ফোন আসবে আজ।”
মানালি বলল, “হুঁ। রাখছি। শোনো আজ যাচ্ছি না। কাজ আছে।”
বিশ্বরূপদা বলল, “রাগ হল নাকি?”
মানালি বলল, “নাহ। বাবা আসবে। বাড়িতে অনেক কাজ আছে। বাই।”
বিশ্বরূপদাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ফোনটা কেটে দিল সে। ফোনে একটা এস এম এস এসেছে। ঈপ্সিতা বাগচীর। সকালেই এসেছে। লেখা, “ফ্রি থাকলে ফোন করবেন একটু।”
মানালি বেশ খানিকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকল। একটু ভেবে ফোনটা করল।
ঈপ্সিতা ধরলেন একবারেই, “গুড মর্নিং।”
মানালি খানিকটা কুণ্ঠিত ভাবে বলল, “গুড মর্নিং ম্যাম। নিউজটার ব্যাপারে ফোন করেছেন?”
ঈপ্সিতা বললেন, “হ্যাঁ। আমার একটাই কথা বলার। আমি ভেবেছিলাম এখনও হয়তো কেউ কেউ আছে যাকে ভরসা করা যায়। আপনাকে দেখে আমার তেমনটাই মনে হয়েছিল। ভুলটা আজ ভাঙল।”
মানালি বলল, “দেখুন ম্যাডাম, আমি এই ব্যাপারে একেবারেই কিছু বলতে পারব না। নিউজটায় শুধু নামটা আমার গেছে। গোটাটাই আমার বস বিশ্বরূপদার পরিকল্পনা অনুযায়ী লেখা।”
“রিপোর্টটা তো আপনার নামেই হয়েছে। আর দিনের শেষে সেটাই ম্যাটার করবে, তাই না?” ঈপ্সিতার গলাটা শান্ত।
মানালি একটু থেমে বলল, “দেখুন ম্যাম, আমার কেরিয়রটা জাস্ট শুরু হয়েছে। অনেক সিদ্ধান্তই আমি নিতে পারি না যেটা হয়তো নিতে চেয়েছিলাম। এই স্টোরিটার ব্যাপারও একেবারেই তাই। ধ্রুব বাবুর সঙ্গে বিশ্বরূপদার সামান্য কথা কাটাকাটি থেকে যে এই নিউজটা তৈরি হবে, বিশ্বাস করুন ম্যাম, আমি কালকে এই সময়ে দাঁড়িয়েও ভাবতে পারিনি।”
ঈপ্সিতা বললেন, “বিশ্বাস করা না-করার ওপরে তো আর কিছু দাঁড়িয়ে নেই এখন। যা হবার তা তো হয়েই গেল। যাই হোক, ভালো থাকুন। আর হ্যাঁ, ওকে তো চেনেনই। একটু সামলে থাকবেন। নিজের মত অনুযায়ী কিছু না ঘটলে লোকটাকে আর চিনতে পারা যায় না।”
ফোনটা কেটে গেল।
মানালি ফোনটা অফ করে সোফায় হেলান দিয়ে চোখ বুজল। মা ঘরে এসে বলল, “টিফিন রেডি আছে। স্নান করে নিয়ে যাস।”
মানালি বলল, “আজ ছুটি নিলাম।”
মা খানিকক্ষণ অবিশ্বাসী চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলল, “সূর্যটা কোনদিকে উঠেছে আজ কে জানে।”
মা বেরোলে মানালি ফোনটা নিয়ে অন করল।
বাবাকে ফোন করল। বাবা বলল, “কি রে, এই ফ্লাইট থেকে নেমে ফোন অন করলাম আর সঙ্গে সঙ্গে ফোন? বল কী বলবি।”
মানালি বলল, “আর কতক্ষণ বাবা?”
বাবা বলল, “আর বড়োজোর দেড় ঘণ্টা। কী আনব বল।”
মানালি বলল, “কিছু আনতে হবে না। শিগগির এসো তো।”
বাবা অবাক গলায় বলল, “শিগগির মানে? কী হল আবার? মা ঠিক আছে তো?”
মানালি বলল, “উফ, তুমিও না! ওসব কিছু না। তুমি এসো, তারপর কথা হবে।”
বাবা ফোন রাখতে মানালি ফোনটা আবার অফ করতে যাচ্ছিল, এমন সময় দেখল ধ্রুব বাগচী টেক্সট করেছেন, “কনগ্র্যাচুলেশনস।” শুধু এই শব্দটা লেখা। আর কিচ্ছু না।
মানালি প্রথমে ভাবল রিপ্লাই দেবে। পরক্ষণে সিদ্ধান্ত বদলাল। তার ফোন বাজতে শুরু করল আবার। মানালি দেখল এবার শ্রীপর্ণা ফোন করছেন, ধরল সে, “হ্যালো।”
“এসব কী হল আজ?”
শ্রীপর্ণা ওপাশ থেকে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন।
মানালি বলল, “আই ক্যান এক্সপ্লেইন ম্যাম।”
শ্রীপর্ণা বললেন, “কী এক্সপ্লেইন করবে? আর কী বাকি আছে এক্সপ্লেইন করার? সেই ধ্রুবকে জড়িয়েই নিউজটা করতে হল?”
মানালি বলল, “গোটাটাই এডিটরের নির্দেশে ম্যাম।”
শ্রীপর্ণা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বললেন, “আজ আমার জন্মদিন। তোমরা কী অসাধারণ গিফটটাই না দিলে আজ! স্পিচলেস!”
মানালি বলল, “প্লিজ ম্যাম। রাগ করবেন না। আমার ওপর যেমন যেমন ইন্সট্রাকশন ছিল তেমনটাই লিখেছি।”
শ্রীপর্ণা বললেন, “একজন মেয়ে হয়ে এই লাইনটা লিখতে লজ্জা হল না তোমার? এটা… এটা কী লাইন? শ্রীপর্ণার ফাঁকা ফ্ল্যাটে বারবার কীসের আকর্ষণে যেতেন ধ্রুব? ছিঃ! একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ককে তোমরা এভাবে খোলাবাজারে খেলো করে দিলে! আমি ভাবতেই পারছি না।”
মানালির দম আটকে আসছিল। সে কোনওমতে “ম্যাম এই নিউজ রিলেটেড সব রকম কথা বিশ্বরূপদার সঙ্গে করলে ভালো হয়” বলে ফোনটা কেটে দিল।
সে কয়েক সেকেন্ড বসে ধ্রুব বাগচীকেই ফোন করল। টেনশন এতটাই হচ্ছিল তার যে আর নিজেকে সে সামলে রাখতে পারল না।
ফোনটা ধরে ধ্রুব শান্ত গলায় বললেন, “নিশ্চয়ই আপনি কিছুই জানেন না নিউজটার ব্যাপারে?”
মানালি থমথমে গলায় বলল, “আমার ওপর যা ইন্সট্রাকশন ছিল তাই লেখা হয়েছে। এর বাইরে আর কিছু বলার নেই আমার।”
ধ্রুব বললেন, “দারুণ কাজ করেছেন। আমি খুশি হয়েছি। এস এম এসটা পড়েননি? আমি তো আপনাকে কনগ্র্যাচুলেট করলাম আবার।”
