মানালি চুপ করে বসে থাকল। ধ্রুব বললেন, “বলুন। আপনার বক্তব্যটাও মূল্যবান আমার কাছে। আপনি নিজে গিয়ে ওর ইন্টারভিউ করে এসেছেন যখন!”
মানালি বলল, “আমি তো ওঁর সঙ্গে স্কুলটা নিয়ে নিউজ করব বলেই ফোন করেছিলাম। আমি যদি সেটা নিয়ে নিউজ করি তাহলে আশা করি ওঁর বা আপনার কারও কোনও আপত্তি থাকবে না।”
ধ্রুব কাঁধ ঝাঁকালেন, “ওকে। কুল। গো অ্যাহেড।”
মানালি অবিশ্বাসী চোখে ধ্রুবর দিকে তাকাল, “তার মানে স্কুলটা নিয়ে স্টোরিটা করলে আপনার কোনও আপত্তি নেই?”
ধ্রুব বললেন, “আপাতত। তবে আশা করি স্টোরির ভিতর খোঁচা-টোচাগুলো থাকবে না। সেক্ষেত্রে আপত্তি থাকবে। এবং নিউজটা বেরোনোর পর আপত্তির জায়গাটা আশা করি আপনাদের পক্ষে সুখকর হবে না।”
মানালি ভাবছিল সব মিটে গেল, এবার উঠে পড়লেই হয়, এই সময় হঠাৎ তাকে অবাক করে বিশ্বরূপদা বলল, “এভাবে আপনি ঈপ্সিতার থেকে দূরে থাকতে পারবেন বলে আপনার মনে হয়?”
ধ্রুব বিশ্বরূপদার দিকে তাকালেন।
ঘরে একটা অদ্ভুত অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এল।
বিশ্বরূপদা পরের তিরটা ছুড়ল, “এভাবে সব সময় মেয়েটাকে পিষে রেখে যাবার চেষ্টা করে গেলেন। কী পাবেন এসব করে?”
ধ্রুব স্থির চোখে বিশ্বরূপদার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনারা আসতে পারেন।”
বিশ্বরূপদা উঠল, “স্টোরিটা হবে মিস্টার বাগচী। আপনার হিসেবে নয়, আমার হিসেবেই হবে। আপনি যা করার করতে পারেন।”
ধ্রুব বিশ্বরূপদার দিকে তাকিয়ে রইলেন। কিছু বললেন না।
মানালি উঠল। যতক্ষণ না তারা বেরোল, মানালি দেখল ধ্রুব বাগচী চুপচাপ বসে তাদের দেখে গেলেন।
ব্যাকগ্রাউন্ডে মগনলাল মেঘরাজ।
তবে এই সময় বিশ্বরূপদাকে আর জটায়ুর মতো লাগছিল না।
হাবেভাবে জটায়ুর গল্পের প্রথমজনের মতোই লাগছিল।
১৯
দরজা ধাক্কানোর শব্দে সকালে ঘুম ভাঙল দীপের। উঠে ঘুমচোখে ঘড়ি দেখে চমকে উঠল। সাড়ে আটটা বাজে। উঠে তাড়াহুড়ো করল না। একটু চেঁচিয়ে বলল, “উঠেছি।”
সে আগে বসকে ফোন করল। সমীরবাবু ফোন ধরে বললেন, “বলো।”
“স্যার আজ একটু ডাউন লাগছে, কাল ভুবনেশ্বর থেকে ফিরে খারাপ লাগছিল বটে, আজ দেখছি একেবারেই উঠতে পারছি না।”
“ওকে ওকে। টেক রেস্ট। একটা দিন রেস্ট নিলে ঠিক হয়ে যাবে আশা করি। আর ভাইরাল হলে তো হয়ে গেল। মেডিসিন নিয়ে নাও। টেক কেয়ার।”
ফোনটা রেখে দীপ বাইরের ঘরে গেল। মা উৎকণ্ঠিত গলায় বলল, “কি রে, এত দেরি করে উঠলি? অফিস যাবি না?”
দীপ ব্যস্ততা দেখাল, “হ্যাঁ, যাব তো, দেরি হয়ে গেল।”
মা বলল, “যা যা, ভাত হয়ে গেছে, স্নান সেরে বেরোলেই দিচ্ছি।”
দীপ অফিস যাবার সময় যেমন ব্যস্ততা দেখায় তেমন ব্যস্ততা দেখিয়েই তৈরি হয়ে বেরোল। ঋতিও আজ কিছু একটা অজুহাত দেখিয়ে অফিস থেকে ছুটি নেবে। আগের রাতে এই প্ল্যানই হয়েছে।
অফিস টাইমের জ্যাম কাটিয়ে ঋতি যখন দীপের গাড়িতে উঠল তখন সকাল দশটা বাজে। দীপের একটা অদ্ভুত উত্তেজনা হচ্ছিল। ঋতি গাড়িতে ওঠার পর সে বুঝতে পারল তার হৃৎস্পন্দন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সে বলল, “তৈমুর ড্রাইভ?”
ঋতি অবাক হয়ে বলল, “মানে?”
দীপ হাসল, “লং ড্রাইভ?”
ঋতি বলল, “আমিও সেটাই ভাবছিলাম, কলকাতায় থাকলে অফিসের কেউ দেখলে দুজনেই কেস খাব। তুমি কি শরীর খারাপ বললে?”
দীপ বলল, “ইয়েস।”
ঋতি হাসতে হাসতে বলল, “সেম হিয়ার।”
দীপ গাড়ি স্টার্ট দিল। কেজো অফিসের বাইরে গিয়ে একদিন আচমকা ছুটি নেওয়া, সঙ্গে ঋতির সান্নিধ্য, তার নেশার মতো লাগছিল। সে বলল, “পারফিউমটা দারুণ কিন্তু, ব্র্যান্ডটা?”
ঋতি বলল, “দারুণ মানে তো অনেক রকম দারুণ হয়। তুমি কোনটা মিন করতে চাইছ?”
দীপ বলল, “সিডাকটিভ। তুমি ড্রাইভ করতে জানো তো? সিডাকশন বেশি হয়ে গেলে আমার ঘুম পেয়ে যায়।”
ঋতি হাসল, “তাহলে তো বিপদ। ঘুমিয়ে পড়লে বউ পালাবে যে।”
দীপ ছদ্ম টেনশন আনল গলায়, “সত্যিই। তাহলে তো ভারী বিপদ। আচ্ছা বউয়েরও তো একটা দায়িত্ব থাকা উচিত তাই না? আমাকে জাগিয়ে রাখার?”
ঋতি হাসল, “হুউ, শখ কত! উনি পড়ে পড়ে ঘুমোবেন আর ওনার বউ ওনাকে জাগিয়ে রাখবে!”
দীপ বলল, “হ্যাঁ শুনেছি লিপস্টিকের গন্ধ নাকি খুব ভালো জাগিয়ে রাখতে পারে।”
ঋতি বলল, “ওহ!!! এটা তো জানতাম না! তা অফিসে ঘুমিয়ে পড়লে বুঝি কোনও মেয়ে এরকম লিপস্টিকের গন্ধেই ঘুম ভাঙায়?”
দীপ কপট দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “নাহ, অত সৌভাগ্য এখনও হয়নি। আপাতত খোঁজ চলছে।”
ঋতি বলল, “খোঁজ চলছে বুঝি? এখনও পাওয়া হয়নি? আমিও খুঁজতে শুরু করি তবে?”
দীপ বলল, “শিওর, সবাই মিলে খুঁজলে তবেই তো অরূপরতন পাওয়া যাবে।”
ঋতি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, এই সময়ে বুকপকেট থেকে দীপের ফোনটা বেজে উঠল।
ঋতি বলল, “অফিস থেকে নাকি?”
দীপ বলল, “যেখান থেকেই হোক। ড্রাইভ করার সময় আমি ফোন রিসিভ করি না।”
ঋতি বলল, “ইউ আর এ বিজি পার্সন। যখনই দেখা হয়, তোমার ফোন রিং হয়ে যায়।”
দীপের সিক্সথ সেন্স বলছিল ফোনটা চিত্রলেখাই করছে। সে মিথ্যা করে বলল, “অফিসের প্রোজেক্টটা নিয়ে একটু বিজি আছি এখন। ওই ব্যাপারেই হয়তো।”
ঋতি জিভ কাটল, “ইশ, তাহলে কি আমি দেখা করার আবদারটা করে ভুল করলাম?”
দীপ বলল, “ধুস, আমার নিজেরই কি রোজ রোজ অফিস করতে ভালো লাগে নাকি? এসব নিয়ে ভেবো না। আমি ফোনটা সাইলেন্ট করে দিচ্ছি।”
