ধ্রুব বাগচী তার দিকে তাকিয়ে কথাটা বললেন। মানালি বিশ্বরূপদার দিকে তাকাল।
ধ্রুব বললেন, “উঁহুঁ, বসের দিকে তাকালে হবে না। আপনাকে প্রশ্নটা করেছি। জবাবটা আপনি দেবেন।”
মানালি একটু ইতস্তত করে বলল, “কী বলে?”
ধ্রুব বাগচী তাঁর সামনে রাখা বড়ো কফি মাগে চুমুক দিয়ে বললেন, “তাদের পেজ থ্রি রিপোর্টার বলে। কে হেগে জল দেয় না, কোন নায়কের হাইড্রোসিল হয়েছে, কার যৌন মিলনের সময় দশ সেকেন্ডে কোর্স কমপ্লিট হয়ে যায়, এসব রিপোর্ট করা হল পেজ থ্রি রিপোর্টারের কাজ। দেশের কার কী প্রবলেম, কোথায় লোক খেতে পাচ্ছে না তাতে এঁদের কিচ্ছু এসে যায় না, টাইগার শ্রফের লেজের কালার নিয়ে এঁরা সবথেকে বেশি চিন্তিত। বুঝেছেন তো?”
ধ্রুব বাগচী একটুও উত্তেজিত না হয়ে কথাগুলো বললেন।
মানালির কান মাথা ঝাঁ ঝাঁ করছিল।
আগের দিন রাত্রে ধ্রুব ফোন করে পরের দিন সকালে দেখা করতে বলেছিলেন। মানালি গলা শুনেই বুঝেছিল, রাত্রে মদ খেলেও ধ্রুব ভীষণ রেগে ছিলেন। একটাও বাড়তি কথা বলেননি। সকালে বিশ্বরূপদাকে ফোন করলে বিশ্বরূপদা ঠিক করে সেও যাবে মানালির সঙ্গে।
“ওকে ঝেড়ে লাভ নেই। অ্যাসাইনমেন্টটা ওকে আমিই দিয়েছিলাম।” বিশ্বরূপদা বলল।
ধ্রুব বললেন, “কেন দিয়েছিলেন?”
বিশ্বরূপদা বলল, “সেটা তো বলা যাবে না কেন দিয়েছিলাম।”
ধ্রুব মন দিয়ে কফিটা শেষ করে মাগটা টেবিলে রেখে বললেন, “ওকে। দিয়েছিলেন। বেশ করেছিলেন। এবার তবে ধ্রুব বাগচীর কেচ্ছা নামিয়ে ফেলুন। ওঁকেই বলছেন কেন, সেই লোকের পেছনের গন্ধ শুঁকে যাওয়া মালটাকেই বলুন না আমার কেচ্ছা নামাতে। নিজেকে বেশ রবীন্দ্রনাথ সুলভ মনে হবে। বইয়ের নাম দেবেন নাহয় ধ্রুব বাগচীর আদরের দাগ! বুলশিট যত রাজ্যের!”
মানালি পরিষ্কার বুঝতে পারছিল ধ্রুব বাগচী একটু একটু করে রাগছেন, কিন্তু উত্তেজনাটা কিছুতেই বুঝতে দিচ্ছেন না।
বিশ্বরূপদা বলল, “দেখুন ধ্রুব, একটা জিনিস আপনাকে বুঝতে হবে।”
ধ্রুব বাধা দিয়ে বললেন, “কী বুঝতে হবে?”
বিশ্বরূপদা বলল, “আমরা মুখে বাকস্বাধীনতার কথা বলি। অথচ নিজেদের স্বার্থে আঘাত লাগলেই সবথেকে বেশি সেটার বিরোধিতা করি। এই আপনিই তো সেদিন বাকস্বাধীনতার পক্ষে কত কথা বললেন। আপনার মনে হয় না ব্যাপারটা সেলফ কন্ট্রাডিক্টরি হয়ে যাচ্ছে?”
ধ্রুব বললেন, “আপনার কী হিসেবে মনে হয় লোকের ব্যক্তিগত জিনিস নিয়ে কেচ্ছা ঘাঁটাটা বাকস্বাধীনতার আওতায় পড়ে?”
বিশ্বরূপদা বলল, “নিউজটা কি বেরিয়েছে ধ্রুব? তাহলে এত উত্তেজনা কেন? ইনফ্যাক্ট কালকে রাতেই মানালির সঙ্গে আমার এই বিষয়ে কথা হয়েছে। ঈপ্সিতার কাজটা নিয়ে আমরা একটা স্টোরি করব, ব্যস। আপনাকে কোনও ভাবেই টানা হবে না।”
ধ্রুব কয়েক সেকেন্ড বিশ্বরূপের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমি এরকম কোনও কিছু চাইছি না। ইজ দ্যাট ক্লিয়ার?”
মানালি দেখল ধ্রুব বাগচীর চোয়াল শক্ত হয়ে এসেছে।
ঠিক এই সময়েই তার খেয়াল হল দেওয়ালে একটা নতুন পোস্টার লেগেছে। মগনলাল মেঘরাজের। তার হঠাৎ করে খুব হাসি পেয়ে গেল। বিশ্বরূপদা কেমন জটায়ুর মতো পরিস্থিতিতে আছে বলে মনে হচ্ছে এখন। অনেক কষ্টে জিভ কামড়ে হাসি চাপল সে। তার এটা একটা সমস্যা। সিরিয়াস জায়গাগুলোতে হাসি পেয়ে যায় বিচ্ছিরিভাবে।
বিশ্বরূপদা বলল, “সরকারি কিছু বিজ্ঞাপন বন্ধ হবে। এই তো?”
ধ্রুব বাগচী ফুঁ দেবার ভঙ্গি করে বললেন, “সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করার মতো ভাটের কথা বলার লোক ধ্রুব বাগচী নয় সেটা আশা করি আপনি জানেন। আমি আপনাকে এথিক্সের দিকটা বোঝাতে চাইছি। সেটুকু বোঝার মতো বোধ বুদ্ধি আশা করি আপনার আছে।”
মানালি দেখল ধ্রুব বাগচী বেশ আক্রমণাত্মকভাবে গোটা ব্যাপারটার দখল নিতে এগোচ্ছেন।
বিশ্বরূপদা বলল, “ঈপ্সিতার ইনিশিয়েটিভের একটা নিউজ বেরোবে। যেখানে কোথাও ধ্রুব বাগচীর নাম মেনশন থাকবে না। এখানে আপনার আপত্তিটা কোথায় সেটাই তো বুঝতে পারছি না।”
ধ্রুব বাগচী বললেন, “আপনি এতটাও মাথামোটা নন বিশ্বরূপ।”
বিশ্বরূপদা বলল, “আমি আপনাকে কথা দিতে পারছি না ধ্রুব। আমি অফিসে ফিরি। একটু ভাবনা চিন্তা করে নাহয় আপনাকে জানাই?”
ধ্রুব মানালির দিকে তাকালেন, “আপনি প্রেম করেন? উত্তর দিতে না চাইলে দিতে পারেন, জাস্ট আস্কিং।”
মানালি দুদিকে মাথা নাড়াল।
ধ্রুব বললেন, “কেন করেন না?”
মানালি বলল, “সেসব নিয়ে ভাবার সময় নেই।”
ধ্রুব বললেন, “ঈপ্সিতা সম্পর্কে আপনার ধারণা কী? সংক্ষেপে বলুন।”
মানালি বলল, “খুব পারসোনালিটি আছে। চোখগুলো অসম্ভব সৎ। আপনার মতোই সিনেমা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা আছে। বারে বারে মনে হয়েছে আপনারা মেড ফর ইচ আদার কাপল।”
ধ্রুব সোফায় পা তুলে বসলেন, “কতক্ষণ ছিলেন?”
মানালি বলল, “দুপুরটা।”
ধ্রুব বললেন, “দু ঘণ্টা খুব বেশি হলে?”
মানালি বলল, “হ্যাঁ।”
ধ্রুব বললেন, “এইটুকু সময়ের মধ্যে আপনারা দশ পাতা প্রতিবেদন রেডি করে বসে আছেন। তাই তো?”
মানালি মাথা নাড়ল, “না, এখনও লেখা শুরু হয়নি।”
ধ্রুব বললেন, “সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিটা লোকের কাজ কী বলুন তো? ইমেজ বিল্ডিং করা। প্রতিটা সেকেন্ডে, প্রতিটা মুহূর্তে লোকটা চারদিকের লোকজনকে জানান দিয়ে চলেছে যে সে কত ভালো। কত সৎ। সে আসলে একজন সুপারম্যান, ছদ্মবেশে সাধারণ মানুষের ছদ্মবেশে বেঁচে আছে। বাস্তব জীবনে গিয়ে বোঝা যায় আসল পার্থক্যটা। ঈপ্সিতা ফেসবুক করে না। সোশ্যাল নেটওয়ার্কে নেই। কিন্তু শি ইজ অনেস্ট। ইমেজ বিল্ডিং করার দায় ওর নেই। রূপনারায়নপুরে ওর সঙ্গে অনেকেই আছে যারা এই কাজটার সঙ্গে যুক্ত। আপনার মনে হয় না, সবাইকে বাদ দিয়ে শুধু ওকে নিয়ে লিখলে ব্যাপারটা মারাত্মক বায়াসড হয়ে যাবে? আপনার কি মনে হয় ঈপ্সিতা সেটা দেখলে খুশি হবে?”
