দীপ বলল, “সে তো অন্য কথা বলছে। ওর ফাঁকা ফ্ল্যাটে নাকি ও তোমাকে নিয়ে যেত?”
চিত্রলেখা ফোনটা কেটে দিল। দীপ খানিকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকল।
ফোনটা খাটের ওপর রেখে ডাইনিং রুমে গেল। ঠোঙার ভেতর থেকে একটা শিঙাড়া নিয়ে আবার ঘরে এল। বাবা দুটো শিঙাড়া নিয়ে টিভি দেখতে বসেছে। মা বাড়ি নেই। থাকলে বাবাকে কিছুতেই শিঙাড়া খেতে দিত না।
দীপ ঘরে এসে দেখল হোয়াটসঅ্যাপে ঋতি মেসেজ করেছে, “হাই। কী করছ?”
দীপ লিখল, “জাস্ট ফিরলাম। তুমি ফিরেছ?”
ঋতি— ক্যাবে।
দীপ— ওকে।
ঋতি— তুমি জানো, একটা কথা মনে হচ্ছে।
দীপ— কী?
ঋতি— এতদিন মনে হচ্ছিল কবে নতুন দেশ দেখব, এতদিন খুব এক্সাইটেড ছিলাম। আজ হঠাৎ করে কেন জানি না খুব মনখারাপ করছে।
দীপ— ??
ঋতি— যদি বলি একজনের সঙ্গে মিট করার পর থেকে?
দীপ— কার সঙ্গে?
ঋতি— আছে একজন। ম্যাজিক জানে। আমার বাবাকে কবজা করে ফেলেছে। বাবা আমাকে ফোন করে তার নামে একগাদা সার্টিফিকেট দিয়ে দিয়েছে।
দীপ— কী রকম?
ঋতি— অনেক রকম। ১) এই জেনারেশনের ছেলে হলেও অত্যন্ত ভদ্র, সভ্য, ২) এই জেনারেশনের ছেলে হয়েও গুরুজনদের রেসপেক্ট করতে জানে… আরও কী কী সব…
দীপ— বাহ। ছেলেটা দারুণ লাকি তো! এত সুন্দরী একজনের বাবা এত ভালো ভালো কথা বলেছে। হি মাস্ট সেলিব্রেট টুডে।
ঋতি— অ্যাবসোলিউটলি। উইকেন্ডে ছেলেটার দাওয়াতের ফোন আসতে চলেছে আজ রাতের মধ্যেই। ছেলেটা কি উইকেন্ডে ফ্রি থাকবে?
দীপ ফোনের দিকে তাকিয়ে হাসল। লিখল, “থাকবে। তবে মনে হয় ছেলেটা মেয়েটার সঙ্গে একা দেখা করতে বেশি আগ্রহী থাকবে। জাস্ট গেস।”
ঋতি— তাই নাকি?
দীপ— হ্যাঁ।
ঋতি— কিন্তু বাবা যে ছেলেটার সঙ্গে দেখা করতে চায়, তার কী হবে?
দীপ— নিশ্চয়ই করবে। অবশ্য ছেলেটা আর মেয়েটা তো কালকেও দেখা করতে পারে। অফিস থেকে বেরিয়ে।
ঋতি— তা পারে। বাই দ্য ওয়ে, আমার আবার একটা কথা মনে হচ্ছে।
দীপ— কী?
ঋতি— এত তপস্যার পর ছেলেটা ভার্জিন হইয়া রহিল, এখন কি তবে তপস্যাভঙ্গের জন্য ছেলেটি ব্যাকুল হইয়া গেল?
দীপ কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। একটু হেসে সে লিখল— তপস্যাভঙ্গ হইবার তো কোনও রকম লক্ষণ দেখা যাইতেছে না। কন্যা সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হইয়া গেলে ছেলেটি আর কী করিবে?
ঋতি বেশ কয়েকটা হাসির স্মাইলি দিয়ে লিখল— দু পক্ষেরই কষ্ট। অতঃপর দীর্ঘশ্বাস এবং বিচ্ছেদ।
দীপ— বাই দ্য ওয়ে, ছেলেটির ভার্জিনিটি নিয়ে মেয়েটি এত চিন্তিত কেন জানতে পারি?
ঋতি— নাহ। থাক। দীর্ঘশ্বাস এবং বিচ্ছেদ অবধিই ঠিক আছে হয়তো।
দীপ— ট্রাজেডি শেক্সপিয়ারের লেখায় আর আশিকি টু-এর গল্পেই হয়। মেয়েটা সম্ভবত সেটা জানে না।
ঋতি— রিয়েলি? সত্যিই জানে না। তা কী রকম কমেডির প্যাকেজ ছেলেটা অফার করে শুনি?
দীপ— এই মাঝেসাঝে দেখা, সুখ দুঃখের গল্প করা, দু-চারটে ভাসমান চুম্বন, দু-চারটে ভালবাসার কথা।
ঋতি— চুম্বন? বাহ, বাহ। ছেলেটি দেখছি সাহসীও বটে!
দীপ— দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে বেড়ালও সাহসী হয়ে যায়, ছেলেটা তো তবু মানুষ!
ঋতি— তাই নাকি? তা কেমন দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেল ছেলেটির? জানতে পারি?
দীপ— এত যুগ পরে একজন মনের মানুষ মেলার পর মেয়েটি যদি বলে দীর্ঘশ্বাস এবং বিচ্ছেদ, তবে কি ছেলেটির দেওয়ালে পিঠ না ঠেকা ছাড়া কোনও উপায় আছে?
ঋতি— হুউউউ… ছেলেটি তবে ভাসমান চুম্বনেই সন্তুষ্ট?
দীপ উত্তর না দিয়ে কয়েকটা হাসির স্মাইলি দিল।
ঋতি— ছেলেটা খুব ভদ্র। মেয়েটির বাবা ঠিকই ধরেছিল তবে।
দীপ— সেটা হওয়া ছাড়া আর তো অপশন নেই কোনও।
ঋতি— ফরচুন ফেভারস দ্য ব্রেভ। ছেলেটা জানে না বোধহয়।
দীপ উত্তর দিতে যাচ্ছিল এমন সময় ফোনটা বেজে উঠল, চিত্রলেখা। দীপ ধরল, “হ্যালো।”
ওপাশ থেকে চিত্রলেখার থমথমে গলা শোনা গেল, “অন্যের কথা শুনে আমার বিচার করে নিলে?”
দীপ বলল, “আমার টায়ার্ড লাগছে, আমি পরে কথা বলি?”
চিত্রলেখা বলল, “লাগুক টায়ার্ড। আমি আমার প্রশ্নের উত্তর চাই।”
দীপ বলল, “কী করে বলি বলো তো? আমার তো আর টাইম মেশিন নেই যে তোমার পাস্টে গিয়ে দেখে আসব তুমি সত্যি বলছ না ছেলেটা সত্যি বলছে, তাই না?”
চিত্রলেখা বলল, “দেখতে হবে না। ইটস ওকে। তবে একটা কথা বলতে পারি, আমি হয়তো একটু ন্যাগিং, একটু ইনসিকিওর, কিন্তু আমি মিথ্যেবাদী নই। পরের মুখে ঝাল খেলে তুমি। বেশ। তবে এখানেই সব কিছু শেষ হোক। ভালো থেকো।”
দীপ কোনও উত্তর না দিয়ে ফোনটা কেটে দিল। স্বস্তি লাগছিল খানিকটা। ঋতির সঙ্গে ফ্লার্ট করার সময় একরকম গিল্টি ফিলিংস হচ্ছিল। সেটা এবারের পর থেকে আর হবে না হয়তো।
ফোনটা রাখতেই তার ফোনটা আবার বেজে উঠল। দীপ চমকে দেখল ঋতি ফোন করছে। সে ধরতেই ওপাশ থেকে ঋতি বলল, “কী ব্যাপার, ছেলেটা বিজি হয়ে গেল হঠাৎ করে?”
দীপ হাসার চেষ্টা করল, “আর বোলো না। অফিস থেকে ফোন এসেছিল।”
—হুঁ… আই নো। আমারও সেম কেস। অফিসের জ্বালায় বাড়ির কাজ করাও মাথায় ওঠে।
—একজ্যাক্টলি, বাড়ি ফিরলে?
—এই তো বাড়ির সামনের রাস্তায়। আর পাঁচ মিনিট। আমি একটা কথা ভাবছিলাম।
—কী?
—আজ সকালে বাড়ি থেকে বেরনোর সময়েও ভাবিনি, এমন কারও সঙ্গে দেখা হবে যার সঙ্গে কথা হলে মনে হবে কেউ যেন ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে ভায়োলিন বাজাচ্ছে, বাতাসে মোহাব্বতে ব্র্যান্ড পাতা ঘুরে বেড়াবে, মিস্টার দীপ সুপুরুষ মহাশয়, আপনি কি ম্যাজিক জানেন?
১৮
“কিছু মানুষ আছে, যারা কেচ্ছা ঘাঁটতে ভালোবাসে। তাদের কী বলে জানেন?”
