আমি বললাম, “বললাম তো! পুরো বিছুটিপাতা।”
কথা শেষ হল না, আমার ফোন বাজতে শুরু করল। দেখলাম বউ। ঈশানকে বললাম, “এই দেখ, শয়তানের নাম নিলাম না, শয়তান হাজির।”
ঈশান বলল, “ধর ধর, কী বলে দেখ।”
আমি ফোন তুললাম, “হ্যালো।”
ওপাশ থেকে বউয়ের রাগি গলা ভেসে এল, “এই, তুমি ডরম্যান্ট অ্যাকাউন্টের ইউজার আইডি পাসওয়ার্ড দিয়েছ কেন?”
আমি বললাম, “মানে?”
বউ বলল, “তোমার অ্যাকাউন্টে পঁচাশি টাকা পড়ে আছে। ক্যা করেঙ্গে হাম ইতনে ধনরাশি সে? যে অ্যাকাউন্টে টাকা আছে, সে অ্যাকাউন্টের ইউজার নেম, পাসওয়ার্ড দাও।”
আমি বললাম, “আমার এই একটাই অ্যাকাউন্ট। আমার টাকা নেই তো! এরকমই টাকা থাকে। নেহাতই গরিব আদমি আমি।”
বউ বলল, “তোমার সাহস তো কম না! পঁচাশি টাকা অ্যাকাউন্টে নিয়ে তুমি আমাকে বিয়ে করতে গিয়েছিলে?”
আমি বললাম, “আমি কোথায় তোমাকে বিয়ে করতে গেছিলাম! আমি তো খাসি খেতে গেছিলাম। অমলকান্তি রোদ্দুর না হয়ে রোদ্দুর রায় হয়ে গেল বলেই তো আমাকে বিয়ে করতে হল।”
বউ বলল, “তোমার সঙ্গে বিয়ে করা আমার ভুল হয়ে গেছে।”
আমি বললাম, “হ্যাঁ, আর আমি তো ঐতিহাসিক ঠিক করেছি তোমাকে বিয়ে করে। এত ভালো সিদ্ধান্ত আর কিছু হতেই পারে না।”
বউ বলল, “শাট আপ। তুমি জানো আমার জন্য কত ছেলে পাগল?”
আমি বললাম, “স্বাভাবিক। তোমার এক কিলোমিটার রেডিয়াসে কোনও সুস্থ মানুষ থাকাই সম্ভব না।”
বউ রেগে গেল, “এই তুমি এরকম টিজ করে করে কথা বলছ কেন? খুব সাহস দেখছি তোমার!”
আমি বললাম, “আমার সাহসের কিছু নেই। বিয়ে করেছ, বাড়ি চলে গেছ। আমার কী? আমার তো কিছু করার নেই।”
বউ বলল, “আমি সিদ্ধান্ত চেঞ্জ করেছি। বিয়ে করেছি যখন সংসার করব। হানিমুনে যাব। আজ রাতেই নিয়ে যাবে আমাকে।”
আমি খাবি খেলাম, “মানে? হানিমুনে যাবে আবার কী? তুমি তো বাড়ি চলে গেছ!”
বউ বলল, “বললাম তো ডিসিশন চেঞ্জ করেছি। দার্জিলিং যাব। টিকিট কাটো। রাতে যাব।”
আমি বললাম, “ওভাবে হয় নাকি? ছুটি নেই, টাকা নেই। কোত্থেকে পাব সব?”
বউ বলল, “আমি কী জানি? জোগাড় করো। আমি হানিমুনে যাব আজ। আমার বাড়িতে ভাল্লাগছে না। মা সারাক্ষণ ইনিয়েবিনিয়ে কেঁদে কানের মা-মাটি-মানুষ করে দিচ্ছে। এখানে থাকলে আমি পাগল হয়ে যাব। দার্জিলিং নিয়ে চলো। রেডি হয়ে থাকব। নিয়ে যাবে। রাখলাম।”
বউ ফোনটা কেটে দিল।
ঈশান পাশে আগ্রহ নিয়ে শুনছিল। ফোন রাখতেই ঝাঁপিয়ে পড়ল, “কী রে, কী হল?”
আমি ভ্যাবাচ্যাকা গলায় বললাম, “পাগল করে দে মা, লুটেপুটে খাই। হাজার তিরিশেক টাকা ধার দে ভাই। আমি শ্যাষ!”
১৭ অমৃত
আমাকে যদি প্রেম নিয়ে এসে লিখতে দেওয়া হয়, আমি এখন চৌরাস্তায় একটা চেয়ারের ওপর দাঁড়িয়ে প্রেম নিয়ে এসে লিখতে পারব।
প্রেম নিয়ে একটা টলিউডি গান আছে “প্রেম কী বুঝিনি আগে তো খুঁজিনি, আজ কী হল রে আমার।”
বিষয়টা টালিগঞ্জের গান বলেই একবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। সিরিয়াসলিই প্রেম যে কী আগেভাগে বোঝা সম্ভব নয়। যখন আসে, তখন এক্কেবারে মাইক টাইসনের মতো বুকে মুখে পিঠে ঘুসি মেরে নিজের অস্তিত্ব বোঝাতে শুরু করে দেয়।
আত্রেয়ীর কথাই ধরি। যখন আসেনি, আসেনি। কিন্তু যখন এল, তখন সারাক্ষণ মনে হতে শুরু করল কেন ও আমার সামনে বসে নেই? কেন আমাকে সারাক্ষণ রিপ্লাই করবে না? কেনই বা অন্য লোকের সঙ্গে কথা বলবে?
প্রেম নিয়ে একটা পাই চার্ট বানাতে গেলে দেখা যাবে প্রেমের তিনভাগ ভালোবাসা, একভাগ অধিকারবোধ। টিনএজ প্রেমে অধিকারবোধ বেশি থাকে। আমি টিনএজ নই। চাকরি পেয়েছি, বাড়ি থেকে বিয়ের কথা হচ্ছে আর এই সময় আত্রেয়ীর সঙ্গে আলাপ হয়েছে। তবু আমার টিনএজ পাবলিকের মতো ভীষণ প্রেম পায়। প্রেম পেলে কথা ছিল, আমার চুমুও পায়।
একটা কথা আছে, এ শহরে রাস্তাঘাটে হিসিতে কেস নেই, কিসিতে কেস আছে। তবু আমরা চুমু খেয়েছি। বৃষ্টি পড়ছিল, চুমু খাওয়ার পর লক্ষ করেছি ট্রাফিক পুলিশ আমাদের দিকে বড়ো বড়ো চোখ করে তাকিয়ে আছে। আত্রেয়ী ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “দেখেছ, এবার যদি জেলে নিয়ে যায়?”
আমি ওর হাত শক্ত করে ধরে বলেছি, “কেউ কোথাও যাবে না।”
পুলিশ আমাদের দিকে তাকিয়েছে। তারপর রাস্তা পরিচালনার কাজে ব্যস্ত হয়ে গেছে। সম্ভবত নিজেও প্রেম করেই বিয়ে করেছিল। প্রেম করে বিয়ে করা লোকজন কি বাকিদের প্রতি খানিকটা সফট হয়? কে জানে! হলে তো ভালোই। তাহলে একটা লিস্ট করা যেতে পারে শহরের কোন কোন ট্রাফিক পুলিশ প্রেম করে বিয়ে করেছিল। সেক্ষেত্রে তাদের সামনে চুমু খাওয়া যেতে পারে। অবশ্য শহরে তো শুধু পুলিশ থাকে না, মরাল পুলিশও থাকে। পৃথিবীর সব ফ্রাস্ট্রেশন বুকে নিয়ে যারা জন্মগ্রহণ করে। কেন চুমু খেলে, কী কারণে চুমু খেলে, এদের এত প্রশ্ন জীবনে!
অবশ্য আত্রেয়ী আমাকে অনুযোগের সুরে বলেছে, “তুমি ভারী ইয়ে। যেখানে সেখানে গাড়ি দাঁড় করিয়ে চুমু খাও কেন?”
আমি মাথা চুলকে বলেছি, “আচ্ছা, তাহলে কয়েকটা পয়েন্ট ঠিক করো। সেখানে সেখানেই খাব। ব্যাপারটা তাহলে আর যেখানে সেখানে হবে না।”
আত্রেয়ী হেসে ফেলেছে। আমার পিঠে ঘুসি মেরে বলেছে, “বদমাইশ।”
আত্রেয়ী যখন এই শব্দটা বলে, মনে হয় গোটা পৃথিবীটা ওর সামনে নামিয়ে রাখি। একটা শব্দ একজনের মুখে শুনতে এত ভালো লাগে?
