বিশ্বরূপদা বলল, “ওকে, ফাইন। পেজ থ্রিতে আনতে হবে না।”
মানালি অবাক হল, “মানে? স্টোরিটা না করলেও চলবে?”
বিশ্বরূপদা বলল, “আমার কথার মানে কি তাই দাঁড়াল?”
মানালি বলল, “তাহলে কী দাঁড়াল?”
বিশ্বরূপদা বলল, “বললাম পেজ থ্রি নিউজ করব না। পেজ ফাইভ বা সিক্সে করলাম। ফ্রন্ট পেজেও করা যায়। হেডলাইন হবে নিভৃত সমাজকর্মী। কলকাতা থেকে দূরে এক অর্থনৈতিক ভাবে কোমর ভেঙে যাওয়া অঞ্চলের মানুষের শিক্ষার জন্য কাজ করছেন এক মহীয়সী নারী। লেটস মেক হার আ সেলিব্রিটি। সেটা করলে তো ব্যাপারটা আনএথিকাল হবে না? কী বলিস?”
মানালি বলল, “তুমি বলবে না ভদ্রমহিলা ধ্রুব বাগচীর স্ত্রী?”
বিশ্বরূপদা বলল, “না। বলব না। তাহলে হবে? এথিক্সে খোঁচা-টোচা লাগবে না তো?”
মানালি একটু থমকে বলল, “লাগবে না হয়তো। তবু ভদ্রমহিলা সেক্ষেত্রেও রেগে যেতে পারেন। তেমন কোনও সলিড গ্রাউন্ড কি আছে? অনেক হেডমাস্টার হেডমিস্ট্রেসই রাজ্যে আছেন যাঁরা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া অঞ্চলে কাজ করেন। তাহলে তো তাঁদের নিয়েও স্টোরি করতে হয়।”
বিশ্বরূপদা বলল, “সলিড গ্রাউন্ড এটসেট্রা রাবিশ ব্যাপার। নিউজপেপার কাকে কখন তুলবে, কাকে ছুড়ে ফেলবে, সেসব তোর বোঝার কথা না। স্পটলাইটটা ফেলার কায়দা জানতে হবে। তুই স্টোরিটা বানা। যতটা পারিস মশলাবর্জিত, আবেগসর্বস্ব স্টোরি বানা। আমি তারপর দেখছি কী করা যায়।”
মানালি বলল, “ওকে। গুড নাইট।”
বিশ্বরূপদা বলল, “গুড নাইট। আর শোন, কাল ওয়ার্ক ফ্রম হোম করতে চাইলে করতে পারিস। আজকের জার্নিটা খুব হেকটিক ছিল শুনলাম।”
মানালি বলল, “না না, কাল যাব। বাড়িতে থাকলে খবর হয়ে যাব আমি।” মানালি আড়চোখে দেখল মা টিভি চালিয়েছে।
বিশ্বরূপদা হাসল, “পালিয়ে পালিয়ে কিন্তু কোনও কিছু হয় না। তার মানে তুই এখনও তোর কাজের গুরুত্বটা মাকে বোঝাতে পারিসনি। দেখ, ওয়ার্কিং লেডিদের একটা এক্সট্রা লোড সব সময়েই নিতে হয়, তাদের হোম ফ্রন্ট সামলাতে হয়, অফিসে আমাদের মতো ঝাঁটু বস সামলাতে হয়, দুদিক ঠিকঠাক ব্যালান্স করে তবেই চলতে হয়। তুই যদি একটা দিক এখন থেকেই ইগনোর করতে শুরু করিস, সেক্ষেত্রে তোকে ফিউচারে আরও প্রবলেমে পড়তে হবে। কেউ অবুঝ না কিন্তু। কনভিন্স ইওর মাদার। আই থিংক তোর বাড়ির লোকের সঙ্গেও সময়টা ইকোয়াল ইম্পর্ট্যান্স দিয়ে কাটানো দরকার। এভরিওয়ান ইজ নট অ্যাজ মাচ লাকি অ্যাজ ইউ আর। আমার বাপ মা কেউ বেঁচে নেই। আমার তো মনে হয় আমারও যদি তোর মায়ের মতন একজন এক্সট্রা কেয়ারিং মা থাকতেন তবে খারাপ হত না।”
মানালি বলল, “বুঝতে আমার জায়গায় থাকলে। ওরম মনে হয়।”
বিশ্বরূপদা হাসতে হাসতে বলল, “ওকে। গুড নাইট। যা যা বললাম সেগুলোতে কনসেন্ট্রেট কর।”
মানালি ফোন রেখে প্লেট সিংকে রেখে ঘরে গিয়ে কম্বল গায়ে দিল।
ল্যাপটপটা বিছানাতেই রাখা আছে। খুলতে ইচ্ছা করছিল না।
ফোনটা আবার বাজতে শুরু করেছে।
মানালি দেখল ধ্রুব বাগচী ফোন করছেন।
১৭
অফিসে রিপোর্ট ইত্যাদি সেরে বাড়ি ফিরতে ফিরতে দীপের সন্ধ্যা হয়ে গেল। বাবা বাইরের ঘরে বসে ছিল। তাকে দেখে বলল, “কী খবর?”
দীপ বলল, “খবর ভালো। অফিসের কাজ হল, ঘোরাও হল।”
বাবা বলল, “ব্যস?”
দীপ বলল, “আবার কী?”
বাবা বলল, “ফ্রেশ হয়ে নে। শিঙাড়া আছে। জাস্ট আনলাম নিরুর দোকান থেকে। নতুন খুলেছে দোকানটা। মশলাটা হিং দিয়ে যা বানায় না, জাস্ট ফাটাফাটি!”
দীপ বলল, “আসছি।”
ব্যাগ ঘরে রেখে দীপ বাথরুমে ঢুকল। চেঞ্জ করে বাইরে এসে দেখল চিত্রলেখা ফোন করছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। সারাদিনে তিরিশবারের বেশি ফোন করেছে মেয়েটা। সে যে ইগনোর করতে চাইছে, বুঝতে চাইছে না, নাকি বুঝতে পারছে না?
সে টাওয়ালে হাত মুছে ফোন ধরে হ্যালো বলল।
ওপাশে বেশ কয়েক সেকেন্ড নীরব থাকার পর চিত্রলেখা ধরা গলায় বলল, “আমি কি জানতে পারি, কী হয়েছে ঠিক?”
দীপ বলল, “কিছু হয়নি তো! কেন বলো তো? আমি বিজি ছিলাম সারাদিন।”
চিত্রলেখা বলল, “বিজি ছিলে? একবার ফোন ধরে সেটা বলা যেত না?”
দীপ বলল, “আমি এখনও বিজি। পরে ফোন করছি।”
চিত্রলেখা বলল, “দাঁড়াও। এক মিনিট। আগে বলো আমার দোষটা কী! কী এমন ভুল করেছি আমি যে তুমি এভাবে দূরে দূরে থাকছ?”
দীপ বলল, “তুমি কিছু করোনি। অ্যাকচুয়ালি আমার মনে হচ্ছে তুমি আর আমি ঠিক কম্প্যাটিবল কাপল না। সে কারণেই ডিসাইডেড টু…”
চিত্রলেখা বলল, “কী ডিসাইডেড টু? বলো বলো!”
দীপ বলল, “ছাড়ো। এত কথার কিছু নেই।”
চিত্রলেখা বলল, “তুমি তো কাল রাতেও আমার সঙ্গে ভালো করে কথা বললে। এর মধ্যে কী এমন হল বলো! প্লিজ বলো, আমি জানতে চাই।”
দীপ কয়েক সেকেন্ড থমকে বলল, “তুমি ভার্জিন?”
চিত্রলেখা বলল, “এ কেমন প্রশ্ন?”
দীপ বলল, “তুমি তোমার এক্স-এর সঙ্গে কোনও রকম ফিজিক্যাল রিলেশনশিপে ছিলে কি না?”
চিত্রলেখা কেঁদে ফেলল, “এ কেমন প্রশ্ন করছ তুমি?”
দীপ বলল, “আমি জাস্ট জানতে চাইছি, কিউরিওসিটি।”
বাবা দরজা খুলে বলল, “শিঙাড়াটা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।”
দীপ বলল, “আসছি বাবা, পাঁচ মিনিট।”
বাবা দরজাটা বন্ধ করে চলে গেল।
চিত্রলেখা বলল, “তোমাকে তো কালকেই বলেছি। ও আমাকে ফোর্স করত। আমি বহু কষ্টে আটকাতাম।”
