পরের কথাটা দীপ অনেক কষ্টে আটকাল। সে বলতে যাচ্ছিল এতই যখন আনফরচুনেট ব্যাপারটা তখন ফরচুনেট হয়ে গেলেই হয়। বলতে পারল না।
ঋতি বলল, “আমি জানি না আপনার সঙ্গে এত কথা কেন বলছি, তবে একটা ব্যাপার হল আমার বাবার যাকে ভালো লাগে বলে আমার মনে হয়, আমারও কেন জানি না তাকে ভালো লেগে যায়।”
দীপ বলল, “আপনার বাবার আর কাকে ভালো লাগে?”
ঋতি বলল, “আমাদের পেপারওয়ালা।” বলেই আবার জোরে হেসে ফেলল।
দীপও হাসতে যাচ্ছিল, এই সময় আবার তার পকেট বেজে উঠল।
ঋতি বলল, “ফোনটা ধরুন না। কতবার করে ফোন হচ্ছে!”
দীপ আবার রিংটোন মিউট করে বলল, “আর বলবেন না, জোর করে পলিসি গছাবে। আমার এখন কোনও ইচ্ছা নেই!”
১৬
মানালির বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত সাড়ে দশটা বেজে গেল। মা দরজা খুলে তার দিকে তাকিয়ে বলল, “শীতের রাতে রাস্তায় কুকুর বেড়াল পর্যন্ত বেরোচ্ছে না, এমন চাকরি করা কেন যেখানে এত রাতে ফিরতে হয়?”
মানালি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ওয়াশরুমে ঢুকল। হিমশীতল জলেই হাত মুখ ধুয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে বলল, “খেতে দাও তাড়াতাড়ি। কাল সকাল সকাল উঠতে হবে।”
মা বলল, “দাঁড়া, খাবারগুলো গরম করে নি।”
মানালি বলল, “কী আছে?”
মা বলল, “মাছের ঝোল। আলু ফুলকপির তরকারি।”
মানালি বলল, “শুধু মাছ গরম করো। একটু ভাত দিয়ে খাব শুধু।”
মা গজগজ করতে করতে মাছের পাত্র মাইক্রোওয়েভ ওভেনে ঢোকাল। মানালি বলল, “ফিসফিস করে কী বলছ মা? জোরে জোরে বলো!”
মা বলল, “বলছিলাম শ্বশুরবাড়ি গিয়ে এরকম নবাবি চলবে না। সেটা বুঝিস?”
মানালি বলল, “সেজন্যই তো শ্বশুরবাড়ি যাব না।”
মা রেগে গেল, “কেন? যার সঙ্গে প্রেম করিস, তাকে বিয়ে করবি না?”
মানালি জিভ কাটল। মাকে আরও রাগানোর জন্য বলল, “শ্বশুরবাড়ি থোড়িই থাকব! কে বলেছে শ্বশুরবাড়ি থাকব? লিভ টুগেদার করব তো!”
মা তার দিকে বড়ো বড়ো চোখ করে বলল, “মানে!”
মানালি অনেক কষ্টে হাসি চেপে বলল, “এরকম চমকে ওঠার কিছু নেই মা। দিন পালটাচ্ছে। কনসেপ্ট চেঞ্জ হচ্ছে। তোমাদের সময় ওইসব প্রি-ওয়েডিং ফটোশুট নামের কিছু ছিল? ধাড়ি উড বি-কে কোলে তুলে ফটো তুলছে বর, জিভ বেরিয়ে যাচ্ছে তবু ফটো তোলা বড়ো বালাই। ছিল? দেখেছ?”
মা অবাক হয়ে বলল, “প্রি-ওয়েডিং… কী সেটা?”
মানালি বলল, “প্রি-ওয়েডিং ফটোশ্যুট। বিয়ের আগে স্বামী স্ত্রী ফটো তোলে। আমার এক বন্ধু প্রি-ওয়েডিং ফটোশ্যুটে কায়দা করে হবু বরের সঙ্গে ফটো-টটো তুলে বিয়ের দিন ড্রাইভারের সাথে পালিয়েছে। নে কত আদিখ্যেতা করবি কর!”
মা কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, “এসব কী অলুক্ষুনে কথা বলছিস বল তো? পালিয়েছে মানে কী।”
মানালি বলল, “ওই আর কি! ওইজন্যই তো বলছি বিয়ের থেকে লিভ টুগেদার ভালো এখন। একসঙ্গে থাকো, পোষালে পোষাল, নইলে যে যার রাস্তায় ফিরে যাও। দেখবে দু-তিন বছর পরে কলকাতায় এটাই চলবে।”
মা মাইক্রোওভেন থেকে খাবার বের করে সার্ভ করতে করতে বলল, “যা ইচ্ছা কর, আমি আর কিছু বলব না। তবে বাচ্চা হবার সময় ছেলেটা যখন তোকে ছেড়ে চলে যাবে তখন বুঝবি এইসব আধুনিকতা আসলে কিছু লোক নিজেদের সুবিধার জন্যই বানিয়ে রাখে। কথাই আছে যস্মিন দেশে যদাচার। সেটার অন্যথা হলে সমস্যা বাড়ে।”
মানালি মাছ দিয়ে ভাত মাখতে মাখতে বলল, “লিভ টুগেদার তারাই করে মা, যাদের নিজেদের সম্পর্কের ওপর সবথেকে বেশি বিশ্বাস থাকে। সম্পর্কটা তো কাউকে জোর করে হাতে হাতকড়া পরিয়ে রাখার মতো নয়। সম্পর্কে আইনকানুন তখনই আসে, সালিশি সভা তখনই বসে, যখন সম্পর্কটার বাঁধনটা আলগা হয়ে যায়। আর বাচ্চা হবার সময় কেউ চলে গেলে চলে যাবে। একটা মেয়ে জানে কী করে একটা বাচ্চাকে বড়ো করে তুলতে হয়। তোমার কী মনে হয়, জানে না?”
মা বেশ কিছুক্ষণ মানালির দিকে হাঁ করে তাকিয়ে বলল, “তুই কি সত্যি সত্যি এসব জিনিস করতে যাচ্ছিস? আমায় ছুঁয়ে বল তো!”
মানালি হাসতে হাসতে বলল, “শেষ মিসাইলটা ছুড়েই ফেললে বলো? দেখা যাক কী করি। অত চিন্তা করতে হবে না।”
মা বলল, “চিন্তা করব না? তোরা বাপ মেয়ে মিলে এক-একটা কাণ্ড বাধিয়ে বসে থাকবি, আর মাঝখান দিয়ে আমাকে দৌড়ে মরতে হবে। আমি অতশত জানি না, তুই আমাকে ছুঁয়ে বল এইসব অলুক্ষুনে কাণ্ড তুই কিছুতেই করবি না।”
মা হাতটা তার দিকে এগিয়ে দিল। মানালির রাগ হচ্ছিল। এই সময় তাকে বাঁচাতেই হয়তো ফোনটা সশব্দে বেজে উঠল। মা বলল, “এই নাও, কৃষ্ণের বাঁশি বেজে উঠেছে।”
মানালি দেখল বিশ্বরূপদা ফোন করছে, সে বলল, “মা প্লিজ, চুপ করো, বসো।”
মা রেগেমেগে অন্য ঘরে চলে গেল।
মানালি ফোন ধরল, “বলো।”
“কী রিপোর্ট? ঈপ্সিতা কী বলল?” ওপাশ থেকে গলাটা নির্লিপ্ত শোনাল।
মানালি বলল, “কী আশা করছ?”
বিশ্বরূপদা বলল, “একটা ভালো স্টোরি।”
মানালি বলল, “হবে না।”
বিশ্বরূপদা বলল, “সেন্টু খেয়ে গেলি, তাই তো?”
মানালি বলল, “এথিক্সে আটকাচ্ছে।”
বিশ্বরূপদা বলল, “তাহলে তো আর কিছু বলা যাবে না, মামণির এথিক্সে আটকাচ্ছে যখন! তা এথিক্স বাবাজি কী বলছে শুনতে পারি?”
মানালি মাছের কাঁটা বাছতে বাছতে বলল, “এক ভদ্রমহিলা নিজেকে সব কিছু থেকে দূরে সরিয়ে রেখে একটা ভালো সোশ্যাল সার্ভিস করছেন, মানুষের জন্য কাজ করছেন, তাঁকে এইসব পেজ থ্রিতে আনতে আমি কোনও ভাবেই পারলাম না।”
