মানালি বুঝল আবার কেলো করে ফেলেছে সে। কোনওভাবে সামাল দেবার চেষ্টা করল, “প্লিজ ম্যাম, অনেক দূর থেকে এসেছি, একবারে তাড়িয়ে দেবেন না প্লিজ।”
ঈপ্সিতা কয়েক সেকেন্ড কপালে হাত রেখে বসে বললেন, “কাউকে তাড়িয়ে দেবার ক্ষমতা থাকলে হয়তো অনেক ভালোভাবে জীবনটা কাটাতে পারতাম আমি। তবে অনুগ্রহ করে আমাকে আর কোনও ব্যক্তিগত প্রশ্ন করবেন না। আমারই ভুল। আমি ভেবেছিলাম আমাদের মতো দূরের স্কুলগুলোকে আপনারা স্বীকৃতি দিতে চাইছেন। আমার বোঝা উচিত ছিল, আদতে সেই কেচ্ছা খোঁজাই আপনাদের কাজ।”
মানালি বলল, “ম্যাম, প্লিজ। আমি স্কুলের নিউজটা করব বিশ্বাস করুন। আপনি এভাবে বলবেন না।”
ঈপ্সিতা ঠোঁটের কোণে খানিকটা হাসি এনে বললেন, “সান্ত্বনা দিচ্ছেন?”
মানালি বলল, “না ম্যাম, বিশ্বাস করুন সান্ত্বনা দিচ্ছি না। এই অ্যাসাইনমেন্টটা খানিকটা কৌতূহলবশতই নেওয়া। ধ্রুব বাবু এমন একজন পারসোনালিটি, ওঁর সম্পর্কে আরও কিছু জানতে ইচ্ছা করাটা কি কোনও দোষ বলুন?”
ঈপ্সিতা বললেন, “আপনার তো যা চাওয়ার তা পেয়ে গেছেন। চিন্তা কী? আমাকে যতটা প্রশ্ন করেছেন তার থেকেই কেচ্ছা নেমে যাবে নিশ্চয়ই কিংবা শনিবারের ট্যাবলয়েডের খাদ্য হয়ে যাবে। কী বলেন? সমস্যা আছে?”
মানালি বলল, “ম্যাম, আমি ভেবেই এসেছি আপনাকে সবটা বলেই ইন্টারভিউ শুরু করব। আপনি প্লিজ আমাকে ভুল ভাববেন না। আপনি না চাইলে আপনাকে নিয়ে একটা শব্দও খরচ হবে না আমাদের কাগজে।”
ঈপ্সিতা বললেন, “অনেক দূর থেকে এসেছেন। লাঞ্চ করে বেরিয়ে যান। শীতের দিনে বেশিক্ষণ বাইরে থাকা ঠিক হবে না।”
মানালি বুঝল বারবার ব্যাখ্যা দেওয়ার থেকে একবারে চুপ করে যাওয়া ভালো। সে আর কিছু বলল না।
ঈপ্সিতা উঠে ডাইনিং টেবিলে প্লেটে ভাত বাড়তে বাড়তে বললেন, “দুজনে বেসিনে হাত ধুয়ে নিন।”
মানালি উঠল। ঋপণকে বলল, “চ।”
দুজনেরই খিদে পেয়েছিল। গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত, ডাল, আলুসেদ্ধ, মাছভাজা, মাছের ঝোল।
মানালির টেনশনও হচ্ছিল, আবার চুপচাপ খেয়েও নিচ্ছিল। এত কষ্ট করে আবার কলকাতা ফিরে যেতে হবে বিফলমনোরথ হয়ে, ভাবতেই বড়ো কষ্ট হচ্ছিল তার।
ঈপ্সিতা বেশ যত্ন করে খাওয়ালেন তাদের। একটা কথাও বললেন না ধ্রুব সম্পর্কিত।
খেয়ে উঠে মানালি বলল, “বিশ্বরূপদা খুব বকবেন, স্টোরিটা ফেল হয়ে গেল।”
ঈপ্সিতা বললেন, “আপনাদের বসকে বলতে পারেন, নিজে যা যা দেখেছে, শুনেছে, সেগুলো দিয়ে ভালো স্টোরি হয়। অকারণ একটা বাচ্চা মেয়েকে এতদূর না পাঠালেও পারত।”
মানালি কাঁচুমাচু মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকল।
১৫
“সব কিছুর একটা ব্যাকগ্রাউন্ড স্টোরি থাকে বুঝলে?”
পিছনের সিট থেকে বলে উঠলেন ভদ্রলোক। গাড়ি কৈখালি পেরোচ্ছে। দীপ সামনের সিটে বসেছিল। পিছনের সিটে মেয়েটা মায়ের সঙ্গে ফিসফিস করে কথা বলে যাচ্ছে। মেয়েটার নাম ঋতি। জিন্স আর লাল টপে কিছু লাগছে মেয়েটাকে! দীপ অনেক কষ্ট করে হৃৎপিণ্ডের গতিবেগ স্বাভাবিক করল। নিজের ওপর একটু অবাকও হল সে। গার্লফ্রেন্ড তো আছে! তাহলে কাউকে দেখলে হঠাৎ এরকম হওয়া তো মোটেও কাজের কথা নয়! আর অনেক কষ্ট করেও সে নিজেকে সামলাতে পারছিল না। লুকিং গ্লাসে মেয়েটার দিকে চোখ পড়তেই হার্টফেল হবার চান্স তৈরি হচ্ছিল। সে একটু আশা করেছিল মেয়েটা তার সঙ্গে কথা বলবে, কিন্তু মেয়েটা মায়ের সঙ্গেই ব্যস্ত।
দীপ ভদ্রলোকের কথার উত্তরে বলল, “বুঝলাম না।”
ভদ্রলোক বললেন, “এই যে দ্যাখো না, সিনেমায় দেখায় হিরো সবজিওয়ালার ভ্যান উলটে দিচ্ছে। গাড়ি এসে কোনও দোকানে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু ব্যাপারটার ওপাশটা কেউ আর দেখায় না। হয়তো দেখা গেল সবজিওয়ালার বাড়িতে ছোটো ছোটো ছেলে মেয়ে আছে। তারা বাপের কাছে মাংস ভাত খেতে চেয়েছিল। বাপ হয়তো সবজি বেচেই তাদের জন্য মাংস কিনে নিয়ে যেত। কিন্তু হিরোর লাথি তার ভ্যানে পড়ায় ব্যবসা চৌপাট হয়ে গেল। কিন্তু সেই গল্পটা তো আর আমরা দেখছি না।”
দীপ বলল, “হ্যাঁ, কিন্তু হঠাৎ এই কথা কেন?”
ভদ্রলোক বললেন, “ওই যে, প্রসঙ্গটা হল ব্যাকগ্রাউন্ড স্টোরি। আমাদের দেখা হয়ে যাওয়াটাও যেমন। আমরা ভুবনেশ্বর গেছিলাম আমার মেয়ের জন্য পুজো দিতে। ফ্রন্ট স্টোরিটা হল তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়াটা।”
মেয়ে পাশ থেকে বিরক্ত গলায় বলল, “আহ বাবা। থাক না।”
ভদ্রলোক বললেন, “কেন বলব না? কত ভালো খবর! তুই বিদেশ যাচ্ছিস, এটা আমাদের জন্য কত গর্বের ব্যাপার বল তো?”
মেয়ে আর কিছু বলল না। দীপ বুঝল ভদ্রলোক কন্যাগর্বে গর্বিত। সে বলল, “কনগ্র্যাটস।”
মেয়েটা নিয়মরক্ষার জন্য বলল, “ইউ আর ওয়েলকাম।”
ভদ্রলোক বললেন, “এই আইটি আসার পরে ভারী ভালো ব্যাপার হয়েছে ভাইটি। আমাদের বাড়ির ছেলেমেয়েরা বিদেশ-টিদেশ ঘুরছে। আগে তো একসময় আম্রিকা মানেই ছিল কঠিন ব্যাপার। এখন ব্যাপারটা জল ভাত হয়েছে। আমরাও সন্তানদের কল্যাণে দেশ বিদেশ ঘুরতে পাব। হ্যাঁ রে মা, ওই দেশে ইলিশ পাওয়া যায় তো?”
ভদ্রমহিলা রাগি গলায় বললেন, “তোমার শুধু খাওয়ার কথা। এখন কত কাজ সামনে আর তুমি সেই ইলিশ ভেটকি নিয়ে পড়ে আছ।”
কথার মাঝখানে দীপের মোবাইলটা বেজে উঠল। দীপ দেখল চিত্রলেখা ফোন করছে। রিংটা সাইলেন্ট করে দিল।
