রাস্তাঘাটের হাল খুব একটা ভালো না। মরে যাওয়া কারখানার আবাসনের একটা কোয়ার্টারে তারা পৌঁছোল বেলা বারোটা নাগাদ।
দরজা খুলে ঈপ্সিতা বললেন, “ভিতরে আসুন।”
ঋপণ জুতো পরেই ভিতরে চলে যাচ্ছিল, মানালি ঋপণের হাতে একটা চিমটি কাটল। ঋপণ জিভ কেটে জুতো খুলল।
নিতান্তই মধ্যবিত্ত ঘর। দেওয়ালে একটা সৌরভ আর দ্রাবিড়ের পোস্টার বেখাপ্পাভাবে আটকানো। দেখে বোঝা যাচ্ছে অনেকদিন আগের। তারপরে দেওয়ালটার দিকে কারও বিশেষ নজর পড়েনি।
ঈপ্সিতা বললেন, “বসুন, আমাদের স্কুল নিয়ে স্টোরিটা করতে চেয়েছেন শুনে খুবই খুশি হয়েছি। দুঃখের বিষয় এখন ক্রিসমাসের ছুটি চলছে। নইলে আপনাকে স্কুল ঘুরে দেখাতে পারতাম।”
মানালি একটু ঢোক গিলল। শ্রীপর্ণার থেকেই শুনেছিল ঈপ্সিতা রূপনারায়ণপুরে এক স্কুলের হেডমিস্ট্রেস। প্রথমে ভেবেছিল একবারে ফোন করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেবে। পরক্ষণে তার মনে পড়ে গেছিল বিশ্বরূপদার কথা। সত্যি কথা বলার পরে ভদ্রমহিলা যদি দেখা করতেই না চান তাহলে মহা সমস্যা হয়ে যাবে। আচমকাই তার মাথায় আসে তাদের কাগজের “স্কুল ক্যাম্পাস সরগরম” বিভাগের কথা। প্রথম দিকে সে এই বিভাগে কয়েকটা আর্টিকেলও লিখেছিল। আর বেশি ভাবেনি সে। ফোন করে প্রস্তাবটা দিতে ভদ্রমহিলা বেশ খুশিই হলেন। জানালেন তাদের স্কুল নিয়ে তাঁরা কয়েকজন শিক্ষিকা বেশ ভালোভাবেই লড়ে যাচ্ছেন। স্টোরিটা হলে বরং তাঁরা বেশ খুশিই হবেন।
মানালি বলল, “আপনাদের স্ট্রাগলের কথা বলুন ম্যাম, একটু শুনি।”
ঈপ্সিতা বললেন, “দেখুন, এই এলাকা মূলত গড়ে উঠেছিল কারখানার উপর ভিত্তি করে। একটা সময় এসে কারখানা বন্ধ হয়ে গেল। শুরু হল এলাকাভিত্তিক স্ট্রাগল, যে স্ট্রাগল ভয়াবহ। যাঁরা এই স্ট্রাগল করেননি, তাঁরা কল্পনাও করতে পারবেন না, এককালীন লাভজনক একটা কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে, মাইনে অনিশ্চিত হয়ে গেলে সে এলাকার লোকজনের ওপর কী ভয়ংকর চাপ পড়ে যায়। আমাদের এই শিল্পাঞ্চলেই বহু কারখানা এভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু এখানে…”
ঈপ্সিতা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, মানালি হঠাৎ অধৈর্য হয়ে বাধা দিল, “ম্যাম, আপনি কি এই অঞ্চলের?”
ঈপ্সিতা বোধহয় একটু বিরক্ত হলেন, কিন্তু সেটা প্রকাশ না করে বললেন, “হ্যাঁ। আমার বাবা এখানে কাজ করতেন। হিসেবমতো আমাদের এখান থেকে চলে যাওয়ার কথা, কিন্তু যাব যাব করেও থেকে গেলাম স্কুলটার জন্য।”
মানালি বলল, “আপনি বিয়ে করেছেন?”
ঈপ্সিতা অবাক হয়েও নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “হয়েছিল। পরে বিচ্ছেদ হয়ে যায়।”
মানালি একটু অপ্রস্তুত হবার ভান করে বলল, “খুব দুঃখিত ম্যাডাম, কৌতূহলবশত সীমাটা পেরিয়ে ফেললাম, প্লিজ কিছু মনে করবেন না।”
ঈপ্সিতা বললেন, “আচ্ছা। ঠিক আছে।”
এক বয়স্ক ভদ্রলোক ঘরে এলেন, ঈপ্সিতা বললেন, “পরিচয় করিয়ে দি, আমার বাবা।”
মানালি হাত জোড় করল। ঈপ্সিতা বললেন, “বাবা তুমি একটু বিশ্রাম নাও। আমি ওঁদের সঙ্গে একটু কথা বলে আসছি।”
ঈপ্সিতার বাবা কয়েক সেকেন্ড তাদের দেখে ঘরের ভিতর প্রবেশ করলেন।
ঈপ্সিতা বললেন, “আমাদের স্কুলের ব্যাপারে আপনারা এতটা জানলেন কী করে জানতে পারি?”
মানালি হাসার চেষ্টা করল, “ম্যাম, আমাদের কাজ তো সেটাই। কোথাও ভালো কোনও কাজ হলে সেটা মিডিয়া জানবে না তা তো হয় না। আমাদের চিফ এডিটর বিশ্বরূপদা খুব জোর দেন এই ব্যাপারগুলোয়। বলেন শুধু কলকাতায় বসে থাকলে হবে না, জেলায় জেলায়… ”
ঈপ্সিতা ভ্রূ কুঁচকে মানালির দিকে তাকিয়ে বললেন, “বিশ্বরূপ… আপনাদের কাগজে…”
মানালি বুঝল ঈপ্সিতা বিশ্বরূপকে চেনেন। সে খানিকটা মরিয়া হল, “আপনি চেনেন বিশ্বরূপদাকে?”
ঈপ্সিতার মুখে একটা হাসি এসেই মিলিয়ে গেল, “না, সেরকম কিছু না। আচ্ছা আপনি কন্টিনিউ করুন।”
মানালি বলল, “বিশ্বরূপদা খুব ভালো মানুষ। শিল্প সাহিত্যের অনুরাগী। এই তো কদিন আগেই আমাদের সবাইকে ধ্রুব বাগচীর ডার্ক লাভ দেখাতে নিয়ে গেছিলেন নন্দনে। কোন কাগজের এডিটর এরকম স্টাফেদের নিয়ে সিনেমা দেখতে যান বলুন ম্যাম?”
ঋপণ হাঁ করে মানালির দিকে তাকিয়ে কিছু বলবে বলবে করে ভেবেও চুপ করে গেল।
ঈপ্সিতা মানালির কথা শুনে কয়েক সেকেন্ড মানালির দিকে তাকিয়ে বললেন, “ওহ, আপনারা ডার্ক লাভ দেখেছেন? সিনেমাটা কেমন লেগেছে আপনাদের?”
মানালি বুঝল তার উইকেট লক্ষ্য করে একটা হাফভলি আসছে। ঠিকঠাক খেলতে পারলে বল বাউন্ডারির বাইরেও যেতে পারে, অল্পক্ষণের জন্য মনঃসংযোগ সরে গেলে উইকেট খুইয়ে ফেলার সুযোগও আছে। সে ধ্রুব বাগচীর প্রশংসা করাই মনস্থ করল, “আমার তো খুব ভালো লেগেছে। সব অডিয়েন্সের জন্য না অবশ্য।”
ঈপ্সিতা জানলার দিকে তাকিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে বললেন, “মাস আর ক্লাস নিয়ে এ দেশটা খুব মোটা দাগে দুভাগে ভাগ হয়ে আছে। সিনেমা চলা না-চলার ওপরে ভিত্তি করে যে দেশে কোন সিনেমা ভালো কোন সিনেমা খারাপ নির্ধারিত হয়, সে দেশে সিনেমার আদতে কোনও ভবিষ্যৎ নেই।”
মানালি চমৎকৃত হল। কথাগুলো যেন ধ্রুবই বললেন!
মানালি আর পারল না। বলে বসল, “আপনাদের ডিভোর্সটা কেন হল?” বলেই বুঝল কপালে আবার ঝাড় নাচছে তার।
ঈপ্সিতা চমকে মানালির দিকে তাকালেন। তারপর ঋপণের দিকে। বললেন, “আমার… আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল যখন আপনি বিশ্বরূপের কথা বললেন…”
