দীপ পরিষ্কার দেখতে পেল ভদ্রলোকের পায়ে ভদ্রমহিলা একটা চিমটি কাটলেন। ভদ্রলোক চুপ করে গেলেন। ভদ্রমহিলা তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনার বাড়ি কোথায়?”
দীপ বলল। ভদ্রলোক খুশি হয়ে বললেন, “ওহ, সাউথ! আমরাও তো ওদিকেই থাকি।”
ভদ্রমহিলা বললেন, “ওঁর কথায় কিছু মনে করবেন না ভাই, ও খুব খেতে পছন্দ করে।”
দীপ বলল, “তা আমিও।”
ভদ্রলোক খুশি হয়ে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “সবাই তো আর তোমার মতো পেটরুগি না। হুহ। খাবার কথা বললেই ওনার যত কথা!”
ভদ্রমহিলা বললেন, “তা তো বলবই। মাঝরাতে উঠে যখন বলো, ওগো আমার শরীর খারাপ লাগছে, তখন তো আমাকেই সামাল দিতে হয়।”
দুজনের প্রেমালাপের শব্দ একটু বেড়ে গেছিল। দীপ দেখল আশেপাশের সিট থেকে সবাই কৌতুকচিত্তে তাদের সিটের দিকেই তাকিয়ে আছে।
ভদ্রলোক দমবার পাত্র নন, বললেন, “গ্যাস জিনিসটাই এমন। রিলিজ হয়ে গেলেই তো সব ঠিক হয়ে যায়। তুমি একটু বেশিই চিন্তা করো।”
ভদ্রমহিলা গজগজ করতে করতে চুপ করলেন। এয়ারহোস্টেসদের চলন্ত টেবিল তাদের সিটের কাছে চলে এসেছিল। ভদ্রমহিলা বললেন, “নাও, যা পারো খাও।”
ভদ্রলোক প্রবল উৎসাহে তিনটে স্যান্ডউইচ অর্ডার করলেন। দীপকে একটা এগিয়ে দিলেন। দীপ আঁতকে উঠে বলল, “না না, আমি খাব না।”
ভদ্রলোক খেতে শুরু করে দিয়েছিলেন। চিবোতে চিবোতে বললেন, “ওরম বলে না। খেয়ে নিন ভাই, না খেলে জগন্নাথ পাপ দেবে।”
অগত্যা দীপ স্যান্ডউইচে কামড় দিল। তার মজা লাগছিল। এ ধরনের পাবলিক ট্রেনে প্রচুর দেখা যায়। প্লেনে উঠলে লোকে অনেক ধরনের কায়দা করার চেষ্টা করে। ভদ্রলোকের সেসব বালাই নেই।
ভদ্রলোক খেতে খেতে বললেন, “ফেলু মোদকের মোহিনী খেয়েছ ভাই? আমি তুমি বলছি। বেশিক্ষণ আপনি বললে আমার অ্যাসিডিটি হয়। তা ছাড়া তুমি আমার থেকে অনেক ছোটোও বটে।”
দীপ মাথা নাড়ল, “একেবারেই কোনও সমস্যা নেই। মোহিনীটা কী বস্তু?”
ভদ্রলোক বললেন, “দেবভোগ্য জিনিস। স্বয়ং স্বর্গের দেবদেবীরা খান। এখন খানিকটা আমাদের জন্য প্রসাদ পাঠাচ্ছেন। কুড়ি টাকা দাম। এই ছোট্ট মিষ্টি। ঠিক হাফটুকু নিয়ে মুখে পুরবে। দেখবে গোটা মুখে নতুন গুড় ফুল ফোটাচ্ছে। বুঝছ কী বলছি?”
দীপ বলল, “হ্যাঁ। মিষ্টি তার মানে?”
ভদ্রলোক বললেন, “শুধু মিষ্টি না। এ অন্য লেভেলের জিনিস। বাড়ি গিয়েই বেরোতে হবে।”
ভদ্রমহিলা বললেন, “কোথাও বেরোবে না, আগে ব্লাড সুগার টেস্ট করাবে কাল, কতটা নেমেছে দেখব, তারপরে দেখা যাবে।”
ভদ্রলোক মুখে একরাশ বিরক্তি ফুটিয়ে বললেন, “ওই শুরু হল খাদ্যপুলিশের উৎপাত। এদের জ্বালায় যদি কিছু শান্তিমতো করা যায়। এটা কোরো না, ওটা কোরো না, এটা খেয়ো না, ওটা খেয়ো না, মহা জ্বালা হয়েছে।”
দীপ ঘড়ির দিকে তাকাল। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই কলকাতা পৌঁছে যাবে। এয়ারপোর্ট থেকে নেমে একটা ক্যাব নিয়ে অফিস রওনা দিতে হবে। ভদ্রলোককে মন্দ লাগছিল না। বেশ মজাদার কথাবার্তা।
ভদ্রলোক বললেন, “তুমি কোন অফিসে চাকরি করো ভাই?”
দীপ তাদের কোম্পানির নাম বলল। ভদ্রলোক বললেন, “আইটি। ওরে বাবা। ভয়ানক ব্যাপার। ছেলেপিলে খাবে কখন, ঘুমাবে কখন? সারাক্ষণ কাজ কাজ আর কাজ।”
দীপ হাসল, “সবটা তাই না। আমরা খাওয়াদাওয়ার সময়টা পাই ঠিকই, তবে বাকিদের তুলনায় কম এই আর কি!”
ভদ্রলোক বললেন, “জানি জানি, আমার মেয়েও তো একই কেস। ছুটি পর্যন্ত পেল না জানো, একটু ঠাকুরের দর্শনটা হয়ে যেত। এই তো তোমাদের ওদিকেই ওর অফিস। এন কে জি টেকে আছে।”
দীপ বলল, “ওহ। হ্যাঁ, ছুটিছাটা হঠাৎ করে নেবার ক্ষেত্রে একটু চাপ তো থেকেই যায়।”
ভদ্রলোক বকবক করতে লাগলেন। দীপ চোখ বন্ধ করে বসল। গোটা রাস্তায় প্লেন খুব একটা এয়ারপকেটে পড়ে অসভ্যতা করেনি। ঠিকঠাকই ছিল জার্নিটা।
কিছুক্ষণ পরেই কলকাতা শহরটার আকাশে প্রবেশ করল তারা। ধীরে ধীরে ল্যান্ড করার প্রস্তুতি নিচ্ছে সবাই। ভদ্রলোক কপালে হাত দিয়ে জয় জগন্নাথ বলে যাচ্ছিলেন। প্লেনের চাকা এয়ারপোর্টের মাটি স্পর্শ করার পর ভদ্রলোক কপালে হাত দিয়ে প্রণাম সেরে বললেন, “আরও কিছুদিন ধরাধামে থাকব তাহলে। যাক!”
দীপ অনেকক্ষণ পরে হাসল। তারও ভালো লাগছিল। প্লেনের দরজা খুলতেই হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। সে ধীরে সুস্থে নামল। ফোন অফ ছিল, সেটাকে অন করল।
চিত্রলেখার একগাদা হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ এসে জড়ো হয়েছে। সেসব দেখে তার হঠাৎই বিরক্তি শুরু হল।
সে লাগেজ নিতে লাগেজ বেল্টের কাছে পৌঁছে দেখল ভদ্রলোক হাঁফাতে হাঁফাতে সেখানে পৌঁছেছেন। তাকে দেখে বললেন, “আমাদের সঙ্গে চলো ভাই। ওদিকেই তো যাবে। গাড়ি আছে তো?”
দীপ মাথা নাড়ল, “আমাকে আসলে অফিসে যেতে হবে এখন। পরে নাহয় একদিন দেখা হবে।”
ভদ্রলোক বললেন, “বেশ তো, যাবে সল্টলেক। আমার মেয়ে নিতে এসেছে আমাদের। ওকেও তো সল্টলেকেই ড্রপ করে দেব।”
দীপ আর কিছু বলল না। কিছু টাকা ক্যাব ফেয়ার বেচে গেলে মন্দ না। তার ব্যাগটা ফ্লোরে রাখল। ভদ্রমহিলাকে সাহায্য করল ওঁদের ব্যাগগুলো ট্রলিতে রাখার জন্য। একজিট গেটে পৌঁছে দীপ শহরটা দেখে একটা জোরে শ্বাস নিল। এখনও ফিরতে ভালো লাগে তাহলে।
পরক্ষণেই যে মেয়েটা ভদ্রলোক ভদ্রমহিলার দিকে দৌড়ে এল তাকে দেখে একটা হার্টবিট মিস করল সে। এই গোডাউনের এত হাইফাই প্রোডাক্ট আশাই করেনি যে!
১৪
বাসস্ট্যান্ডে নেমে টোটোয় উঠে কোয়ার্টারটা খুঁজতে খুব একটা সমস্যা হল না মানালির। ভোরবেলায় ব্ল্যাক ডায়মন্ড ধরে আসানসোলের উদ্দেশে রওনা হয়েছিল তারা। আসানসোলে নেমে বাসে করে রূপনারায়ণপুর পৌঁছোল যখন, তখন সাড়ে এগারোটা বাজে। রোদ থাকলেও মাঝে মাঝে এমন হাওয়া দিচ্ছে যে শরীর একেবারে শিরশির করে উঠছে। এক অদ্ভুত শুষ্ক শীতল হাওয়া বইছে।
