শ্রীপর্ণা কয়েক সেকেন্ড মানালির দিকে তাকিয়ে বলল, “ধ্রুবর স্ত্রীর ব্যাপারে তুমি কী করে জানলে?”
মানালি সত্যিটা বলে দিল, “আমার মনে হয় অনেকেই জানেন ম্যাম, ইনফ্যাক্ট ওঁর ব্যাপারে আমার বসই বলেছেন।”
শ্রীপর্ণা মাথা নাড়লেন, “আমার মনে হয় না আমার ইন্টারভিউর সঙ্গে এসবের কোনও সম্পর্ক আছে। তোমার আর কিছু প্রশ্ন থাকলে করতে পারো।”
মানালি মরিয়া হল, “সম্পর্ক আছে ম্যাম, মার্কেটে অনেক গসিপ রটেছিল আপনাদের ব্যাপারে। আপনি বলতেই পারেন ব্যাপারটার সঙ্গে আপনার কোনও সম্পর্ক নেই, কিন্তু আপনার ফ্যামিলিতেও কি কোনও দিন ধ্রুবকে নিয়ে কোনও সমস্যা হয়নি?”
শ্রীপর্ণা তীক্ষ্ণ চোখে মানালির দিকে তাকিয়ে বলল, “একটা ইন্টারভিউ এত পার্সোনাল জায়গায় যাচ্ছে কেন? সময়ের কণ্ঠস্বরের কি এত খারাপ অবস্থা যে শেষতক লোকের কেচ্ছা খুঁড়ে বের করতে হচ্ছে?”
মানালি দীর্ঘশ্বাস চেপে বলল, “এক্সট্রিমলি সরি ম্যাম। স্বাভাবিক কৌতূহল এগুলো বুঝতেই পারছেন।”
শ্রীপর্ণা বললেন, “শোনো মেয়ে, খুব ভালোভাবে শুনে নাও। আমার ফ্যামিলি আছে, আমার হাজব্যান্ড আছেন, আমার একটা ক্লাস থ্রিতে পড়া মেয়ে আছে। আমি এঁদের ছাড়ার কথা কোনও দিনই ভাবতে পারব না। সুতরাং ধ্রুব বাগচী আর আমাকে নিয়ে যা যা গুজব শুনেছ তার গোটাটাই কল্পনার বালির বাঁধের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা।”
মানালি অন্ধকারে ঢিল ছুড়ল, “অনেকের ধারণা যে ধ্রুব বাগচীর ডিভোর্সের জন্য আপনি অনেকাংশে দায়ী।”
শ্রীপর্ণা ভ্রূ কুঁচকে বললেন, “কার ধারণা? এক-এক করে নাম বলো।”
মানালি ঠোঁট কামড়ে বলল, “সেটা তো সিক্রেট ম্যাম। আমি সোর্স ডিসক্লোজ করতে পারব না।”
শ্রীপর্ণা রাগি গলায় বললেন, “আমি ভেবেছিলাম আপনি আমার কাজ ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন করতে এসেছেন। আপনার প্রশ্নগুলো খুব মিসলিডিং সেটা বুঝতে পারছেন তো? আশা করি আপনার নামে আপনার অফিসে আমি কোনও রকম কমপ্লেইন করি সেটা আপনি চাইবেন না।”
মানালি রেকর্ডার অফ করল, “একটা শেষ প্রশ্ন ম্যাম।”
শ্রীপর্ণা অন্যদিকে তাকিয়ে বললেন, “বলো।”
মানালি বলল, “ধ্রুব বাগচীর বউয়ের বর্তমান ফোন নম্বরটা দেওয়া যাবে?”
শ্রীপর্ণা উঠলেন, “এলাম। শট রেডি হয়ে গেছে।”
মানালি মাথা নিচু করে বসে থাকল। সে স্পষ্টতই বুঝতে পারল সন্ধেয় আবার ঝাড় খেতে চলেছে সে।
শ্রীপর্ণা অনেকটা চলে গেছিলেন।
হেঁটে ফিরে এসে আবার মানালির সামনের চেয়ারে বসে বললেন, “ধ্রুব বাগচী লোকটাকে রিড করা অত সহজ নয়। যত পাঁকই ঘেঁটে ফ্যালো, কিছুই বের করতে পারবে না।”
মানালি বলল, “ওঁর স্ত্রীর খোঁজ করা কি পাঁক ঘাটার সমান বলতে চাইছেন ম্যাম?”
শ্রীপর্ণা কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “ফোন নাম্বারটা নাও।”
১৩
টেক অফের সময় দীপ অন্যমনস্ক থাকার চেষ্টা করে। প্রথমে কিছু হয় না। এয়ারহোস্টেসরা যখন বোঝায় আপতকালীন সময়ে কী করতে হবে, সেই সময়ে ধীরে ধীরে তার ভয় হতে শুরু করে।
দীপ জানলার ধারে বসেছে। মাঝে বছর পঞ্চাশের এক বাঙালি ভদ্রলোক বসেছেন। ভদ্রলোকের ভুঁড়িটা নজর কাড়ার মতো। অপর কোনায় ভদ্রলোকের স্ত্রী। দুজনের কথা শুনে বোঝা যাচ্ছে ওঁরা পুরী গেছিলেন পুজো দিতে। প্লেন রানওয়ে দিয়ে দৌড় শুরু করতে না করতেই দুজনে ফিসফিস করে “জয় জগন্নাথ” বলতে শুরু করলেন। প্লেনটা যখন আকাশ অভিমুখে যাত্রা শুরু করল, দীপ কয়েক সেকেন্ডের জন্য চোখ বন্ধ করল। তার হঠাৎ মনে হল, আজ মরে গেলে কি খুব কষ্ট হবে কারও? পরমুহূর্তে বাবা-মার মুখটা মনে পড়ে গেল। খানিকটা দুর্বল হল সে। মরে যাবার জন্য বয়সটা খুব অল্প এখনও। আরও কয়েকটা বছর বাঁচলে খারাপ হত না। টেক অফ ঠিকঠাক হবার পরে প্লেনে এয়ারহোস্টেসরা ফেরিওয়ালাগিরি শুরু করে দিল। পাশের ভদ্রলোক বললেন, “সকালে ভালো করে কিছু খাওয়া হল না, একখান স্যান্ডউইচ খাই? কী বলো?”
ভদ্রমহিলা চাপা গলায় বললেন, “পনেরোটা কচুরি খেয়েছ। ওটা যদি খাওয়া না হয় তবে কোনটা খাওয়া?”
ভদ্রলোক নিচু স্বরে প্রতিবাদ করলেন, “প্লেন মাঝ আকাশে থাকলে সব হজম হয়ে যায়, জানো না?”
ভদ্রমহিলা কটমট করে ভদ্রলোকের দিকে তাকালেন। ভদ্রলোক গম্ভীর হয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, “ধাইকিড়িকিড়ি, আরও কতক্ষণ বসতে হবে কে জানে!”
ভদ্রমহিলা বললেন, “তোমাকে না বলেছি অকারণে ধাইকিড়িকিড়ি বলবে না! আজব লোক একটা, যে জায়গায় যাবে, সেখানকার কিছু না কিছু একটা মুদ্রাদোষে পরিণত না করলে শান্তি নেই।”
ভদ্রলোক সুবিধে করতে না পেরে তার দিকে তাকালেন, “আপনি বাঙালি?”
দীপ বলল, “হ্যাঁ।”
ভদ্রলোক বললেন, “কলকাতায় বাড়ি?”
দীপ বলল, “হ্যাঁ।”
ভদ্রলোক বললেন, “গুড। বিয়ে করেছেন?”
দীপ বলল, “না।”
ভদ্রলোক বললেন, “ভেরি গুড। এক্কেবারে করবেন না। ভয়ংকর ব্যাপার। আপনি কি পুরী গেছিলেন?”
দীপ বলল, “না, ভুবনেশ্বর, অফিসের কাজে।”
ভদ্রলোক বললেন, “ওহ। তা ঠিক। একা একা পুরী গিয়ে করবেনই বা কী?”
দীপ কী বলবে বুঝতে না পেরে বলল, “সেই।”
ভদ্রলোক বললেন, “পুরীতে খুব খিদে পায়। আমার সমুদ্রের হাওয়া লাগলেই খিদে পায়।”
দীপ বলল, “ও।”
ভদ্রলোক বললেন, “তবে বাড়ির খাবার ব্যাপারই আলাদা। এই যে নেমে বাড়ি গিয়ে…”
