মানালি স্যালাডের প্লেট থেকে শসা নিয়ে মুখে দিয়ে বলল, “বুঝতে পারছি। এও বুঝতে পারছি এই চাকরিটা খুব শিগগিরি ভোগে যাবে। কিন্তু কী আর করা, চেষ্টাটা করে যাই।”
ঋপণ বলল, “চাকরি গেলে কী করবি?”
মানালি বলল, “এন আর আই ধরব। আমেরিকায় গিয়ে গুলাবজামুন বানিয়ে তোকে ফেসবুকে ট্যাগ করে দেব। হবে না?”
ঋপণ হাসতে হাসতে বলল, “তুই পারবি না। আমি শিওর তুই পারবি না।”
মানালি বলল, “আমিও শিওর আমি পারব না। কিন্তু ভালো ইংরেজি বলতে পারি, স্মার্ট, আমার মার ওপর আমার পূর্ণ ভরসা আছে। নিশ্চয়ই একটা এন আর আই ধরতে পারবে।”
ঋপণ বলল, “এন আর আই নিয়ে পড়লি কেন হঠাৎ?”
মানালি বলল, “শুধু এন আর আই কেন? বিয়েতেই আমার আপত্তি আছে। আমি কি কোনও বোঝা নাকি বল তো? কোনও ভাবে পার করে দিতে পারলেই হল? কেন, আমি যদি নিজের পায়ে দাঁড়াই সিঙ্গল থেকে, সমস্যাটা কোথায়?”
ঋপণ চোখ বড়ো বড়ো করে বলল, “ওরে বাবা, আবার সেই সব কঠিন কঠিন ব্যাপার। আমি ভাই গরিব ফটোগ্রাফার, আমার এসব বুঝে কাজ নেই।”
মানালির খাওয়া হয়ে গেছিল। উঠে মুখ ধুয়ে ঋপণকে বলল, “খেয়ে চলে আয়। আমি বাইরে ওয়েট করছি।”
ঋপণ বলল, “আমারও হয়ে এসেছে। আসছি আসছি। যাবি কীসে স্টুডিও?”
মানালি হাসল, “হাঁটব। অনেকদিন হাঁটা হয় না।”
ঋপণ বলল, “অনেকটা কিন্তু। পরে পালটি খেলে চলবে না।”
মানালি বলল, “অনেকটা আমি জানি তো। নো চাপ।”
দুজনে যখন স্টুডিও পৌঁছোল, তখন তিনটে বাজে। মানালির আগে থেকে ফোন করা ছিল। মেকআপ রুম থেকে বেরিয়ে শ্রীপর্ণা খানিকটা আলাদা হয়ে তাদের নিয়ে বসলেন বাইরেই।
মানালি ভালো করে শ্রীপর্ণাকে দেখছিল। ধ্রুবর বয়সিই হবেন। তবে বয়সের ছাপ যেন আরও বেশি পড়ে গেছে ভদ্রমহিলার ওপরে। ইদানীং সিরিয়ালে মা মাসি পিসির রোল করেন।
শ্রীপর্ণা বললেন, “আমাকে ফোন করতে পারতে সকালে। বাড়িতেই দিব্যি হয়ে যেত।”
মানালি ভেবেই এসেছিল কী বলবে। সে অসহায়ের মতো মুখ করে বলল, “একটু আর্জেন্ট ব্যাপার ছিল ম্যাম। আমাদের শনিবারের সিনেমার পেজটার অ্যাসাইনমেন্টটা জাস্ট সকালেই ঠিক হয়েছে। কয়েকটা ব্যাপার একটু ক্ল্যাশ করে গেল।”
শ্রীপর্ণা বললেন, “ওহ, ঠিক আছে। শুরু করতে পারো। তুমি কি ফটো তুলবে?”
ঋপণের দিকে তাকালেন শ্রীপর্ণা।
মানালি বলল, “হ্যাঁ ম্যাডাম, ইন্টারভিউয়ের পরে। মানে আপনি যদি পারমিশন দেন।”
শ্রীপর্ণা খুশি হয়ে বললেন, “নো প্রবলেম। আচ্ছা, ইউ মে স্টার্ট ইওর ইন্টারভিউ।”
মানালি নোটপ্যাড খুলল। সে শুরুটা সাধারণ প্রশ্ন দিয়েই করল, “ম্যাম, আপনি শুনলাম ছোটো পর্দাকেই ঘর বানিয়ে ফেলছেন। বড়ো পর্দার ওপর কি ইন্টারেস্ট হারিয়ে ফেলছেন?” মানালি খুব ভালো করেই জানত ব্যাপারটা আসলে উলটো।
শ্রীপর্ণা প্রশ্নটা লুফে নিয়ে বললেন, “একেবারেই তাই। এখন ছোটো পর্দা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং।”
মানালি মনে মনে বলল, কোথায় চ্যালেঞ্জিং! এখানে মা মাসির রোল করছিলেন, সিনেমাতেও তো তাই করতেন! সে অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “আপনার লাস্ট বড়ো পর্দায় অভিনয় ধ্রুব বাগচীর ডার্ক লাভ। ক্রিটিক থেকে দর্শক, সিনেমাটা খুব একটা কেউই ঠিকঠাক নিতে পারেননি। আপনার কি মনে হয় সিনেমাটা করা আপনার একটা ভুল ছিল?”
শ্রীপর্ণা একজন স্পটবয়কে ডেকে জলের বোতল আনালেন। এক ঢোক জল খেয়ে বললেন, “দ্যাখো, ধ্রুবর সিনেমাটা কিন্তু বেশ কয়েকটা ফেস্টিভ্যালে বেশ ভালো রেসপন্স পেয়েছে। সুতরাং এক্ষেত্রে বলা ভুল যে সিনেমাটা করা ভুল ছিল। ধ্রুবর সঙ্গে সিনেমা করলে বেশ কিছু নতুন নতুন জিনিস শেখা যায়।”
মানালি সন্তর্পণে বাতাসে ভাসিয়ে দিল পরবর্তী প্রশ্ন, “ম্যাম, একটা গুজব প্রায়ই ভাসে, আপনার সঙ্গে ধ্রুব…”
শ্রীপর্ণা রাগলেন না, বললেন, “আমি প্রিপেয়ারড ছিলাম এই বাউন্সারটার জন্য। কিন্তু আমি এটাকে ডাক করাটাই প্রেফার করব। নো পার্সোনাল কোয়েশ্চেন প্লিজ।”
মানালি বুঝতে পারছিল সে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে বলল, “শিওর ম্যাম। বুঝতেই পারেন কৌতূহল আটকে রাখা খুব কঠিন ব্যাপার।”
শ্রীপর্ণা বললেন, “তোমাদের সাংবাদিকদের সঙ্গে ইয়ং ছেলেমেয়েদের মিল হল, তোমরা একটা ছেলে একটা মেয়ের সঙ্গে কথা বললে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারো না আদতে তারা বন্ধু হলেও হতে পারো। একেবারে গুজবটাকে বেডরুম পর্যন্ত না নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত তোমরা শান্তি পাও না। শোনো মেয়ে, ধ্রুব আর আমাদের ফ্যামিলি অনেক দিন ধরে ক্লোজ ফ্রেন্ড। আমরা একে অপরের ফেলিওরে পরস্পরকে সান্ত্বনা দি। সাকসেস সেলিব্রেট করি। আমাদের শান্তিনিকেতনের বাড়ির কমপ্লেক্সে ধ্রুবও একটা ফ্ল্যাট কিনবে ঠিক করেছিল। পরে পিছিয়ে আসে। ধ্রুবর ধারণা ছিল ডার্ক লাভ হিট করে যাবে। সিনেমাটা যে বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়বে, সেটা ধ্রুব কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। ওই সময়টা ও ভীষণ ভেঙে পড়েছিল। দিন রাত ড্রিংক করে দরজা বন্ধ করে বসে থাকত। আমি ওকে সাপোর্ট দিয়েছি। এতে তোমরা যদি কিছু খুঁজে পাও তো ভালোই, আমার আর কিছু বলার নেই।”
মানালি এবার তার আসল প্রশ্নটা করে ফেলল, “ধ্রুববাবুর স্ত্রী সে সময়টা ওঁর পাশে ছিলেন না?”
