ট্যাক্সি নিই কোনও কোনও দিন। তাতে অনেক টাকা চলে যায়। ওভাবে হবে না বুঝে পাবলিক ট্রান্সপোর্টেই উঠব ঠিক করেছি শেষমেশ। বাসে উঠেই লেডিস সিটের দিকে চলে যাই। খানিকটা আক্রমণাত্মকও হয়েছি।
আগে কেউ গা ঘেঁষে দাঁড়াতে চাইলে ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতাম। আজকাল চেঁচিয়ে উঠি। কোনও কোনও সময় বিপরীত দিক থেকেও তীব্র প্রতিক্রিয়া আসে, “অফিস টাইমে অত ভদ্রতা রাখলে ট্যাক্সিতে যেয়ো মামণি” টাইপ কমেন্ট আসে। এই প্রতিক্রিয়াগুলো একা কেউ করে না। অনেকে মিলেই করে। যেন এর অন্যথা হতেই পারে না। লোকটার কোনও খারাপ অভিপ্রায় থাকতেই পারে না।
অবশ্য অপ্রত্যাশিতভাবে অনেকের সমর্থনও পেয়ে যাই। সব পুরুষ খারাপ নয়। বুঝতে পারি সময় এগোলে। এও বুঝি খুব সুন্দর মুখের পুরুষের ভেতরটা কুৎসিত হতে পারে, উলটোটাও হতে পারে। পুরুষের চোখের থেকে বড়ো সত্যি আর কিছু হয় না। ক্রমাগত বুকের দিকে তাকিয়ে কথা বলা একজন অতীব ভদ্রলোক যেমন আমাদের স্কুলের সেক্রেটারি। মাঝে মাঝে মনে হয় চড় মারি। অথচ তাঁর কথা শুনলে কে বলবে তিনি এরকম। চোখটাই আসল।
সাত পাঁচ ভেবে স্কুল থেকে বেরিয়ে চোখ বন্ধ করেই দাঁড়িয়ে ছিলাম, বাস স্ট্যান্ডের দিকে রওনা দেব মনস্থির করে চোখ খুলে দেখি সামনে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন বাইক নিয়ে। আমি ফ্যালফ্যাল করে তার দিকে তাকিয়ে বললাম, “অফিস?”
অমৃত বলল, “তোমার কথা খুব মনে পড়ছিল। পেট খারাপ বলে পালিয়ে এলাম।”
আমি হাঁ করে ওর দিকে তাকিয়ে থেকে বললাম, “ধরা পড়ে যাও যদি?”
অমৃত হাসল, “ধরা পড়ব কেন? সবাই কেজো লোক। কাজ করুক। আমি বরং একটু প্রেম করি। প্রেমের দ্বিতীয় দিন অত হিসেবি হলে হয়?”
আমার কেমন লজ্জা লাগছিল। স্কুলের সব ম্যাডামরা বেরিয়ে যাননি এখনও। দেখলে বিচ্ছিরি ব্যাপার হবে। ওকে বললাম, “তুমি রাস্তা ধরে খানিকটা এগিয়ে দাঁড়াও। আমি আসছি।”
অমৃত বলল, “ধুস। পিছনে বসো। এখনই হুশ করে বেরিয়ে যাই।”
খানিকটা অনিচ্ছাসত্ত্বেও আমি ওর বাইকের পিছনে উঠলাম। শুরুতেই এত স্পিড দিল যে জাপটে ধরতে হল।
বললাম, “কী করছ? আস্তে চালাও।”
অমৃত বলল, “তোমার স্কুলের সবাই দেখবে, না? দাঁড়াও, এলাকাটা পেরোই।”
বেশ জোরে চালিয়ে অনেকটা রাস্তা পেরোল। বড়ো রাস্তায় গাড়ির গতি কমল। আমি ওকে জড়িয়ে ধরে আছি। প্রথমে ভয় লাগছিল। এখন অনেকখানি ভালোলাগা সেটাকে গ্রাস করতে শুরু করেছে। খানিকটা গিয়ে বাইক দাঁড় করিয়ে অমৃত বলল, “আমার এখন ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ গাইতে ইচ্ছা করছে।”
আমি বললাম, “গাও না। কে বারণ করেছে?”
অমৃত বলল, “আমার না খুব আনন্দ হচ্ছে। খুব। তোমায় বলে বোঝাতে পারব না।”
আমার হাসি পেল। ছেলেটা কেমন বাচ্চাদের মতো করে! অথচ প্রথম প্রথম কী ডাঁটই না দেখাত, বাবাহ! আমি গম্ভীর হয়ে বললাম, “হয়েছে হয়েছে। আমি বাড়ি যাই।”
অমৃত অপ্রস্তুত মুখ করে বলল, “চলে যাবে? এখনই? ধুস। তাহলে কী করে হবে?”
আমি বললাম, “তাহলে কী করবে? তুমিই বলো।”
অমৃত বলল, “ঘুরি। উদ্দেশ্যহীনভাবেই ঘুরি। জড়িয়ে ধরে বসে থাকো না। আর শোনো, মেট্রোদাদু দেখলে বাইকের স্পিড বাড়িয়ে দেব।”
আমি হেসে ফেললাম। বললাম, “এ কথাগুলো ভেবে বলো, না বানিয়ে নাও?”
অমৃত বলল, “বানিয়ে ফেলি সঙ্গে সঙ্গে। আমি খুব ট্যালেন্টেড তো।” বলেই হেসে ফেলল। তারপর বলল, “তোমায় বাড়িতে নিয়ে যেতে বলছে সবাই। যাবে আমাদের বাড়ি?”
আমি ওর দিকে তাকালাম।
খুশিতে চোখ দুটো চিকচিক করছে।
আমার হঠাৎ খুব কষ্ট হল।
ভালো লাগছে না কেন কিছু?
১৬ জীমূতবাহন
ঈশান আমার দিকে বড়ো বড়ো চোখ করে এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন অ্যালিয়েন দেখছে। আমি বললাম, “কী হল?”
ঈশান বলল, “ভাই মুত, তোর বউ চলে গেল? বিয়ের পরের দিন?”
আমি বললাম, “হ্যাঁ। চলে গেল। কী করব? আমার কী করার আছে?”
ঈশান মুখের হাঁ বন্ধ না করেই বলল, “এবার কী হবে?”
আমার ইচ্ছে করছিল মল্লিকের লেডিকেনিটা ঈশানের মুখে ঢুকিয়ে দি। প্রবল ইচ্ছা দমন করে বললাম, “তোর এত চাপ হচ্ছে কেন? আমার বিয়ে আমি বুঝব।”
ঈশান গম্ভীরভাবে মাথা নেড়ে বলল, “তুই বুঝছিস না। এরকম কোথাও হয় না। লোকে কী বলবে?”
আমি কম্পিউটার স্ক্রিনে মনোযোগ দিয়ে বললাম, “লোকে যা ইচ্ছা বলুক। আমার তাতে কিছু করার নেই।”
ঈশান বলল, “এইজন্য বিয়ে করতে নেই। বিয়ে জিনিসটাই গোলমেলে হয়ে গেছে।”
আমি বললাম, “আমি তো শখ করে বিয়ে করিনি। সবাই বলল মেয়ে লগ্নভ্রষ্টা হতে চলেছে। আমিও ব্রাইডাল মেকআপ দেখে বার খেয়ে বিয়ে করে ফেললাম। দেখতে তো ভালোই লাগছিল। ভেতরে যে বিছুটিপাতা আছে আমি কী করে বুঝব? আমি অপরাজিত দেখা পাবলিক। কিন্তু যুগটা যে বিভূতিভূষণের নেই, কিউর যুগ হয়ে গেছে, সেটা তো বুঝিনি।”
ঈশান ভ্যাবাচ্যাকা মুখে বলল, “কিউ?”
আমি বললাম, “গান্ডু।”
ঈশান বুদ্ধিমানের মতো মাথা নাচাল, “ওহ। বুঝেছি। কী আর করা। স্যাড লাইফ। আচ্ছা তুই আবার বিয়ে করতে পারবি তো?”
আমি দু হাত জোড় করে প্রণাম করার ভঙ্গি করে বললাম, “আর বিয়ে? নমস্কার। আর দরকার নেই। এখনই আমার নেট ব্যাংকিং পাসওয়ার্ড চেয়ে নিয়েছে।”
ঈশান বলল, “সে কী! কেন?”
আমি বললাম, “টাকা চাই।”
ঈশান বলল, “যাহ শালা। এ কেমন মেয়ে?”
