মানালি বলল, “ওকে স্যার, আমি আপনাকে আর ডিস্টার্ব করব না।”
ধ্রুব বাগচী ফোনটা কেটে দিলেন।
মানালি সশব্দে ফোনটা রেখে বিড়বিড় করে বলল, “অসভ্য আনকালচারড লোক একটা।”
বিতস্তা বলল, “ঠিক আছে সব?”
মানালি বলল, “হুঁ।”
ইন্টারকমের ফোনে বিশ্বরূপদাকে ফোন করল সে, বিশ্বরূপদা ধরতে বলল, “বলে দিয়েছি সরি।”
বিশ্বরূপদা কেজো গলায় বলল, “ওকে।”
মানালি বলল, “তবে কি এই অ্যাসাইনমেন্টটা নিয়ে আপাতত আর না এগোলেও হবে?”
বিশ্বরূপদা বলল, “কোন অ্যাসাইনমেন্ট?”
মানালি বলল, “ধ্রুব বাগচীর বউ খোঁজার অ্যাসাইনমেন্ট! আর কী?”
“সাত দিনের মধ্যে স্টোরি করে ফেল। বেশি সময় নেই।”
বলেই ফোনটা কেটে দিল বিশ্বরূপদা।
বিতস্তা বলল, “মিটল?”
মানালি বলল, “এত সহজে মেটে? চাকরি করা যাবে না মনে হচ্ছে আর! ফাউ লোকের চাট খাবার কোনও ইচ্ছা নেই আমার। নিজেকে বিরাট কিছু ভেবে ফেলেছে। ওই তো সিনেমা, গোটা হলে দশটা লোক। তার মধ্যে হল স্টাফ থাকে পাঁচটা।”
বিতস্তা বলল, “অ্যাই! আমি কি একটু ব্যাপারটা সম্পর্কে পুরোটা জানতে পারি? সব কিছু কেমন হেঁয়ালি হেঁয়ালি মনে হচ্ছে।”
মানালি সংক্ষেপে সবটা বলে বলল, “শ্রীপর্ণা ঘোষালের সঙ্গে ধ্রুব বাগচীর রিলেশন কেমন জানিস?”
বিতস্তা বলল, “আমি কী করে জানব বল তো?”
মানালি বলল, “আমি কী জানি তুই কী করে জানবি? আমার সব কিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। সাতদিনে কীভাবে সব কিছু আমি সামলাব বুঝতে পারছি না।”
মানালির গলাটা না চাইতেও কাঁদো কাঁদো হয়ে গেল।
বিতস্তা বলল, “সবই তো বুঝলাম, কিন্তু ধ্রুব বাগচীর এক্স কী এমন হাতি ঘোড়া যে বিশ্বরূপদা এমন ডেসপারেট হয়ে গেল স্টোরিটার জন্য?”
মানালি হাঁ করে বিতস্তার দিকে তাকিয়ে রইল।
এই কথাটা সেভাবে তার মাথায় আগে আসেনি কেন?
১১
সন্ধে সাতটা নাগাদ ভুবনেশ্বরের হোটেলের ঘরে ফিরল দীপ। ইচ্ছা করলে রাতের ফ্লাইটে কলকাতা ফেরা যেত, কিন্তু সে নিজেই থেকে গেল। অনেক রাত হয়ে যেত বাড়ি ফিরতে ফিরতে।
হোটেলের ঘরে এসে ফ্রেশ হয়ে টিভিটা চালিয়েছে, এমন সময় দেখল ফোনটা বাজছে। সে দেখল চিত্রলেখা ফোন করছে। ধরল, “হ্যাঁ বলো।”
“তোমার কি সারাদিনে একবারও আমার কথা মনে পড়ল না?” ওপাশের গলা থমথমে।
দীপ বলল, “প্রচুর বিজি ছিলাম তো। ক্লায়েন্ট মিট ছিল, দুপুরে ভালো করে খেতেও পারিনি।”
“ওহ। আচ্ছা। এখন খেয়েছ?”
“হ্যাঁ, বিকেলে খেলাম।”
“ওঃ, তার মানে বিকেলে ফ্রি হয়েছিলে?”
“হ্যাঁ। ওই একটু ফাঁক পেলাম, ওই সময়টাতেই খেয়ে নিলাম আর কি।”
“আচ্ছা।”
“তোমার কী খবর?”
“আমার? আমার ঠিকঠাক। ভাবছিলাম ফেসবুক আবার ডিঅ্যাক্টিভেট করে দেব।”
“সে কী কেন? কী হয়েছে?”
“তেমন কিছুই না। ভালো লাগছে না। আচ্ছা তুমি আমাদের ব্যাপারটা নিয়ে খুশি তো?”
দীপ কপালে হাত দিল। সেই একই প্রশ্ন। সে বলল, “অবশ্যই খুশি। কেন খুশি হব না বলতে পারো?”
চিত্রলেখা বলল, “না, আসলে একটা মেয়ে একটা ছেলের থেকে নিরাপত্তা চায়। আমার আজকাল মনে হয় তুমি বোধহয় একটু পজেসিভ হলে, আমাকে একটু সন্দেহ করলে আমি বেশি খুশি হতাম। আমার মনে হয় সব সময় তুমি আমাকে ছেড়ে ছেড়ে রাখছ, উপেক্ষা করছ।”
দীপ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “একটা পরিণত সম্পর্কে ছেড়ে রাখাটাই স্বাভাবিক নয় কি? তোমার তো নিজেরও একটা স্পেস দরকার আছে, তাই না? দ্যাখো, আমরা কেউ তো আর ছোটোবেলার মতো প্রেম করি না, আমাদের একটা লাইফ আছে, দুজনে নিজের নিজের লাইফটা ঠিকভাবে কাটাতে পারলেই বোধহয় বেশি খুশি হতাম। আমাদের শুরুটাও তো এরকম ভেবেই হয়েছিল। তুমি বিরক্ত ছিলে তোমার এক্সের ওপর, যে অত্যধিক পজেসিভ ছিল, তো এখন হঠাৎ কী হল তোমার?”
চিত্রলেখা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, “আমি আজকাল খুব ইনসিকিউরিটিতে ভুগছি।”
দীপ একটু রাগল, “কীভাবে তোমাকে সিকিউরিটি দিতে পারি? ফিজিক্যাল রিলেশন চাও?”
চিত্রলেখা বলল, “ধ্যাত। ওভাবে সিকিউরিটি আসে নাকি?”
দীপ বলল, “কীভাবে আসে? সারাক্ষণ কানে ফোন গুঁজে রাখলে আসে?”
চিত্রলেখা বলল, “জানি না। আমার মনে হয় আমাদের ফ্রিকোয়েন্টলি মিট করা দরকার। এভাবে দূরে দূরে থাকলেই আমার নিরাপত্তাহীনতাটা তৈরি হয়।”
দীপ বলল, “বেশ তো, আমি কলকাতা গিয়েই তোমাকে মিট করব, তাহলে খুশি তো?”
চিত্রলেখা বলল, “কোথায় মিট করব?”
দীপ বলল, “তুমিই বলো।”
চিত্রলেখা বলল, “সেই তো রেস্তোরাঁতেই করতে হবে। আর কোথায় মিট করবে?”
দীপ বলল, “তবে কোথায় করতে চাও, তুমিই বলো?”
চিত্রলেখা বলল, “জানি না। তুমি বোলো কোথায় কীভাবে দেখা করতে হবে, আমি চলে যাব।”
দীপ বলল, “ভেবে বলি?”
চিত্রলেখা বলল, “আচ্ছা।”
দীপ ফোন রেখে অন্যমনস্ক ভাবে খানিকক্ষণ টিভি দেখল। হোটেলটা বেশ ভালো। সংলগ্ন বারও আছে। সে রুম সার্ভিসে ফোন করে একটা হুইস্কি আনিয়ে নিল। একা একা বসে থাকলে ইদানীং তার মদ খেতে ইচ্ছা করে। সোডা মিশিয়ে এক চুমুক সবে দিয়েছে, এই সময়ে আবার সশব্দে ফোনটা বেজে উঠল। দীপ দেখল চিত্রলেখা আবার ফোন করছে, কয়েক সেকেন্ড ফোনের দিকে তাকিয়ে ফোনটা ধরল, “বলো।”
“তোমাকে একটা কথা বলার ছিল। যতক্ষণ না বলছি, আমার খুব অস্বস্তি হচ্ছে।” চিত্রলেখা যেন খানিকটা হাঁফাচ্ছিল।
